যশোধরা রায়চৌধুরী: হরিধন পোদ্দার খুব দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে উঠছিল। ক্যাশিয়ারবাবু ডেকে পাঠিয়েছেন। লোহার লিকপিকে চেয়ারের ঘাড়টা মটকে ধরে, হরিধন দুটো করে সিঁড়ি টপকে আসছিল। অন্য হাতে ফোলিও ব্যাগের কালচে মেরে আসা ঘেঁটিটা ধরা। মুখ ছিল ব্যাজার। বয়স তার কম, তবু আজকাল ভারিক্কে ভাব আনতে গোঁফ রাখছে হরিধন। রোগা ময়লা চেহারা। মিষ্টি কথা কয় বলে সবাই পছন্দ করে। কিন্তু দুর্জনে বলে ছোকরার গাঁটে গাঁটে বুদ্ধি। সামলে চল। বেঁটেদের নাকি আবার শরীরে গাঁট বেশি। তাই বুদ্ধিও বেশি।
অফিসে কেউ কাউকে ছেড়ে কথা কয় না। যে মোটা তাকে মোটু সুব্রত বলে ডাকা হবেই হবে। যে রোগা তাকে খ্যাংরাকাঠি সুরেশটা বলবেই। মেয়েদের ক’জন মাত্র আছে যারা একটু সুদর্শন। তাদের দেখলে সবাই ঘাবড়ায়, কিন্তু চলে গেলে মুখ টিপে হাসে। বাকিদের প্রায় সবাইকেই নাম দিয়েছে। টাক পড়ে যাওয়া অরুণাদি টাইপিং পুলে বসে। তার নাম সুকেশী। বা ঈষৎ ট্যারা পিয়ালী। তাকে মালক্ষ্মী। যাক গে।
ক্যাশিয়ারবাবুর পাশে বসে আজ তার ক্যাশ গোনার কাজ। সমস্ত দিন ধরে চলবে এই বিশাল মেলা। কর্মযজ্ঞ। অফিসের স্টাফের সংখ্যা দু-আড়াইশো হলেও, আজ পে ডের দিন হরিধনদের ক্যাশ ডিসবার্স করার কাজটা তো চাপেরই থাকে। শুধু তো মাইনে দেওয়া নয়, খুচরোর হিসেব মেলাতে হয় গুনে গুনে। তার পাশাপাশি থাকে আরও একটা খাতা মেনটেনের কাজ। হরিধন বলে ‘প্যাল্লাল খাতা’।
ক্যাশিয়ার শুভেন্দু মিত্রের তেজারতির কারবার চলে এ অফিসে। অফিসিয়ালি নয়। সে বড় কর্তারা জানলে তো কবেই চাকরি নট হয়ে যেত। কিন্তু শুভেন্দু মিত্র যে ক্যাশচেস্টের ভেতরের টাকা মাঝে মাঝেই বের করে, আর অবরে সবরে লোকেদের ধার দেয় তা কে না জানে। আর এই কাজে হরিধনই যে তার সহযোগী তাই বা ক’জনের অজানা। এই তো গেল মাসে রিপোর্ট সেকশনের দুর্বার মুস্তাফির মা যায় যায় অবস্থা হল, হঠাৎ হাসপাতালে নিয়ে যেতে হল। টাকা কোথায় পাবে। ধার নিল। শুভেন্দু দশ হাজার বের করে দেওয়ার সময়ে বলেছিল, সাবধান। কেউ যেন জানতে না পারে। পে ডে-তে শোধ দিও। হিসেব মিলিয়ে রাখতে হবে। ক্যাশ ভেরিফিকেশন যেকোনও দিন হতে পারে।
