পিনাকী ধোলে, পুরুলিয়া: বাঙালির জীবনে নববর্ষের আবেগ ও ঐতিহ্য বরাবরই অন্যরকম। সকল দুঃখ-গ্লানি ও জরা মুছে ফেলে পুরনো বছরকে বিদায় এবং নতুন বছরকে বরণ করার লক্ষ্যেই শতশত বছর ধরে বাঙালি জাতি উদযাপন করে আসছে বাংলা নববর্ষ। বাঙালির কাছে বাংলা নববর্ষ মানেই হালখাতা, দোকানে দোকানে মিষ্টির প্যাকেটের সঙ্গে ক্যালেন্ডার বিলি, নতুন জামাকাপড়, কব্জি ডুবিয়ে খাওয়াদাওয়া। কিন্তু, করোনা পরবর্তী সময়ে কোথাও যেন সেই সুর কেটে গিয়েছে। মোবাইলের জমানায় নতুন প্রজন্মের কাছে যেমন চাহিদা নেই ক্যালেন্ডারের, তেমনই হালখাতার জাঁকজমকও অনেকটাই কেটে গিয়েছে।
পুরুলিয়ার শহর থেকে মফস্সলের বিভিন্ন ছাপাখানাগুলিতে আজ থেকে কয়েক বছর আগেও নববর্ষের আগে যে ব্যস্ততা চোখে পড়ত, তা এখন আর দেখা যায় না। একইসঙ্গে মূল্যবৃদ্ধির বাজারে ক্যালেন্ডারে সেই বৈচিত্র্যও আর খুঁজে পাওয়া যায় না। নামমাত্র আয়োজনের মধ্য দিয়েই ব্যবসায়ীরা সারছেন হালখাতা। পুরুলিয়া শহরের একটি ছাপাখানার কর্মী রাজু মাহাত বলেন, আগে নববর্ষে দেবদেবী বিশেষত লক্ষ্মী গণেশের ছবি দেওয়া ক্যালেন্ডারের বেশি চাহিদা থাকত। কিন্তু, এখন সেই চাহিদা তলানিতে ঠেকেছে। বিশেষ করে করোনার সময় হালখাতার উৎসব বন্ধ থাকায় যে ছন্দপতন ঘটেছিল, তা পূরণ হয়নি আজও। আর এক কর্মীর দাবি, আগে গ্রামের দোকানগুলি থেকে ব্যাপক অর্ডার আসত ক্যালেন্ডারের। এবছর আর ক্যালেন্ডারের অর্ডার সেইভাবে হয়নি। তার তুলনায় ইংরেজি নববর্ষের অর্ডার ভালো হয়!
শহরের প্রবীণ ব্যবসায়ীরা তাঁদের স্মৃতিচারণে বলছেন, নববর্ষ মানেই নতুন খাতায় মঙ্গলচিহ্ন এঁকে লক্ষ্মী-গণেশের পুজো দিয়ে হালখাতার সূচনা। সাজোসাজো রব লক্ষ্য করা যেত বাঙালি দোকানগুলিতে। শুধু তাই নয়, সেকালে অতিথি-অভ্যাগতদের জন্যও থাকত দরাজ আয়োজন। খদ্দের হালখাতা করতে দোকানে এলেই প্রথমেই দেওয়া হত ঠান্ডা শরবত, থাকত মিষ্টি-সহ ভূরিভোজের ব্যবস্থা। কিন্তু, এখন সেই জাঁকজমক কমে গিয়েছে অনেকটাই। চিরাচরিত প্রথাও হারিয়ে যেতে বসেছে। সেই লাল কাপড়ে মোড়া ঐতিহ্যবাহী হালখাতাও যেন ক্রমশই বিলুপ্তির পথে। জিএসটির চক্করে বড় বড় দোকানগুলিতে হালখাতার জায়গা নিয়েছে কম্পিউটার। পুরুলিয়া শহরের বাসিন্দা ষাটোর্ধ্ব উমাপদ মাহাতর কথায়, আমাদের কাছে পয়লা বৈশাখ বলতে একটা আলাদা অনুভূতি হতো। আগে হালখাতা সেরে কেউ ফিরলে বাড়ির ছোটদের মধ্যে ক্যালেন্ডার দেখা নিয়ে হুড়োহুড়ি পড়ে যেত। কিন্তু, আমার ছেলেমেয়েদের সেই উন্মাদনা নেই। এই দিনটার আলাদা করে কোনও গুরুত্বও দেখতে পাই না। তার থেকে বরং ইংরেজি নববর্ষ নিয়েই মাতামাতি বেশি।