


রাত পোহালেই রাজ্যে ভোটগ্রহণ। ভোট নেওয়া হবে মোট দু-দফায়। ২৯৪টি আসনে প্রার্থীদের মধ্যে নিরক্ষর ৩০ জন আর ৬৮ জন আছেন সামান্য অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন। এঁদের মধ্যে কেউ কেউ জিতে বিধায়ক হবেন কি না তা জানা যাবে ৪ মে। একবিংশ শতাব্দীর সিকি শতক পেরিয়ে এসেছি আমরা। ভারত রাষ্ট্রে বিধায়ক হওয়ার দৌড়ে এখনো ছাড়পত্র পাচ্ছেন নিরক্ষর কিংবা নামমাত্র অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তিরা! এটা পরিতাপের বিষয়। এঁদের মধ্যে দু-একজন কপাল গুণে বিধায়ক হয়ে গেলে তা হবে নিঃসন্দেহে দুর্ভাগ্যের। কারণ বিধায়করা যেমন তেমন ব্যক্তি নন, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান হিসাবে বিধানসভা এগিয়ে যাবে তাঁদেরই হাত ধরে। মুখ্যমন্ত্রীর নেতৃত্বে গোটা মন্ত্রিসভা তৈরি হয় তাঁদেরকেই নিয়ে। বিধানসভা হল একটি আইনসভা। প্রতিবছর এই বিধানসভাতেই রাজ্যের প্রয়োজনে সময়োপযোগী একাধিক নতুন আইন তৈরি হয়। পুরানো কিছু আইন সংশোধন এবং বাতিল পর্যন্ত করা হয় সেখানে। অর্থাৎ সাংবিধানিক ক্ষমতাবলে বিধায়করা আইন প্রণেতাও। সরকার বার্ষিক বাজেট তৈরি করে। বিভিন্ন ধরনের প্রকল্প গ্রহণ করতে হয়। সেগুলির অনুমোদন অথবা খারিজ করারও ক্ষমতা রয়েছে আইনসভার। সেই বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত যাঁরা দেন তাঁরা আর কেউ নন, বিধায়করা। একাধিক জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের উপর মতদানেও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিতে পারে বিধানসভা।
সব মিলিয়ে বিধায়করাই হলেন একটি রাজ্যের গণতন্ত্রের কান্ডারি। তাই শুধুমাত্র সেই ব্যক্তিদেরকেই বিধায়ক পদে বেছে নেওয়া উচিত যাঁরা রাজ্যকে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবেন। তাঁরা যথার্থ শিক্ষিত ও মার্জিত ব্যবহারের মানুষ হবেন, আশা করা যায়। তবেই রাজ্যের শিক্ষা-সংস্কৃতি-ঐতিহ্য সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হবেন তাঁরা। শপথ নেওয়ার পর তা মেনে চলবেন। সংবিধানের মর্যাদা রক্ষা করবেন। নানা ভাষা ও নানা মতের রাজ্য ও দেশ আমাদের। সর্বক্ষেত্রে ঐক্য ও সংহতি রক্ষায় তাঁরা হবেন আন্তরিক। দেশের অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় তাঁরা হবেন আপসহীন। বহুত্বের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এই মানুষগুলিকে হতে হবে আধুনিক মনস্কও। তবেই তাঁরা বৈমষ্যহীন সমাজগঠনের পথে রাজ্য ও দেশকে যোগ্য নেতৃত্ব দিতে পারবেন। মনের রাখতে হবে, লিঙ্গ বৈষম্য, আর্থিক বৈষম্যসহ রকমারি বৈষম্যই ভারত রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড়ো ক্রনিক ব্যাধি। এমন ব্যাধিমুক্ত রাষ্ট্র গঠন করতে হলে কোয়ালিটি ডেমোক্রেসির বিকল্প নেই। স্বাধীনতালাভের আটদশকের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেও শুনতে হচ্ছে, আমাদের গণতন্ত্র বৃহত্তম নামেই, গুণগত মানের বিচারে অবস্থান একেবারে তলানিতে। বিশেষত পশ্চিমা গণতন্ত্র ভারতকে ইলেক্টোরাল অটোক্রেসির ঊর্ধ্বে আসন দিতে রাজি নয়।
এই যখন আমাদের বিলাপের বিষয়, তখনই সামনে এসেছে প্রার্থীদের একাংশ সম্পর্কে অপরাধের ভয়াবহ তথ্যাদি। দু-দফার ভোটে মোট প্রার্থী ২৯২৩ জন। তাঁদের মধ্যে ৬৮১ জন নানাবিধ ফৌজদারি অপরাধে অভিযুক্ত! অর্থাৎ ২৩ শতাংশের বেশি প্রার্থীর নামে অপরাধের মামলা চলছে। এই তথ্য কোনো আবিষ্কার নয়, স্বয়ং প্রার্থীরাই মনোনয়নের সঙ্গে প্রদত্ত হলফনামায় এই কথা কবুল করেছেন। প্রথম দফার অভিযুক্ত প্রার্থীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিজেপির প্রতীক জমা দিয়েছেন। বিজেপির এমন ‘ঐতিহ্য’ বজায় রয়েছে দ্বিতীয় দফার প্রার্থী তালিকাতেও। দ্বিতীয় দফার ভোটে বিজেপির ৭২ শতাংশ প্রার্থীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা রয়েছে। তাদের মোট ১৪১ জন প্রার্থীর মধ্যে ১০২ জন এমন ‘কীর্তিমান’! একইভাবে গুরুতর ফৌজদারি মামলার নিরিখেও সবার উপরে বিজেপি প্রার্থীরাই। এক্ষেত্রে খুন, খুনের চেষ্টা, মহিলাদের বিরুদ্ধে অপরাধের মতো গুরুতর ফৌজদারি মামলা রয়েছে বিজেপির ৯২ জন বা ৬৫ শতাংশ প্রার্থীর বিরুদ্ধে। নির্বাচনি প্রচারে এসে ‘সুনার বাংলা’ গড়ার কথা বলতে শোনা গিয়েছে নরেন্দ্র মোদিকে। অমিত শাহও বাংলায় ‘আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার’ বুলি কপচাচ্ছেন দু-বেলা। কিন্তু কীসের জোরে তাঁদের এত বড়ো বড়ো কথা, তা পরিষ্কার করে দিচ্ছে এই ভয়াবহ পরিসংখ্যান। মোদি-শাহের পার্টি বুঝিয়ে দিচ্ছে, বাংলার গণতান্ত্রিক পরিবেশে তারা কতখানি বেমানান। এই কারবার তথাকথিত ‘রামরাজ্যসুলভমাত্র’! বাংলা আর যাই হোক, তার সযত্নলালিত ‘শান্তিনিকেতন’ বিসর্জন দিয়ে গোবলয়ের ‘গুন্ডারাজকে’ আহ্বান জানাবে না।