মাসে একদিন ক্যাশ ভেরিফিকেশন করার কথা। অন্য অফিস থেকেও আসতে পারে অফিসার, যদিও সচরাচর আসে না। গোপন একটা ভীষণ কুটকুটে ময়লা খাতা চালাচালি হয় ওপর নীচে। তাই তো বড় সাহেব একটা নামের তালিকা থেকে সবচেয়ে সহজ বানানের নামটা লিখে দেয়। বড় সাহেব মেজ ম্যাডামকেই দেয়। ভেরিফিকেশনের চার্জটা ফালতু কাজ ভাবে সবাই। খাতাটায় ম্যাডামের নাম দেখে আসে হরিধন গোপনে, বড় সাহেবের পিএসকে ভজি য়েভাজিয়ে। ওই তো। জয়া ভগত। বেশ বেশ। বাঁচোয়া।
জয়া ম্যাডামের এত বেশি কাজের চাপ, কোনওদিন টেবিল ছেড়ে ওঠারই সুযোগ পান না। জেলের কয়েদ ঘরের মতো সার সার লোহার শিক দেওয়া ক্যাশ রুমের চেহারাটা পর্যন্ত দেখার সৌভাগ্য কোনওদিন হয়েছে কি না সন্দেহ। ক্যাশ রুমের ভেতরে গোপনতর কক্ষ। লোহা দিয়ে তৈরি বাসর। ছ্যাঁদা করে ঢোকে এমন কালনাগিনী কেউ জন্মায়নি। মিত্রের কলমের খোঁচাই একমাত্র পারে ও তালার চাবি ঘোরাতে। সিনিয়র অ্যাকাউন্টস অফিসার বিশ্বাস অন্য চাবিটা মিত্রকেই দিয়ে দেন ক্যাশ বাক্স খোলার সময়। এতটা বিশ্বাস! বিশ্বাসের সঙ্গে ও আছে। তাতেই মিত্রতা। হুঁ হুঁ বাওয়া মিত্রের অল্প ইউনিয়ন ব্যাকিং, এ হল ডাবল লক সিস্টেম। ডাবল লকে দুটো চাবি এক সঙ্গে দিয়ে ঘোরাতে হবে।
এসব তো জয়া ম্যাডামের মতো চার চোখোর পক্ষে দেখা সম্ভব না। মাথার দু’পাশে পেছনে চারপাশে সহস্র চক্ষু থাকলেও নয়। একেই তিনি পড়ুয়া মানুষ। সারাক্ষণ ফাইলে মুখ ডুবিয়ে আছেন, চশমার ওপরে তাকালে মনে হয়,তাঁর ধারণা অফিসের কেউ কোনও কাজ করে না। সবার নোটিংয়ে ভুল, তথ্যে ভুল, ইংরেজিতে ভুল, যোগ-বিয়োগে ভুল ধরতে ধরতেই ক্লান্ত। জীবন হাফ মার্জিনে বন্দি।
এক্কেবারে সাজতে জানে না, মুখেও দাড়িগোঁফ। প্লাস, বড় সাহেবের দ্বারা অত্যন্ত অত্যাচারিত। বড় সাহেব যখন তখন ডেকে পাঠিয়ে দেড় দু’ঘণ্টা বসিয়ে রাখেন নিজের ঘরে। সবাই বলে ওই তো থোবড়! তাও?
জয়া ম্যাডামের থেকে দুঃখী কেউ নেই এ দুনিয়াতে। এইসব বেদনার পর, কেউ যাবে ক্যাশ ভেরিফিকেশন করতে এই ঘুটঘুটে অন্ধকার লৌহবাসরে?
