Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রাজ্য

ষষ্ঠী নয়, সপ্তমী থেকে পুজো শুরু চাপড়ার ব্রহ্ম পরিবারে, মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষজন অংশ নেন

মহাষষ্ঠীতে নৌকায় কৃষ্ণনগরের দিকে যাচ্ছিলেন ব্যবসায়ী লক্ষ্মীকান্ত ব্রহ্ম। বহিরগাছি ঘাটের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় সেখানে তিনি ঘুমিয়ে পড়েন। ঘুমন্ত অবস্থায় দেবীর স্বপ্নাদেশ পান।

ষষ্ঠী নয়, সপ্তমী থেকে পুজো শুরু চাপড়ার ব্রহ্ম পরিবারে, মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষজন অংশ নেন
  • ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

নিজস্ব প্রতিনিধি, কৃষ্ণনগর: মহাষষ্ঠীতে নৌকায় কৃষ্ণনগরের দিকে যাচ্ছিলেন ব্যবসায়ী লক্ষ্মীকান্ত ব্রহ্ম। বহিরগাছি ঘাটের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় সেখানে তিনি ঘুমিয়ে পড়েন। ঘুমন্ত অবস্থায় দেবীর স্বপ্নাদেশ পান। দেবী লক্ষ্মীকান্তকে বলেন,পাশের কাশবনে আমি রয়েছি, আমাকে বাড়ি নিয়ে চলো এবং প্রতিষ্ঠা করো। ঘুম ভেঙে গিয়ে তৎক্ষণাৎ ওই ব্যবসায়ী মাঝিকে নদী ঘাটে নৌকো নোঙর করতে বলেন। ঘাটে নৌকা ভিড়তেই সত্যিই লক্ষ্মীকান্ত দেখেন সেখানে একটি দুর্গা প্রতিমা প‌঩ড়ে রয়েছে।  খোঁজ নিয়ে জানতে পারেনওই প্রতিমা এক পরিবারের পুজোর জন্য তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সেই পরিবারের এক তরুণ সাপের কামড়ে মারা যাওয়ায় শোকগ্রস্ত অবস্থায় সদস্যরা প্রতিমার বিসর্জন না দিয়ে সেখানেই ফেলে রেখে চলে যায়। লক্ষ্মীকান্ত দেবীর নির্দেশ মেনে প্রতিমা নিজের বাড়ি নিয়ে যান। কিন্তু তখন তো ষষ্ঠীপুজো হয়ে গিয়েছে। আর সেইদিন থেকেই নদীয়ার চাপড়ার এই ঐতিহ্যের দুর্গাপুজোয় ষষ্ঠী ঠাকুরনের পুজো হয় না। চাপড়ার ব্রহ্মবাড়ির এই পুজো শুধু এক পরিবারের নয়, গোটা এলাকার হৃদয়ের স্পন্দন। পুজোর ক’টা দিন এখানে জাতি, বর্ণ, ধর্মের সব ভেদাভেদ মুছে যায়। গ্রামের প্রতিটি মানুষ হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সমানভাবে যুক্ত হন দেবীর আরাধনায়।ব্রহ্মবাড়ির পুজো ২৭০ বছরেরও বেশি প্রাচীন। এই পরিবারের আদি পদবি ছিল দে চৌধুরী। তাঁদের আদি নিবাস উত্তর ২৪ পরগনার হালিশহরে। তখন বাংলায় ইংরেজ শাসন পুরোপুরি জাঁকিয়ে বসতে পারেনি। রাজস্বছিল মুঘল নবাবদের হাতে। নবাব মুর্শিদকুলি খাঁর সময়ে বাংলার রাজস্ব সরাসরি দিল্লি পাঠানো হতো। এই দে চৌধুরী পরিবারের সুতোর কারবার ছিল। ব্যবসার প্রয়োজনে তাঁরা নদীয়ার হৃদয়পুরের সুতিয়ায় (বর্তমানে সুটিয়া) বসতি স্থাপন করেন এবং ধীরে ধীরে সেখানে জমিদারি গড়ে তোলেন। পরে তাঁদের পরিবার ‘ব্রহ্ম’ উপাধি লাভ করে।

Advertisement

ষষ্ঠীর দিনে পরিবারের মহিলারা মাছ খেয়ে সপ্তমী থেকে পুজো শুরু করেন। সপ্তমীতে যে হোমের অগ্নি জ্বলে ওঠে, তা নবমী পর্যন্ত অক্ষয়ভাবে জ্বলতে থাকে।সাধারণত দশভুজা মায়ের দশটি অস্ত্র দেখা যায়। কিন্তু ব্রহ্মবাড়ির প্রতিমায় কেবল দুই হাতই দৃশ্যমান। বাকি আটহাত ঢাকা মায়ের কালো কেশরাশির আড়ালে। এইপুজোর ভোগেও রয়েছে ভিন্নতা। এখানে পাঁঠা বলির চল নেই। বদলে আখ ও চালকুমড়োর বলি হয়। দেবীর নৈবেদ্যে প্রতিদিন গুড়ের সন্দেশ দেওয়া হয়। যা পাঁঠা সন্দেশ নামেওপরিচিত। সপ্তমী থেকে নবমী প্রতিদিন লুচি এবং নানা নিরামিষ পদে ভোগ সাজানো হয়।
পুজোর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্যসম্প্রীতি। পুজোর কাজ থেকে বিসর্জনের প্রস্তুতি সবেতেই মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ থাকে। চাপড়ার ব্রহ্মবাড়ির পুজোর এটিচিরন্তন ধারা। বিশেষ করে বিসর্জনের সময় এই সম্প্রীতির রূপ সবচেয়ে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।  
পরিবারের বর্তমান সদস্য সুকদেব ব্রহ্মর কথায়, আগের জৌলুস আর নেই। তবে শাস্ত্র মেনে নিষ্ঠাভরেআজও আমরা পুজো করি। সবচেয়ে বড় আনন্দের বিষয়, এখানে পুজোয় 
সব সম্প্রদায়ের মানুষ সমানভাবে অংশ নেন।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