Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

লক্ষ্মীর ভাণ্ডার নিরঙ্কুশ, লক্ষ্য তাই ‘লক্ষ্মী’ ভোটারকুল

দোল পূর্ণিমার নিশি নির্মল আকাশ। ধীরে ধীরে বহিতেছে মলয় বাতাস।। উমাদেবী সরকারবাড়ির লক্ষ্মী। শ্বশুরমশাই তেমনটাই বলতেন। আর শুধু বলতেন না, বিশ্বাস করতেন। কারণ বছর কুড়ি আগে উমা ঘোষ বিয়ের পর সরকার হতেই ব্যবসা ফিরেছিল তাঁর।

লক্ষ্মীর ভাণ্ডার নিরঙ্কুশ, লক্ষ্য তাই ‘লক্ষ্মী’ ভোটারকুল
  • ৩ মার্চ, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

শান্তনু দত্তগুপ্ত: দোল পূর্ণিমার নিশি নির্মল আকাশ।

Advertisement

ধীরে ধীরে বহিতেছে মলয় বাতাস।।
উমাদেবী সরকারবাড়ির লক্ষ্মী। শ্বশুরমশাই তেমনটাই বলতেন। আর শুধু বলতেন না, বিশ্বাস করতেন। কারণ বছর কুড়ি আগে উমা ঘোষ বিয়ের পর সরকার হতেই ব্যবসা ফিরেছিল তাঁর। ফ্ল্যাট, গাড়ি সবকিছু কয়েক বছরেই। মাস্টার্স করে বিয়ে। সংসারের সঙ্গে হাত লাগিয়েছিলেন পারিবারিক ব্যবসাতেও। আজ শ্বশুরমশাই নেই। স্বামী, দুই ছেলেমেয়ে নিয়েই তাঁর সংসার। নিজে লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের জন্য আবেদন করেননি। কিন্তু তাঁর বাড়ির পরিচারিকা, চেনা পরিচিত প্রান্তিক শ্রেণির সব মহিলাকে জোর করেছেন। নিজের হাতে ফর্ম ফিল আপ করেছেন। এখন তাঁকে নিজের জন্য ফর্ম ভরতে হচ্ছে। না, লক্ষ্মীর ভাণ্ডার নয়। নির্বাচন কমিশনের ফর্ম। তিনি আবেদন করছেন। চিঠি দিচ্ছেন। যাবতীয় নথি নিয়ে হত্যে দিচ্ছেন বিএলওর দরজায়, শুনানিতে। কিন্তু তারপরও তাঁর নাম অ্যাডজুডিকেশন লিস্টে। মানে, তিনি আদৌ ভারতের ভোটার কি না, তার প্রমাণ মিলছে না। গোটা বিষয়টা বিচারাধীন। কেন? তাঁর জন্ম শংসাপত্র, অ্যাকাডেমিক সার্টিফিকেট সব উমা ঘোষ নামে। এমনকি ভোটার কার্ডও। এগুলো আর বদলানো হয়নি। শুধু আধার ও পাসপোর্টে তাঁর পদবি সরকার। তাই কমিশনের চোখে তিনি সন্দেহজনক। ম্যারেজ সার্টিফিকেট চলবে না। ঘর সংসার, অফিস হেলায় সামলানো উমা ঘোষ ‘সরকার’ এখন বেসামাল।
রমজানা খাতুন ইনিউমারেশন ফর্মে তাঁর স্বামী শেখ মহম্মদ ইকবালের নাম রেফারেন্স হিসাবে দিয়েছিলেন। শুনানিতে ডাক পেয়েছিলেন। কারণ, ২০০২ সালের তালিকার সঙ্গে নাকি তাঁর স্বামীর নাম মিলছে না। তখন নামের আগে শেখ ছিল। এখন ভোটার লিস্টে নেই। তাই তিনি সন্দেহভাজন।
স্বপ্না মল্লিকের নাম খসড়া তালিকায় ছিল। নোটিস পাননি। শুনানির জন্য কেউ এসে বলেও যায়নি। ফোন তো নয়ই। শনিবার চূড়ান্ত তালিকা বেরনোর পর দেখছেন, তাঁর নামই নেই! ছুটেছিলেন বিএলওর কাছে। তিনিও হতবাক। বলছেন, আপনার নাম না থাকার তো কোনো কারণ নেই! কিন্তু বাস্তবটা হল, তাঁর নাম নেই। তিনি এই মুহূর্তে অন্তত বাংলার ভোটার নন। 
