শ্রীভগবান্ যেমন মৎস্যাদি অনেক অবতাররূপ ধারণ করে সাধুগণের পরিত্রাণ ও পাপাদি নাশ করেন, সেইরূপ নামও তাঁর অবতার বিশেষ। যেরূপ কুরুসভায় দ্রৌপদীর লজ্জানিবারণের জন্য বস্ত্রাবতার, গোকুলে ব্রহ্মমোহনের জন্য বৎস ও গোপবালক অবতার, মন্দরাচল ধারণ করবার জন্য কূর্ম অবতার, তদ্রূপ নিখিল মানবগণকে উদ্ধার করবার জন্য নাম অবতার। উপাসনা চার প্রকার। নাম, রূপ, লীলা, ধাম। প্রত্যেকটিরই অপরিমিত শক্তি আছে, প্রত্যেকটিই সাক্ষাৎ শ্রীভগবান্ প্রথম নাম, দ্বিতীয় রূপ, তৃতীয় লীলা, চতুর্থ ধাম। যে কোন একটিতে নিষ্ঠা হলেই মানুষ গোষ্পদের ন্যায় ভবসাগর হতে উত্তীর্ণ হয়ে যায়। পরস্পর পরস্পরের সহিত সম্বন্ধবিশিষ্ট। একটি অবলম্বন করলেই ক্রমে সব কয়টি উপস্থিত হন।
মাতৃপূজার শ্রেষ্ঠউপচার চোখের জল, চোখের জল মা আমার যেমন আদর করে গ্রহণ করেন, এমন কোন জিনিষ লন না। ‘চোখের জলে মায়ের পূজা’ আমার বড় ভাল লাগে, তোমার অর্থ-সম্পদ কিছু নাই, তুমি চোখের জল দিয়েই মায়ের পূজা কর। তোমার পূজা মা আগে গ্রহণ করবেন।
প্রণালীমত সাধনা করলে মন্ত্র অবশ্যই সিদ্ধ হয়। তা নয়, আমি শাস্ত্রোপদেশ মত কিছু করব না, খেয়ালমত উপাসনা করব, আর একেবারে সোহং হয়ে পড়বো তা হয় না। ‘কলৌ ব্রহ্ম বদিষ্যন্তি ন করিষ্যন্তি কেচন; কলিতে মুখে ব্রহ্মাস্মি অনেকে বলবে কিন্তু তাহার সাধন কেহ করবে না।
শ্রদ্ধাবান্ শিষ্য সঙ্গে সঙ্গে মন্ত্র চৈতন্য না হলেও প্রাণপণে মন্ত্রকে ধরে থাকে। নিজের ত্রুটির দিকে লক্ষ্য করে; সদাচার, শুদ্ধ আহার, সৎগ্রন্থ পাঠ, সৎসঙ্গ ইত্যাদির দ্বারা নিজের দোষ দূর করবার চেষ্টা করে, গুরু অযোগ্য বলে যেখানে সেকানে কান পেতে দেয় না। নিজের বেদনা গুরুর চরণে নিবেদন ক’রে—মন্ত্রচৈতন্য কি করে হবে একথা তাঁকেই জিজ্ঞাসা করে। গুরুও শ্রদ্ধালু শিষ্যকে, শাস্ত্রে মন্ত্রচৈতন্যের যে পথ আছে সেই পথ ধরিয়ে দেন। মন্ত্রচৈতন্য হয়ে যায়। সাধক কৃতার্থ হয়। দ্বাদশাঙ্গে তিলক করিলে ত্বক্ শুদ্ধ হয়। মুনিগণ সমাধিবলে তিলক করিবার এমন স্থান নির্ণয় করিয়াছেন, সেই সেই স্থানে মৃত্তিকা লেপনে সমস্ত অঙ্গ পবিত্র হইবে এবং একাগ্রতা শক্তি বৃদ্ধি পাইবে। যেমন ললাটে তিলক করিলে সমস্ত মুখমণ্ডল পবিত্র হয়, বাহুতে যে স্থান নির্ণয় করিয়াছেন, তিলক করিলে সমস্ত বাহু পবিত্র হইবে। সিদ্ধুগুরুর দীক্ষার নাম নিরাধারা বা জ্ঞানবতী দীক্ষা। তাঁহাদের দীক্ষায় কোন দ্রব্যাদির প্রয়োজন হয় না। তিনি স্পর্শ, দৃষ্টি বা মনের দ্বারা শিষ্য-শরীরে শক্তি সঞ্চার করেন, তাহাতে তাহার মন্ত্র চৈতন্য হয়। সিদ্ধযোগ প্রাপ্ত শিষ্যকে পুরশ্চরণাদি করিতে হয় না। কুলকুণ্ডলিনী জাগরিতা হইয়া তাহার পূর্ব্বকর্ম অনুসারে পিপীলিকাগতিতে, মর্কট অথবা পক্ষীগতিতে সহস্রদল কমলে গমন করত পরম শিবের সহিত একীভূত হইয়া যান, সাধক কৃতার্থ হন, তাঁহার যাতায়াত নিবৃত্তি হয়। সত্যপ্রতিষ্ঠা বা চিত্তশুদ্ধির পর নাম গ্রহণ করিতে হয়—এরূপ কোন বিধি নাই! অতি পাতকী মহাপাতকীরও নাম করতে করতে চিত্তশুদ্ধি হয়—সত্যপ্রতিষ্ঠা হয়। নাম ভিন্ন এই দারুণ যুগে কে পবিত্র করবে? কার বলে চিত্ত শুদ্ধি হবে? হেলায় শ্রদ্ধায় নাম কর, নিশ্চয়ই তুমি মার কৃপা লাভ করবে।প্রথমে সাধুসঙ্গ কর—তোমার নামে রুচি হবে, তারপরে সর্ব্বদা নাম করবার চেষ্টা কর। প্রথমে তা পারবে না—ভুল হয়ে যাবে, তা হোক্ পুনরায় সাধুসঙ্গ করে উৎসাহ বাড়িয়ে নিয়ে নাম করবে, দুর্গা দুর্গা করতে করতে চিত্ত শুদ্ধি হয়ে যাবে।
ত্রিদণ্ডী স্বামী মাধব রামানুজ সংকলিত ‘শ্রীওঙ্কারসহস্রবাণী’ (২য় খণ্ড) থেকে