ইসলামাবাদ ও কাবুল: জ্বলছে নিয়ন্ত্রণ রেখা ‘ডুরান্ড লাইন’। তুমুল যুদ্ধ শুরু পাক-আফগান সীমান্তে। সপ্তাহখানেক ধরেই চলছিল হামলা-পালটা হামলার পর্ব। শুক্রবার তা চরমে পৌঁছে গেল। প্রত্যাঘাতের অছিলায় আফগানিস্তানের তালিবান সরকারের বিরুদ্ধে ‘খোলাখুলি’ যুদ্ধ ঘোষণা করলেন পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খোয়াজা আসিফ। এদিন ভোররাত থেকে অপারেশন ‘গজব লিল হক’ শুরু করেছে পাক সেনা। এয়ারস্ট্রাইক চালিয়েছে আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলে। আকাশপথে হামলা চলেছে কান্দাহার ও পাকতিয়াতেও। পাকিস্তানের দাবি, তাদের হামলায় ২৭০ জন আফগান যোদ্ধার মৃত্যু হয়েছে। জখম অন্তত ৪০০ জন। পালটা তালিবান জানিয়েছে, ৫৫ জন পাকিস্তানি সেনাকে খতম করেছে তাদের বাহিনী। ডুরান্ড লাইন সংলগ্ন বেশ কয়েকটি পাক সেনা ছাউনি তারা দখল করে নিয়েছে। ইসলামাবাদের একটি যুদ্ধবিমানও ধ্বংস করার দাবি জানানো হয়েছে কাবুলের তরফে। সেটি এফ-১৬ ফাইটার জেট বলেও জল্পনা চলছে বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ায়। তবে পাকিস্তান সরকারিভাবে সেকথা স্বীকার করেনি।
এই সব চাপানউতোরের মধ্যেই কান্দাহারে পাক বিমান হানা ঘিরে চর্চা তুঙ্গে। কারণ, তালিবান শীর্ষ নেতৃত্বের খাসতালুক আফগানিস্তানের এই শহরটি। সেখানে এয়ারস্ট্রাইকে আফগান তালিবানের সর্বোচ্চ নেতা হিবাতুল্লা আখুন্দজাদার মৃত্যু হয়েছে বলে রিপোর্ট একটি ইউরোপীয় থিঙ্কট্যাঙ্কের। বিষয়টি নিয়ে তুমুল আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে এবিষয়ে রাত পর্যন্ত কোনো সরকারি বয়ান সামনে আসেনি। সংঘাতের এই আবহেই আফগান তালিবান তাদের আত্মঘাতী বাহিনীকে প্রস্তুত করছে বলেও বিভিন্ন সূত্রে খবর।
পরমাণু শক্তিধর পাকিস্তানের সঙ্গে আফগানিস্তানের যুদ্ধ ঘিরে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্নের মুখে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা। সংঘাত থামাতে মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিয়েছে ইরান। পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে রাষ্ট্রসংঘ। চীন ও রাশিয়া আবার কূটনৈতিক ও শান্তিপূর্ণভাবে বিবাদ মেটানোর পক্ষে। পবিত্র রমজান মাসে পাকিস্তান যেভাবে এয়ারস্ট্রাইক চালিয়েছে আফগানিস্তানে, তার তীব্র নিন্দা করেছে ভারত। বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল এক্স হ্যান্ডলে লিখেছেন, ‘এটা পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ ব্যর্থতা ধামাচাপা দেওয়ার আরও একটা ফিকির। আফগানিস্তানের সার্বভৌমত্ব, অখণ্ডতা ও স্বাধীনতার প্রতি ভারতের পূর্ণ সমর্থন রয়েছে।’
এত বড়ো সংঘাতের সূত্রপাত কীভাবে? ক’দিন আগেই সীমান্তের ওপারে এক দফা এয়ারস্ট্রাইক চালিয়েছিল পাকিস্তান। ইসলামাবাদের সাফাই ছিল, আফগানিস্তানের মাটিতে আশ্রয় নেওয়া পাকিস্তানি তালিবানকে নিশানা বানানো হয়েছে। যদিও এই হামলাকে দেশের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন বলে দাবি করে আফগান তালিবান নেতৃত্ব। সেই সূত্রেই ডুরান্ড লাইন বরাবর পাকিস্তানের একাধিক সেনাঘাঁটিকে তারা নিশানা বানায়। সীমান্তে দু’পক্ষের তুমুল গোলাগুলির মধ্যেই কাবুল সহ আফগানিস্তানের একাধিক শহরে এয়ারস্ট্রাইক চালিয়েছে পাকিস্তান। এর আগে কাতারের মধ্যস্থতায় অক্টোবর মাসে পাক-আফগান সংঘর্ষ বিরতি যে পুরোপুরি ঠুনকো ছিল, বর্তমান পরিস্থিতিই তার প্রমাণ। পাক প্রতিরক্ষামন্ত্রী খোয়াজা আসিফ এদিন বলেছেন, ‘আমাদের ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙে গিয়েছে। এখন খোলাখুলি যুদ্ধ শুরু হয়েছে। এবার দমা দম মস্ত কলন্দর হবে।’ আফগানিস্তানের তালিবান সরকারের মুখপাত্র জাবিউল্লা মুজাহিদ জানিয়েছেন, পাক বিমানহানা চলেছে কান্দাহার ও পাকতিয়াতেও। একটি সূত্রের খবর, মূলত তালিবান শীর্ষ নেতৃত্বকেই নিশানা বানানোর চেষ্টা করেছে ইসলামাবাদ। এয়ারস্ট্রাইকে আফগানিস্তানের একটি হাসপাতালও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে দাবি। এক আফগান আধিকারিক বলেছেন, তোখরাম সীমান্ত ক্রসিংয়ে বহু সাধারণ নাগরিক জখম হয়েছেন। নানগারহার প্রদেশে একটি উদ্বাস্তু শিবিরে মর্টার শেলের আঘাতে অন্তত সাতজন জখম হয়েছেন।