তিনটি ঘটনাই সত্যি। শুধু নামগুলো পরিবর্তিত। তবে প্রতিটি ক্ষেত্রে একটা বিষয় কমন—বাংলার এই তিন ‘লক্ষ্মী’ আসন্ন ভোটে ইভিএম পর্যন্ত যেতে পারবেন না। অকারণে। বিনা ব্যাখ্যায়। সৌজন্যে? নির্বাচন কমিশন। নাকি বিজেপি বললে বেশি ভালো হয়? প্যাটার্ন কিন্তু সে কথাই বলছে। বিজেপির চুনোপুঁটি থেকে রাঘববোয়াল নেতারা এসআইআর শুরুর আগে যে সব দাবি করেছিলেন, ‘কাকাতালীয়ভাবে’ সেই সব ফলতে শুরু করেছে। এক কোটি বাংলাদেশি বা রোহিঙ্গা পাওয়া যায়নি ঠিকই, কিন্তু নাম বাদ যাওয়া এবং লক্ষ লক্ষ বৈধ ভোটারকে ‘বিচারাধীন’ তালিকায় ফেলে দিয়ে কাটাকুটির খেলা মিলিয়ে দিতে চলেছে কমিশন। ৬৪ লক্ষ নাম বাদ। আরও ৬০ লক্ষ অ্যাডজুডিকেশন লিস্টে। হলই তো ১ কোটি ২০ লক্ষ! প্যাটার্ন আরও একটা আছে। বাছাই করে করে নাম বাদ। সংখ্যালঘু এবং মহিলা। কারণ, এই দুই শ্রেণিই তৃণমূল কংগ্রেসের ডেডিকেটেড ভোটার। এখানেও একটা মোক্ষম প্রশ্ন আছে। ‘পরিবর্তনে’র ব্যাপারে বিজেপি যদি এতটাই কনফিডেন্ট হয়, তাহলে কেনই বা কমিশনের মাধ্যমে কলকাঠি নাড়তে হচ্ছে? তার মানে কি প্যাঁচ না কষলে এবারও বাংলা জয়ের সম্ভাবনা নেই? বিজেপি সেটা বিলক্ষণ বোঝে বলেই কি নির্দিষ্ট প্যাটার্ন ধরে চলতে শুরু করেছে? 
শাস্ত্র নাহি মানে দেখ যত নারী নর।
অশাস্ত্রকে শাস্ত্রজ্ঞান করে নিরন্তর ॥
২০২১ সালে শুধুমাত্র লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের প্রতিশ্রুতি গেরুয়া শিবিরের ‘দোসো পারে’র স্বপ্নে জল ঢেলে দিয়েছিল। প্রত্যেক রাজনৈতিক দল বুঝেছিল, এই ওষুধের মার নেই। তাই চালু করুক না করুক, ভোটের আগে লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের প্রতিশ্রুতি কিন্তু সব দলই দিয়েছে। কোথাও নাম হয়েছে ‘লাডলি লক্ষ্মী যোজনা’, কোথাও ‘রাজশ্রী যোজনা’, কোথাও আবার ‘মুখ্যমন্ত্রী মহিলা উৎকর্ষ যোজনা’। উদ্দেশ্য সর্বত্রই এক—হাতে টাকার জোগান বাড়ানো। নজর করার মতো বিষয় হল, এই তিনটি যোজনাই কিন্তু বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকারের। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাবনার ‘অনুপ্রেরণায়’ মহিলাদের বিষয়ে টনক নড়েছিল গেরুয়া ব্রিগেডের। তারা বুঝেছিল, মহিলাদের কনফিডেন্সে আনা ছাড়া গতি নেই। এই সমীকরণে শুধু ওই এক মহিলার ভোট নয়, গোটা পরিবারের সমর্থন নিশ্চিত হয়ে যায়। আর তাই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে যদি মারতে হয়, মহিলাদের ডানা ছেঁটে দিতে হবে। তার জন্য যতরকম ছলাকলার আশ্রয় নিতে হয় হোক। এই শ্রেণির একটা বড়ো অংশ যেন ভোট দিতে না পারে। একদিকে সংখ্যালঘু ভোট কমিয়ে দিতে হবে, আর একদিকে মহিলা। সংগঠন না থাকুক, কমিশন তো আছে! মানুষ খেপলেও কিছু বলতে পারবে না। কারণ, নির্বাচন কমিশন সাংবিধানিক সংস্থা। তাদের বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ করতে গেলে প্রমাণ চাই। তা তো আর কেউ এবেলা-ওবেলা দিতে পারবে না! মানুষের অত সময়ও নেই। শুধু গাল দেওয়ার ফুরসত আছে। সেটা খাবে কমিশন। আর কার্যসিদ্ধি হবে বিজেপির। 
