Bartaman Logo
৩১ মে, ২০২৬
বর্তমান / রাজ্য

সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রেম, ঘর ছেড়ে ভিনরাজ্যে নাবালিকারা, শুধু গলসি থানায় উদ্ধার ২৬ জন

সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রেম, ঘর ছেড়ে ভিনরাজ্যে নাবালিকারা, শুধু গলসি থানায় উদ্ধার ২৬ জন
  • ১০ এপ্রিল, ২০২৫ ০৪:০০

নিজস্ব প্রতিনিধি,  বর্ধমান: প্রেম মানে না সীমানা। তা বলে দেখা-সাক্ষাৎ না করেও প্রেম! চেনা নেই, জানা নেই। সোশ্যাল মিডিয়ায় আলাপ, পরিচয়। গলসির প্রত্যন্ত গ্রামের পুকুরপাড়ে বসে তামিলনাড়ুর কোনও যুবকের সঙ্গে কথাবার্তা। তাতেই মন গলে জল! অতঃপর, একদিন বাড়ি থেকে চম্পট। কোথায় উঠবে? মনের মানুষের কাছে ঠাঁই পাবে কি না—এসবে হুঁশ নেই। পালিয়ে যেতে পারলেই যেন মুক্তি! মা-বাবার বকুনি নেই। পড়াশোনার চাপ নেই। অদ্ভুদ এক স্বপ্নের ঘোরে কেউ পালাচ্ছে কেরলে, কেউ রাজস্থানে, কেউ আবার তামিলনাড়ু, বিহার কিংবা অসমে। তালিকা বেশ দীর্ঘ। সবাই প্রায় নাবালিকা! আর এই ভার্চুয়ালি প্রেম-পাগল নাবালিকাদের ধরে বেঁধে আনতে এখন নাভিশ্বাস উঠছে পুলিসের। জানা গিয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে শুধু গলসি থানা এলাকার ২৬ জন নাবালিকাকে বিভিন্ন রাজ্য থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। তুলে দেওয়া হয়েছে তাদের পরিবারের হাতে। পালিয়ে যাওয়ার সংখ্যাটা অবশ্য আরও বেশি। তাদের সন্ধান পেতে তদন্ত-তল্লাশি জারি রেখেছে পুলিস। গোটা বিষয়টিকে গভীর সামাজিক সঙ্কট বলে মনে করছেন সমাজ বিজ্ঞানীরা। দুষছেন সোশ্যাল মিডিয়ার একাধিক প্ল্যাটফর্মকে। 

Advertisement

গলসি থানা একটি উদাহরণ মাত্র। জেলার অন্যান্য প্রান্তেও ভার্চুয়ালি প্রেম ও পালানোর ঘটনা অহরহ ঘটছে। ঘরোয়া আড্ডায় এক পুলিস আধিকারিক বলছিলেন, ‘নাবালিকা মানে বয়ঃসন্ধিকাল। এই সময়ে প্রেমে পড়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু, আগে নিজের জেলা বা রাজ্যের বাইরে  নাবালিকারা যেত না। যাওয়ার সুযোগও থাকত না। এখন তারা যাবতীয় ভয়ভীতি দূরে সরিয়ে রেখে দিব্যি ভিন রাজ্যে চলে যাচ্ছে। কারণ একটাই, সোশ্যাল মিডিয়া প্রেমের দখিন দুয়ার খুলে দিয়েছে।’ প্রথমে হাই, হ্যালো দিয়ে চ্যাট শুরু। তারপরেই তারা জড়িয়ে যাচ্ছে প্রেমের জালে। অপরপ্রান্তের প্রেমিকের নানা লোভনীয় অফার, সংসার সুখের টোপ। স্রেফ মুখের কথায় বিশ্বাস। এমনও অনেক ঘটনা সামনে আসছে, যেখানে প্রেমিক শ্রমিকের হয়তো কাজ করে। অথচ, বেঙ্গালুরুর ঝকঝকে অফিসের নীচে দাঁড়িয়ে নাবালিকা প্রেমিকাকে দেখাচ্ছে, এখানে সে কাজ করে! মোটা মাস মাইনে। সবটাই ভার্চুয়ালি ভরসা! তাতেই পিতৃ-মাতৃস্নেহ, দাদা কিংবা ভাইয়ের ভালোবাসা ভুলে এক কাপড়ে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছে প্রেমিকের কাছে।  
পুলিস জানিয়েছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অভিভাবকরা অপহরণের মামলা করছে। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে নাবালিকারা স্বেচ্ছাতেই প্রেমিকের সঙ্গে ঘর ছাড়ছে। রীতিমতো আঁটঘাট বেঁধেই তারা আত্মগোপন করে থাকছে। বেশ কিছু টেকনিক্যাল বিষয় তারা আগেভাগেই জেনে যাচ্ছে। ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়ে মোবাইল ব্যবহার করছে না। পুলিস খুঁজতে গিয়ে বিপাকে পড়ছে। টাওয়ার লোকেশন মিলছে না। অনেক সময় হতোদ্যম হয়ে ফিরে আসতে হচ্ছে। অথবা, দু’ থেকে তিন বছর পরও তাদের উদ্ধার করা হচ্ছে। তখন হয়তো কেউ কেউ সাবালিকাও হয়ে যাচ্ছে। গর্ভবতী হয়ে পড়ার নজিরও রয়েছে। কেউ আবার বিক্রিও হয়ে যাচ্ছে। ঠাঁই হচ্ছে কোনও নিষিদ্ধপল্লিতে।
পূর্ব বর্ধমানে জেলাশাসক আয়েশা রানি এ বলছিলেন, ‘নাবালিকাদের বিয়ে বন্ধ করার জন্য লাগাতার প্রচার চালানো হচ্ছে। স্কুলছুটদের নতুন করে শিক্ষার আঙিনায় ফেরানোর প্রচেষ্টাও চলছে। সরকার মেয়েদের পড়াশোনা জন্য বিভিন্ন প্রকল্প এনেছে। উচ্চশিক্ষার জন্য সরকার স্টুডেন্ট ক্রেডিট কার্ড থেকে লোনেরও বন্দোবস্ত করেছে। তা ছাড়া ১৮ বছরের পর বিয়ে করলে রূপশ্রী প্রকল্প থেকেও টাকা পাওয়া যায়। এ নিয়ে অভিভাবকদেরও সচেতন হওয়া জরুরি।’
সম্প্রতি গলসির এক নাবালিকাকে রাজস্থানে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছিল। পরে তাকে উদ্ধার করে আনা হয়। এক পুলিস আধিকারিক বলেন, কয়েক মাস ভিন রাজ্যে প্রেমিকের সঙ্গে থাকার পর অনেকেই ঘরে ফিরতে চায়। কিন্তু ফেরার সুযোগ থাকে না। 

সম্পর্কিত সংবাদ