ক্যাশ ভেরিফিকেশন স্টেটমেন্টটা লিখে নিয়ে এসো তো। হরিধনকে অর্ডার করেন তিনি, যখনই ক্যাশ ভেরিফিকেশনের ডিউটি পড়ে।
তেত্রিশ হাজার তিনশো বাইশ টাকা ছেচল্লিশ পয়সার হিসেব। ক’টা একশো টাকার নোট, ক’টা দশ বা কুড়ি টাকার নোট, খুচরো পয়সা ক’টা। সার দিয়ে দিয়ে ওপর থেকে নীচে লেখা। ব্যস। পাঁচশোর নোট, হাজারের নোট সিনে এন্ট্রি নেয়নি। বিমুদ্রাকরণ তখনও পূর্বজন্মের ভাত খাচ্ছে।
কালো লৌহবাসরের ভেতরে সাকুল্যে তখন পড়ে আছে বারো হাজার। বাকিটা ধারে এদিকে ওদিকে ঘুরছে, অন্যদের পকেটে পকেটে। এই হল মিত্র মহাশয়ের খেলা।
একটা সই করেই ম্যাডামের কাজ সারা। কুটকুটে ফাইলটা বড় সাহেবের ঘরে ঢুকে গেল। কেউ জানল না, মিত্র সুদ তুলেছে কত। বাজারের চেয়ে অনেক কম দরে। বছরের পর বছর তুলছে। কোনও এক যুগে অফিসের বাইরে পে-ডের দিনে কাবুলিওয়ালাদের দাড়ি চুমরোতে দেখা যেত। আর আজকাল, হরিধন পাচ্ছে হ্যান্ডলিং চার্জ।
দুই
আজ পে-ডে। আজ অফিসে আর কোনও কাজ হবে না। সকালবেলা থেকে হইহই। লেটারহেডে চিঠি দিয়ে প্রতিমাসে পুলিশ ফোর্স চাওয়া হয়। মাসের ত্রিশ একত্রিশ তারিখগুলো, সারা কলকাতার সব সরকারি অফিসে পে-ডে হয়। কত পুলিশ লাগে? ঢকঢকে অ্যাম্বাসাডর গাড়িটায় বসে ক্যাশিয়ার, বিলের বড়বাবু, আর হরিধন। মাসে একদিন গাড়ি চাপার সুযোগ কে আর ছাড়ে। পেছনে পেছনে পুলিশের গাড়ির আওয়াজ। কী বুক দুরুদুরু কাণ্ড। ব্যাঙ্কে যাওয়া, টাকা তোলা। লাখ কয়েক টাকা ভুশুণ্ডি রঙের খাকি ক্যাম্বিশের জিপ দেওয়া ব্যাগে ভরাট করে আবার অ্যাম্বাসাডরে তোলা। ব্যাঙ্কের আধা টানা কলাপসিবল গেটের দু’ধারে সঙিন উঁচানো পাহারা। আবার পেটের বেল্ট ঢিলে করতে করতে বেরিয়ে দাঁড়ানো ফোর্স। বেশ একটা রমরমা ব্যাপার।
ক্যাশ নিয়ে ফিরে তারপর সব লাইন দিয়ে বসা। সই আর টিপছাপ দেওয়া, ক্যাশ দেওয়া। আর অন্য খাতায় ধারকর্জ ফেরত নেওয়ার পালা। গুনেগেঁথে।
কিন্তু তারপরেও আছে নৈবেদ্যের ওপরের কলার টুকরোর মতন পুজোর বোনাস। সে বছরে একবারই। অ্যাড হক বোনাস তার গাল ভরা নাম। শুধু নন গেজেটেডরা পায়। দু’হাজার টাকার কাছাকাছি। আঠারোশো পঞ্চাশ টাকা।
সেটাও ডিসবার্স হবে। আবার পুলিশ চাওয়া, আবার ব্যাঙ্কে যাওয়া। আবার সেই সমস্ত প্রক্রিয়া হুজ্জুতি পেরিয়ে, হরিধনের শক্ত মাড় দেওয়া সাদা শার্টের কলার তুলে, রীতিমতো রেলায় বসা।
কিন্তু কোনওবারই ব্যাপারটা কেন জানি দুর্গাপুজোর আগে হয়ে ওঠে না। পেতে পেতে বেলা গড়িয়ে দীপাবলি। তা ভাইফোঁটার খ্যাঁটনটা হয়ে গেলেই হল। বোনেরা ভায়েদের খাদির পাঞ্জাবি কিনে দেবে। ভায়েরা বোনেদের গিল্টি করা বালা, চুড়ি, কানের দুল, গলার...
