সুখেন্দু পাল, বর্ধমান: ‘ক্ষমা করো নাথ, ক্ষমা করো...।’ রবি ঠাকুরের ‘শ্যামা’ নাটকটিতে অভিনয় করতে গিয়ে সেদিন যেন নিজের জীবনগাথাই ফুটিয়ে তুলেছিলেন মনুয়া মজুমদার। বর্ধমানে উৎসব ময়দানে তখন হাততালির ঝড়। মনুয়ার কাতর আর্তির মধ্যে যেন রবি ঠাকুরের ‘শ্যামা’কেই খুঁজে পেয়েছিলেন দর্শকরা। এবার মনুয়াকে তাঁরা দেখবেন রুদ্ররূপে। ‘দুর্গতিনাশিনী’ নাটকে। দুর্গার চরিত্রে অভিনয় করবেন তিনি। হয়ে উঠবেন অশুভ শক্তি বিনাশের প্রতীক।
মনুয়া কি সত্যিই কোনওদিন ভেবেছিল, তাঁর চলমান জীবনের সঙ্গে নিজের শিল্পীসত্ত্বার কখনও মিল ঘটবে, আবার কখনও অমিল? ‘শ্যামা’র ভূমিকায় তিনি যেন কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করছিলেন ঈশ্বরের কাছে। আর ‘দুর্গতিনাশিনী’র দুর্গার চরিত্রে তিনি বিনাশ চাইবেন সমাজের যাবতীয় অশুভ শক্তির! এ এক অদ্ভুত বৈপরিত্য তাঁর জীবনে! ২০১৭ সালের ২ মে’র রাত। বাপের বাড়িতে মনুয়া। স্বামী অনুপম সিংয়ের ঘরে ঘাপটি মেরে বসে প্রেমিক অজিত। সব প্ল্যান ঠিকঠাক। অনুপম ঘরে ঢুকলেই ঝাঁপিয়ে পড়বে অজিত। মেরে ফেলার মুহূর্তে অন্তিম জীবন যন্ত্রণায় ছটফট করবেন স্বামী। তাঁর সেই নিদারুণ যন্ত্রণার আওয়াজ ফোনে শোনাতে হবে মনুয়াকে। প্রেয়সীর এমন আবদারকে প্রত্যাখ্যান করেনি অজিত। ফোনের ওপারে স্বামীর মৃত্যুযন্ত্রণার আওয়াজ শুনে মনুয়া হয়তো আশ্বস্ত করে প্রেমিককে বলেছিল, এবার আপদ গিয়েছে! মনের ভিতর কতটা অশুভ শক্তির মজুত ঘটলে এতটা প্রস্তর কঠিন হওয়া যায়, সেটা ভেবেই তখন শিউরে উঠেছিলেন রাজ্যবাসী। কাকদ্বীপ থেকে কলিম্পং—কেঁপে উঠেছিল মনুয়ার নির্মম মনের কথা জেনে। তার কঠোর শাস্তির দাবিতে সরব হয়েছিলেন সকলেই। সেই মনুয়াই কি না ‘মহিষাসুর বধ’ করে সমাজকে বার্তা দেবেন অশুভ শক্তি বিনাশের! এবারও তাঁর জীবনের এমন বিপরীত ধর্মী চরিত্র অসম্ভব দক্ষতায় ফুটিয়ে তুলবেন বলে আশাবাদী বর্ধমান সংশোধনাগার কর্তৃপক্ষ।
বন্দিদের জীবন বদলানোর নানা কর্মসূচি নিয়ে থাকে সংশোধনাগার কর্তৃপক্ষ। উদ্দেশ্য একটাই—অতীতের কৃতকর্ম ভুলে সাজাপ্রাপ্ত বন্দিরা যাতে সমাজের মূলস্রোতে ফেরে। সেই মতো এবার পুজোয় তাদের একাধিক অনুষ্ঠান আয়োজনের মধ্যে অন্যতম ‘দুগতিনাশিনী’ নাটক। জেলে চলছে মহড়া। যাবজ্জবীন সাজাপ্রাপ্ত আসমিরা নাটকে অভিনয় করবে। তাদের কেউ কার্তিক, কেউ আবার মহিষাসুর সাজবে। মূল চরিত্রে মনুয়া। প্রশিক্ষক বলছিলেন, ‘মনুয়ার মধ্যে নানা প্রতিভা রয়েছে। বিশেষ করে ওর নাচ সবাইকে মুগ্ধ করে। নাটকেও দুর্দান্ত অভিনয় করে। তাই ওকে এবার দুর্গার ভূমিকায় বেছে নেওয়া হয়েছে।’ এক আধিকারিকের কথায়, ‘সংশোধনাগারে থেকে অনেক খুনের আসামিই বদলে গিয়েছে। তবে, মনুয়ার পরিবর্তন চোখে পড়ার মতো। সে সংশোধানাগার ছাড়াও বিভিন্ন জায়গায় অনুষ্ঠানে অংশ গ্রহণ করে। সংশোধনাগারে সে এখন কার্যত ‘মুক্ত’। নাচের মহড়া বা গানের রেওয়াজ সারে নিজের মতো করে। এখন সে দুর্গা। মহড়ার মঞ্চে তার কখনও রুদ্ররূপ। আবার কখনও সে আশিস রূপে। সব চরিত্রই ওর সঙ্গে মানানসই।’
আসলে, মনুয়ার অনেক গুণ। তার মাছে শুধু কাঁটার মতো বিঁধে রয়েছে ‘স্বামী ঘাতক’-এর তকমা!