হিংসা-দ্বেষ অলক্ষ্মীর যত সহচর।
একে একে সবে আসি প্রবেশিল ঘর ॥
হিংসা, বিদ্বেষ, ক্ষমতার লোভ। এই তিন এজেন্ডায় চলছে গেরুয়া রাজত্ব। বাংলা এই স্রোতে ভাসেনি। তাই তার জন্য এবার অন্য উপায়। কেমন? কয়েকটা পরিসংখ্যান দেখা যাক। এসআইআর ঘোষণার দিন বাংলায় মহিলা ভোটারের সংখ্যা ছিল ৩ কোটি ৭৭ লক্ষ ৩১ হাজার ৮৮৭ জন। খসড়া তালিকায় দেখা গেল, ওই সংখ্যাটা নেমে গিয়েছে ৩ কোটি ৪৬ লক্ষ ১৫ হাজার ৮৩৭ জনে। প্রায় ৩২ লক্ষ মহিলা ভোটার কোথায় গেল? কমিশন বলল, হয় তাঁরা মারা গিয়েছেন বা পাকাপাকিভাবে অন্য কোথাও চলে গিয়েছেন। আমরা মেনে নিলাম। চোখের সামনে দেখলাম, বহু মহিলা ভোটার দাবি করছেন, আমি বেঁচে আছি। কিন্তু আমার নাম কমিশন কেটে দিয়েছে। তারপরও আমরা মেনে নিলাম। এরপর এল চূড়ান্ত তালিকার প্রথম পর্ব। সেখানে দেখলাম, ওই সংখ্যাটা আরও কমে গিয়েছে। অর্থাৎ, শুনানিতে যাঁদের ডাকা হয়েছে তাঁরা অনেকে নিজেদের ‘যোগ্যতা’ প্রমাণ করতে পারেননি। কেউ কেউ আবার মারা গিয়েছিলেন। কমিশনই বুঝতে পারেনি। তাই তাঁদের বাদ দেওয়া হয়েছে। ফলে মহিলা ভোটারের সংখ্যা পশ্চিমববঙ্গে এসে দাঁড়িয়েছে ৩ কোটি ৪৪ লক্ষ ৩৫ হাজার ২৬০ জনে। অর্থাৎ, আরও লাখ তিনেক মহিলার নাম বাদ গিয়েছে। কমিশন বলছে, ‘এভাবে দেখছেন কেন? অনুপাত দেখুন। পুরুষ ভোটার ও মহিলা ভোটারের অনুপাত। সেটা কিন্তু একই আছে। উপরন্তু খসড়া তালিকা প্রকাশ থেকে চূড়ান্ত তালিকা পর্যন্ত সময়ে প্রায় ৯৭ হাজার মহিলা ভোটার যে যুক্ত হল! সেটা তো বলছেন না?’ ঠিক কথা। কিন্তু ৩৫ লক্ষ বাদের নিরিখে ৯৭ হাজার কোন অনুপাতে আসে, সেই জ্ঞান জ্ঞানেশবাবুরা বিতরণ করলে বাধিত হওয়া যায়। বিষয়টা হয়তো এখানেই শেষ হয়ে যেত। খুব বেশি হলে সব মিলিয়ে আরও তিন-চার লক্ষ নাম বাদ যেত। কিন্তু মাইক্রো অবজার্ভাররা কী করলেন? ঝেঁটিয়ে ৬০ লক্ষ ভোটারকে পাঠিয়ে দিলেন ফের যাচাইয়ের জন্য। অর্থাৎ, তাঁদের অস্তিত্ব নিয়ে মাইক্রো অবজার্ভারদের সন্দেহ আছে। তাঁরা এই পর্বে যথেচ্ছভাবে নাম বাতিল করেছেন। নথি খারিজ করেছেন। যাঁরা আগে নোটিস পাননি, তেমন কোটি খানেক ভোটারকে শুনানিতে ডেকে পাঠানোর আয়োজন করেছেন। এবং হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির সঙ্গে বৈঠকে রাজ্যের মুখ্যসচিব এই নোটিস-হয়রানির বিষয়টি তুললে ‘নট ইওর ম্যাটার’ বলে তেড়েও যান। প্যাটার্ন তো তাঁরাই বেআব্রু করে দিচ্ছেন। আর তাই এখনও ৬০ লক্ষাধিক নাম পড়ে রয়েছে বিচারাধীন হয়ে। তাঁদের মধ্যে মহিলা ভোটার কত? ২৭ লক্ষ ৯৪ হাজার ৬৭৫ জন। সংখ্যালঘু কেন্দ্রে সংখ্যাটা বেশি। যেমন