তিন
তারপর কত জল গড়িয়ে গেল গঙ্গা দিয়ে, বাগজোলা খাল দিয়ে...মারাঠা ডিচ দিয়ে,এমনকী টালির নালা দিয়েও।
এখন আর পে-ডে হয় না। মাসে একবার উৎসব নেই। ক্যাশিয়ারবাবুদের আগের রমরমা নেই। কিসুই নেই। কালো গর্ত হাঁ করে আছে। লোহার বাসরঘরে টাকা কড়ির রিনিঠিনি আর শোনা যায় না। শুধু ফোনে এসএমএস আসে, টুং। পে-ডের একমাত্র কাঙ্ক্ষিত আওয়াজ।
এখনও বড় কর্তারা আছেন। তাঁদের মুড্ডোমেজাজ আছে। মুড্ডো খারাপ হওয়া ইসিএসের লিঙ্ক ফেইলের মতোই। হালকা চাপ। দ্রুত সেরেও যায়। বড় কর্তাদের দয়ায় বাঁচা গোটা অফিসের হালচাল কখনও আপ কখনও ডাউন। বিয়ে হওয়া মেয়েদের বডির মতো। রোগা মেয়েরা বিয়ের পর মুটিয়ে যায়। তারপর বাচ্চা হওয়ার সময় ফুলেফেঁপে ওঠে। তারপর সন্তান পালন করতে করতে আর হাঁড়ি ঠেলতে ঠেলতে শুকিয়ে দড়ি হয়ে যায়।
আগের সুরেশস্যারের ফোলাফাঁপা সময়ের পর, পূর্ণা ম্যাডামের সময়ে গোটা অফিস তেমন শুকিয়ে চিমসেপানা হয়ে গিয়েছে।
হরিধন পূর্ণা ম্যাডামের তুলনায় ভালো পেয়েছিল আগের ওই সুরেশ স্যারকেই। হাট্টাকাট্টা বিহারি। একবার মেরে পাট করে দিয়েছিলেন নিজের বাড়িতে কাজ করিয়ে নিতে ডেকে দুটো গ্রুপ ডি-কে। একটার কলার বোন-ই ভেঙে চুরচুর। সেই নিয়ে কেস হল, সুরেশ স্যারের গুষ্টিশুদ্ধু আইপিএস বলে সেটা ধামাচাপাও পড়ে গেল। কিন্তু এই সুরেশ স্যারই ঠিক পুজোর আগে আগে বোনাস ধরালেন সবাইকে। গড়িয়াহাট, ধর্মতলা, শিবপুরে ইকনমি উঠল ক’দিন। শাড়ির নতুন ডিজাইন, আঁকাবাঁকা শিবোরি প্রিন্ট বা হাফ কাতানে হাফ কাঁথা, বিক্রি হল। আসলে ওঁর দু তিনটে এয়ার টিকিট বিল সেকশন প্রথমে আটকেছিল, পরে এমন ধমক দিলেন যে সুড়সুড় করে পাস করে দেয়। তাই গোটা অফিসকে পুরস্কার।
ইকনমিতে ফ্লাই করে, বিজনেসের টিকিটের দাম ক্লেম করার আওকাত কার আছে আর? সুরেশের মতো পুরুষসিংহ ছাড়া? অবশ্য যদি না পড়ে ধরা। সেই ব্যাকআপেও অফিসে লোক রাখে। চলে গেলে শমীবৃক্ষ থেকে নামবে অস্ত্র শস্ত্র। গোপন বেনামা ইমেল যাবে হেড আপিসে।
আসলে, পূর্ণার ইতিহাস অন্য। ওই আইআইটিতে র্যাগিং হওয়ার পর আইআইটি ছেড়ে এসে ব্রেবোর্ন কলেজে ফিজিক্স পড়া আর তারপর আইএএস পরীক্ষা দিয়ে ভালো রেজাল্ট করে চাকরিতে ঢোকা। নাক উঁচু পূর্ণা ম্যাডামকে এই অফিস বিশেষ ভালো পায়নি। একইসঙ্গে, আইআইটি, লেডি ব্রেবোর্ন আবার ইউপিএসসি। তিনটে বড় বড় ব্র্যান্ড নেমে নাক আকাশে। বেজায় ভালো দেখতে উনি। তার ওপর এ তো আর সেই ক্যাশ ডিসবার্সমেন্টের যুগ না, দু’ হাজার দশের পর থেকে দেশ যেমন