


অগ্নিভ ভৌমিক, কৃষ্ণনগর: নতুন বছর মানেই নতুন স্বপ্ন, নতুন আশার আলো। কিন্তু নদীয়া জেলার লক্ষাধিক মানুষের কাছে এবছর সেই আলো যেন ফিকে। তাঁদের কাছে বাংলা নববর্ষ শুরু হচ্ছে অধিকার হারানোর গভীর যন্ত্রণা বুকে নিয়েই। নাগরিক হয়েও ভোটাধিকারহীন হয়ে পড়ার বেদনা তাঁদের জীবন থেকে উৎসবের রং মুছে দিয়েছে।
নদীয়া জেলার দু’লক্ষের বেশি বিচারাধীন ভোটারের নাম বাদ পড়েছে। তাঁদের অনেকের কাছেই পাসপোর্ট, মাধ্যমিকের সার্টিফিকেট, জাতিগত শংসাপত্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ নথি রয়েছে। বহু মানুষের নাম ২০০২সালের ভোটার তালিকাতেও ছিল। তবু কলমের একটি খোঁচায় তাঁরা ভোটাধিকার হারিয়েছেন। কেড়ে নেওয়া হয়েছে তাঁদের নাগরিক পরিচয়।
এই পরিস্থিতিতে নতুন বছর তাঁদের কাছে উৎসব নয়, বরং অনিশ্চয়তার আর একটি অধ্যায়। আগে শুনানির জন্য লাইনে দাঁড়াতে হয়েছে। এখন ফের ট্রাইব্যুনালে আবেদন করতে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষ সেই লাইনে ভিড় করছেন। লক্ষ্য একটাই, নিজের ভোটাধিকার ফিরে পাওয়া। কিন্তু সেই পথ দীর্ঘ, জটিল এবং সময়সাপেক্ষ। আসন্ন নির্বাচনের আগে তাঁদের ভোটাধিকার ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। নববর্ষের সময় যেখানে ঘরে ঘরে উৎসবের আনন্দ ছড়ানোর কথা, সেখানে নদীয়ার বহু পরিবারে উদ্বেগ ও হতাশার ছায়া নেমে এসেছে।
কৃষ্ণনগরের তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরের অফিসচত্বরে দাঁড়িয়ে ছিলেন ষাটোর্ধ্ব দুলাল বিশ্বাস। তিনি বলেন, উৎসব বলে এখন আর কিছু নেই। সারাদিন কাগজপত্র নিয়ে দৌড়তে হচ্ছে। আগে শুনানির লাইনে দাঁড়িয়েছি, এখন আবার ট্রাইব্যুনাল। এভাবে চললে কাজটাও থাকবে না। সংসার চালাব কী করে, সেই চিন্তাই বড়ো হয়ে দেখা দিচ্ছে।
ধুবুলিয়ার বাসিন্দা পুষ্প দাস বলেন, আমাদের পরিবারের অনেকের নামই বাদ গিয়েছে। যখন ভোট দেওয়ার অধিকারই নেই, তখন বর্ষবরণের আনন্দ কোথায়! আমরা দিন আনি, দিন খাই। তার মধ্যে আবার কাগজপত্র নিয়ে ছোটাছুটি করতে হচ্ছে।
সীমান্তবর্তী নদীয়া জেলায় এই পরিস্থিতি নতুন করে ভয়ের জন্ম দিচ্ছে। দেশভাগ ও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় বহু উদ্বাস্তু এই জেলায় আশ্রয় নিয়েছিলেন। ধুবুলিয়া, কুপার্স ক্যাম্প, রানাঘাট-অসংখ্য এলাকার মানুষ এখনও সেই ইতিহাস বয়ে বেড়াচ্ছেন। এবার ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়ার ঘটনায় তাঁদের মনে প্রশ্ন উঠছে-আবার কি সেই ছিন্নমূল হওয়ার দিন ফিরে আসছে? চারদিকে যখন নববর্ষের প্রস্তুতি, নতুন জামা, মিষ্টির গন্ধ, শুভেচ্ছা বিনিময়-সেখানেই নদীয়ার বহু মানুষকে তাড়া করছে ‘বেনাগরিক’ হয়ে পড়ার এই আতঙ্ক।