ইহা শুনি সদাগর বলে অহঙ্কারে।
যেজন অভাবে থাকে, সে পূজে উহারে ॥
এগুলো স্রেফ নমুনা মাত্র। শাসকের অহঙ্কারের নমুনা। ভোটের অভাব মেটানোর জন্য যতদূর সম্ভব ভাবতে পারার অহংকার। বাংলার মানুষকে মানুষ হিসাবে গণ্য না করার অহংকার। বাঁকুড়া-বর্ধমানের বহু কেন্দ্রে কিন্তু পুরুষদের তুলনায় মহিলা ভোটারদের বেশি সংখ্যায় ঠেলে দেওয়া হয়েছে অ্যাডজুডিকেশন লিস্টে। একই পরিস্থিতি হুগলির সিংহভাগ কেন্দ্রেও। অথচ, এর কোনো ব্যাখ্যা নেই। বাড়িতে স্বামী-সন্তান হয়তো বৈধ ভোটার হিসাবে ছাড় পেয়ে গিয়েছেন, অথচ তিনি ছুটছেন কমিশনের দরবারে। আজ দোল পূর্ণিমা। শ্রীনারায়ণের পাশে বসে যখন লক্ষ্মীদেবীর একটু হাঁপ ছাড়ার কথা, তখন তিনি উদ্বিগ্ন, অসহায়। ‘কেন আমি ভোটার নই? নথি তো সব ঠিকই দিয়েছিলাম।’ আসলে তিনি বুঝতে পারছেন না, তাঁর নথি বৈধ মেনে নিলে প্যাটার্ন মেলানো যাবে না। অঙ্কও না। অথচ সেটা মেলাতেই হবে। সব মিলিয়ে ১ কোটি ২০ লক্ষ নাম বাদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন বিজেপি নেতারা। প্রত্যেকের অ্যাকাউন্টে ১৫ লক্ষ টাকা না ঢুকুক, আচ্ছে দিন না আসুক... এই প্রতিশ্রুতিটা তো রাখতেই হবে। তাই খেলা চলছে। অমানুষিক চাপ বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে জুডিশিয়াল অফিসারদের উপর। তাঁরা এই ধরনের কাজে অভ্যস্তই নন! সংখ্যাটা ১০-১৫ লক্ষ হলেও হয়তো উতরে যেত। কিন্তু সেটাই নিয়ে যাওয়া হয়েছে ৬০ লক্ষে। দিনে একজন বিচারক ৫০টি আবেদনের নিষ্পত্তিও করতে পারছেন না। দ্রুত কাজ তুলতে হলে তাহলে তাঁদের কী করতে হবে? মাইক্রো অবজার্ভারদের নোটের উপর ভরসা। সেক্ষেত্রে তালিকার পরবর্তী ধাপে যদি আরও অন্তত ২০-২৫ লক্ষ নাম বাদ যায়, অবাক হওয়ার থাকবে না। আড়ালে বসে মুচকি হাসবেন এই গেরুয়া ছকের জনক-জননীরা। লক্ষ্মীর ভাণ্ডার যাঁরা পায়, বাছাই করা কেন্দ্র থেকে সেই মা লক্ষ্মীদের অধিকাংশই যদি ভোট দিতে না পারেন, চাপ বাড়বে কার? তৃণমূলের। সংখ্যালঘু ভোটাররা যদি নিজেদের যোগ্য প্রমাণ করতেই ভোট পেরিয়ে যায়, তাহলে কার লাভ? তৃণমূলের নিশ্চয়ই নয়। সংগঠন নেই তো কী হয়েছে? শাসকের হাতে রাজদণ্ড আছে। এজেন্সি আছে। সাংবিধানিক সংস্থা আছে। খেলা চলছে। এ খেলার প্যাঁচ আরও বাড়বে। বাঙালি আরও হয়রান হবে। রাজ্যের মাটিতে শুনানির লাইনে। আর ভিন রাজ্যে গিয়ে বাংলাদেশি বলে চিহ্নিত হয়ে। আমরা তারপরও বলব, পরিবর্তন চাই!

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