ডিজিটাল গতিতে চলছে, পূর্ণা ম্যাডামের মতো বাত্তিওয়ালা লেখাপড়া শেখারাও তেমনই লেখাপড়ার পাশাপাশি রূপচর্চাতেও সেরা। সকালে জিমে যান কোমরবন্ধনীতে জলের বোতল এঁটে। গায়ে থাকে কালো টাইট স্পোর্টস ওয়্যার। বিশেষ একটা জিম। যেখানে ফিলিমস্টারেরাই যায়। আর কোচ থাকে সুদর্শন, সারাগায়ে ট্যাটু করা বেজায় ভালো ইংরেজি বলা টাইগারদা।
পূর্ণা ম্যামের চিকন চামড়ার দেখভাল করত পার্কস্ট্রিটের শ্রেষ্ঠ স্পা, বালিগঞ্জের দামি বিউটি পার্লার। এহেন রূপে লক্ষ্মী গুণে সরস্বতীকে একেবারেই ‘পায়নি’ এ অফিস। চিনতে পারেনি বলার চেয়েও, পায়নি বলাই ভালো। মানে, ওই যে কেমন আড়ে আড়ে ঠারে ঠারে থাকা, সরে থাকা, সবার থেকে আলাদা নিজেকে রেখে চলা। আর কথায় কথায় স্বাস্থ্যকর লাইফস্টাইল, প্লাস্টিক বর্জন, ওটস আর মিলেট খাওয়ার গুণাগুণ বর্ণনা। এ অফিসে বাবা কথায় কথায় পার্টি। আজ অমুকের ছেলের পাশের খাওয়া, তো কাল কেউ এরিয়ার পেল বিশাল টাকার, তার সেলিব্রেশন। পাত পেড়ে পোলাও, পাঁঠা, একেবারে পাঁপড় চাটনি পর্যন্ত চাই। শেষ পাতে হরিধনের হুগলির ইন্টিরিয়র থেকে আনা কাঁচাগোল্লা সন্দেশ। সন্দেশের সঙ্গে একটা করে ফোন নং লেখা কুপন। পরানসুখের মিষ্টি ব্যবসায়ী গোষ্ঠ ঘোষের বিজনেস স্ট্রাটেজি। মানকুণ্ডু থেকে দু’পা।
তো পূর্ণা ম্যাডাম এসেই, একটা ঘিনঘিনে মুখ করে, সবরকমের দুপুরের খাওয়ায় নিজে পার্টিসিপেট করা বন্ধ তো করলেনই, তারপর একসময় এইসব খাওয়াদাওয়া অর্গানাইজ করার ব্যাপারেও নিষেধাজ্ঞা নামিয়ে আনলেন।
এরপরেও কেউ আশা করে অফিসের লোক পিলপিল করে ওঁর ভক্ত হয়ে যাবে? ওঁকে ভালোবাসবে? এমন সাদা ফ্যাকাশে ব্লটিং পেপার ব্যক্তিত্বকে আর কবে দেখেছে।
একমাত্র ওঁর ফেয়ারওয়েলেই ভিড় হবে। সব্বাই হাঁফ ছেড়ে বাঁচে উনি গেলে।
তবে কি না, পূর্ণাকে পঁয়তাল্লিশেও দেখতে তরুণী লাগে। জয়া ম্যাডামের উল্টো। তিনি তো আবার কুড়িতেই বুড়ি ছিলেন।
পূর্ণাকে না জানিয়ে এখন সঙ্গোপনে, মাঝে মাঝে চোরাগোপ্তা ফিস্টি করা চালু হয়েছে। পাত পেড়ে খাওয়া না। অফিসে উনুন জ্বেলে রান্না না। ধোঁয়াধুলো না। সবার ডেস্কে পৌঁছয় প্যাকেট। এটার পেছনেও হরিধন। তার গোষ্ঠ ঘোষ নামক আবিষ্কারটা যবে থেকে ফেটে গেল তবে থেকেই।
ক্লাউড কিচেনের আইডিয়া ছিলই গোলাপিরানি দাসীর। সে হরিধনের শ্যালিকা। ইউটিউবে সে ‘গ্রামবাংলার রান্নাঘরের’ একের পর এক আইটেম রেঁধে দেখায়। সবকটাই সুপার হিট। এই আজ পটল চিংড়ি তো কাল নারকেল সর্ষে দিয়ে কচুবাটা। খোলা উঠোনে কাঠের জ্বালে বিশাল লোহার কড়ায় রান্না, ছবি তুলে দেয়। আসল রান্না ভেতর ঘরে উজ্জ্বলা স্কিমের গ্যাসে স্টিলের বাসনেই হয়। সরকার উজ্জ্বলা দিচ্ছে আর লোকে গাদা গাদালাইক মারছে কাঠের জ্বালের ঝুটো ভিডিওতে। কালে কালে এসব ফেকুবাজি বাড়বে।
হরিধন গোলাপির শ্বশুরবাড়িতে কালো ডাব্বা সাপ্লাই দিতে যায়। গোলাপির আসল নামও আলাদা। মিতালি। সে নাম কেউ খাবে না। তাই নাম বদল। সে গোড়ালি থেকে উঁচু করে রঙিন শাড়ি পরে, ব্লাউজের ভেতর আঁচলের একটা কোনা বেশ করে গুঁজে রাখে। একটা গ্রামীণ হট ইমেজ। রান্নার ভিডিও যাতে জমে যায়। ঘরে পরে থাকে আসলে রং চটে যাওয়া ম্যাক্সি। জ্যাঁইবাবুর অফিসে, যেদিন প্রথম খাবার রেঁধে পাঠিয়েছিল, কিছু টাকা জ্যাঁইবাবু কাট নিলেও, মিতালি দেখেছে ভালোই লাভ।
এবারের মেনু ছিল অসীমবাবুর ঘাড় ভেঙে। ওর মেয়ে থিয়েটার করত। নামকরা উদীয়মান ফিল্মস্টারকে বিয়ে করবে, এই ঘোষণা দিতেই সবাই ধরল, খাওয়াও। মেয়ে আর হবু জামাইও কিছুক্ষণের জন্য জয়েন করল। লাল পাঞ্জাবি আর কালো চশমায় উদীয়মান এলেন। মেনু ছিল বাসন্তী পোলাও, কাতলামাছের কালিয়া আর চিকেন রেজালা। মাটন না হওয়ায় কেউ কেউ বিক্ষুব্ধপার্টি ছিল কিন্তু মাছ আর চিকেন দুটোই থাকায় তাদের মুখ বন্ধ হয়ে গেল। সব ওই গোলাপিরানি দাসীর ক্লাউড কিচেনের।
আজ বেলা করে অফিসে এসেছে হরিধন। অসুবিধা হয়নি। আজ অসীমবাবু দামি মিষ্টি স্পনসর করেছে, মালাই চমচম।সেজন্যেই দু-চারদিন আগে এক গলা কাশবন ঠেঙিয়ে আবার যেতে হল পরানসুখে। গোষ্ঠ ঘোষের কারখানা। কী বিষ্টি এদিকে। ফুল ভাদ্দর মাস। আকাশ মেঘে ডগোমগো। এদিকে রোদ উঠকে কপাল চড়চড়।
একশো আশি প্লেট মালাই চমচম, দাদা, পরশু। পারবেন সাপ্লাই দিতে?
চশমার ওপর দিয়ে জহর রায় ইস্টাইলে দেখল গোষ্ঠ ঘোষ।
পয়োধি। ওটাকে আমি ডাকি পয়োধি।
চিলতে হাসি ফুটে উঠল।
গাড়ি লাগবে? গাড়ি?
গোষ্ঠ ঘোষ হাসিটা আর একটু চওড়া করল।
ইয়ে মানে গাড়ি!
না না, চার্জ বেশি লাগবে না। দুশো এক্সট্রা দিয়ে দিও তাহলেই হবে।
দোনোমোনো দেখে গোষ্ঠ ঘোষ ক্লিয়ার করল।
মিষ্টিটা যদিও আমি হিট সিল করা ছোট ছোট প্লাস্টিকের বাটিতেই দেব, তাও ছলকে যাওয়ার ভয় থাকে তো একটা! আমার গাড়ি যাচ্ছে ওদিকে। নেবে?
ছানার কাটলেট দুধে ভাসমান। ওপরে হলুদ গুঁড়ো ছড়ানো। বলে নাকি আসল কেশর। যাইহোক।
হরিধন ঢোক গিলল। পরের প্রস্তাবটা বলল। এসব ব্যাপারে ওর মাথা খুব দ্রুত খেলে।
আরেকটা অর্ডারও যাবে। নিতে দেবেন?
কী অর্ডার?
মাছ মাংস। আমিষ নিরামিষ ছোঁয়াছুয়ির সমস্যা নেই তো?
আরে কে দেখতে যাচ্ছে। ভাড়াটা যে বেশি পড়ে যাবে হে। পাঁচশোই দিও।
গোষ্ঠ ঘোষ নিজের উদ্যোগে গাড়িতে করে পাঠিয়েছে। চারচাকামল, সিট নেই, পুরোটাই মিষ্টির গামলা! টালিগঞ্জের একজনের বড় অর্ডার ছিল একটা। সেজন্যেই গোষ্ঠর দাক্ষিণ্য!পুরো মাতৃভূমি বাম্পার লটারি! ভাবা যায়!
সঙ্গে এক সাইডে গোলাপির প্যাক করা ব্ল্যাক ডাব্বায় মাছ, চিকেন, বাসন্তী পোলাও।
এবারও হিরো সেই হরিধন।
পূর্ণা ম্যাডামের খাস বেয়ারা, এখন আর বেয়ারা বলে না। এমটিএস, সুকান্ত এখনকার ছেলে। সারাদিন ফোন দেখে। কত আর বুদ্ধি হবে।
ফস করে ম্যাডামের ঘরেও এক সেট বাসন্তী পোলাও আর মাছ, মাংস, মিষ্টি সমেত ট্রেতে করে ঢুকিয়ে দিল ওঁর লাঞ্চ টাইমে! কেউ জানেও না। হরিধন তো জানেই না।
ঠিক কুড়ি মিনিট পরে ডাক পড়ল হরিধনের, ম্যাডামের ঘরে।
সব শুনে নিয়ে ততক্ষণে তার হাত পা কাঁপতে শুরু করেছে। আজ তো হয়ে গেল তার। দিব্য গুছিয়ে আনা ব্যবসাটা... কেলেঙ্কারি।
বিশাল বড় হলঘরের এক কোনায়ম্যাডাম।
‘তোমার নাম হরিধন?’
‘আজ্ঞে!’
‘ফিষ্টি করা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল না এই অফিসে?’
‘হ্যাঁ তো ম্যাডাম! বন্ধই তো আছে।’
‘ও।’ থমকালেন ম্যাডাম।
‘তাহলে এসব খাবার?’
‘ও ও তো অসীমবাবু খাওয়ালেন। ওনার সেলিববেশন।’
‘কে একটা বলল তুমি নাকি এনেছ?’
‘ইয়ে মানে আমার শালি কেলাউড কিচেন করে।’
ম্যাডামের মুখে একটা হাসি ফুটে উঠল।
‘ওরে বাবা ক্লাউড কিচেন?’
‘আজ্ঞে, ওর তো ইউটিউব চ্যানেল আছে। দেড় লাখ ফলোয়ার।’
ম্যাডাম চুপ। বেশ খানিক পরে বললেন,
‘মিষ্টিটা খুব ভালো। পিওর।’
এবার ভারমুক্ত হরিধন। হেসে ঘাড় ঝুঁকিয়ে ফেলল। আপনাদের খাইয়ে আমাদের তৃপ্তি। দেশের জিনিস।
প্রতিদিন একঘণ্টা ট্রেন, কুড়ি মিনিট ফেরি। গঙ্গা পার হয়ে হেঁটে অফিস আসে। রোজ দেরি। কত লাল দাগ দিবি দে। আমরা গাঙ্গেয় উপত্যকার লোক। আসল দুধ ঘি খাওয়া শরীর।
চলে যাবে বলে ঘুরে দাঁড়াচ্ছিল। ম্যাডাম আবার থামালেন।
‘আর শোন, কালো প্লাস্টিকের ডাব্বা সব রিসাইকল প্লাস্টিকে হয়। বিষ ওগুলো। তোমার ক্লাউড কিচেনকে বলবে একটু দামি ডাব্বায় দিতে। আমার বাড়িতে পার্টি হবে পুজোর সময়।খাবার নেব। ইউটিউবের লিংকটা একটু দিয়ে দিও তো আমার পি এস চন্দ্রানীকে।’
ফেরার পথে ফুরফুর করে উড়ছিল হরিধন। ট্রেন চলেছে ঝমাঝম। কামরার জানালা দিয়ে শুধু কাশ ফুলের ঝাড় দেখতে পাচ্ছে চারদিকে।
ও পেয়ে গেছে। পুজোর বোনাস।