


হিমাংশু সিংহ: দেশের মধ্যে কোন রাজ্যে ভোট প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ? উত্তরটা সবার জানা। রাজনীতির এবিসি, জঙ্গি কার্যকলাপের সাতকাহন কিংবা সীমান্তের গোলাবারুদের দাপাদাপি নিয়ে বিন্দুমাত্র ওয়াকিবহাল না থাকলেও একবাক্যে সবাই বলবেন কাশ্মীর। ৭৪৪ কিলোমিটার বিস্তৃত এলওসি এবং ১৯৮ কিলোমিটার দীর্ঘ আন্তর্জাতিক সীমান্ত। হিংসার ঝুঁকিটা সর্বাধিক ভূস্বর্গেই। ওপারে চিরশত্রু ইসলামিক পাকিস্তান এবং প্রযুক্তি ডন চীন। সুযোগ পেলেই সীমান্ত পেরিয়ে ভিনদেশি উগ্রপন্থী থুড়ি জেহাদিরা ভারতে হত্যালীলা চালাতে মরিয়া। অরুণাচল থেকে লাদাখ, তৈরি লাল ফৌজও। জঙ্গিদের অস্ত্র, গোলাবারুদ দিয়ে সাহায্য করছে ইসলামাবাদের সরকার। লক্ষ্য কাশ্মীরকে বিচ্ছিন্ন করা। চতুর্দিকে আতঙ্ক আর সন্ত্রাসের পরিবেশ। এহেন উপদ্রুত কাশ্মীরেও গত লোকসভা ভোট সম্পন্ন হয়েছে মাত্র ৯০ হাজারের মতো কেন্দ্রীয় বাহিনী দিয়ে। নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘোষণার পরপরই মুখ্যসচিব, স্বরাষ্ট্র সচিব, ডিজি সহ পুলিশের শীর্ষ পর্যায়ে বিশাল রদবদল হয়েছে, এমন রেকর্ডও নেই কোথাও। এমনকি পহেলগাঁওয়ে জঙ্গিদের হাতে ২৬ জন নিরীহ পর্যটকের হত্যালীলার পরও বড়ো কোনো প্রশাসনিক রদবদল হয়নি সেখানে। মুখ্যসচিব, স্বরাষ্ট্র সচিব ডিজি তো কোন ছার, নীচুতলায় থানা লেভেলে নাম কা ওয়াস্তে রদবদল হয়েছিল মাত্র। পহেলগাঁওয়ের পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের পাঁচ বছর আগে কাশ্মীর থেকে ৩৭০ ধারার বিলুপ্তির সময়ও লাখ খানেক কেন্দ্রীয় বাহিনীই ছিল যথেষ্ট। আর বাংলায় এটা কী হচ্ছে? ভোট না অপারেশন সিন্দুরের চেয়েও বড়ো যুদ্ধ? মাঝে মাঝে মনে হচ্ছে ‘হিন্দু’ পাকিস্তানের হাতে আক্রান্ত বাংলার অস্মিতা ও সংস্কৃতি! খুব দুঃখের সঙ্গেই বলতে হচ্ছে কথাটা। কিন্তু এটাই আজকের বাস্তব।
বিশ্বের স্বঘোষিত বৃহত্তম রাজনৈতিক দল বিজেপি নিজেকে হিন্দুত্বের একচ্ছত্র রক্ষাকর্তা, ঠিকাদার হিসাবেই গত ৪৬ বছর প্রজেক্ট করে এসেছে। গত বারো বছরে রথযাত্রা থেকে মন্দির নির্মাণ, পদে পদে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের অস্ত্রে শান দিয়ে ক্ষমতায় টিকে থাকার সহজ রসায়ন আয়ত্ত করেছেন গুজরাতের মসিহা। যাঁর রাজনৈতিক উত্থান গোধরা পরবর্তী দাঙ্গা হাঙ্গামার হাত ধরে। তাঁর নেতৃত্বে দেশ কতটা এগিয়েছে জানি না। তবে মোদিজি জীবনে অনেক পেয়েছেন। কিন্তু একটাই আক্ষেপ, বাংলায় প্রতিবারই বিগ জিরো! মমতার দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে আছড়ে পড়েছে যাবতীয় পরিকল্পনা। সেই কারণেই এবার অঘোষিত রাষ্ট্রপতি শাসনে ভোট হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গে ঢাক ঢোল বাজিয়ে। রাজ্যপাল থেকে মুখ্যসচিব, স্বরাষ্ট্র সচিব, ডিজি, প্রথম সারির আমলা, জেলাশাসক, এসপি পর্যন্ত প্রশাসনের কোনো অংশকেই ছাড়া হয়নি। বদলে দেওয়া হয়েছে খোলনলচে। বহির্শক্তি নয়, নরেন্দ্র মোদির শাসনে দেশেরই একটি অঙ্গরাজ্যের বিরুদ্ধে বিজেপি ও বশংবদ নির্বাচন কমিশনের চাপিয়ে দেওয়া এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের নাম নিশ্চিতভাবে ‘অপারেশন বেঙ্গল’! ধর্মনিরপেক্ষ ভারতের ঐতিহ্যকে বিসর্জন দিয়ে স্বার্থপর হিন্দুরাষ্ট্রে অবনমনের গেরুয়া চক্রান্তের বিরুদ্ধে দুর্ভেদ্য প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন একা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, স্বাধীনতা উত্তর ভারতের সেরা স্ট্রিট ফাইটার। আপনি মানুন, ছাই না মানুন এটাই সত্য। উত্তর ভারতে সামান্য কয়েকটি রাজ্য ছাড়া অধিকাংশ প্রদেশেই নিরঙ্কুশ গেরুয়া শক্তি, পূর্বভারতও প্রায় হাতের মুঠোয়, বাকি শুধু বাংলা। তাই পশ্চিমবঙ্গ দখলের এত তাগিদ। মোদি অমিত শাহের যেন আর তর সইছে না। কেন্দ্রীয় এজেন্সির দৌরাত্ম্য, ঝাঁকে ঝাঁকে বাহিনীর ভারী বুটের আওয়াজ, এসআইআর এবং শীর্ষ স্তরের আমলাদের বদলি—বহুমাত্রিক এই যুদ্ধটা শুধু এপ্রিলের ক্লাইম্যাক্সের অপেক্ষায়।
বাংলায় খাতায়কলমে পুলিশ বাহিনীর সক্রিয় সদস্য সংখ্যা ১ লক্ষ ১৪ হাজারের মতো। আর নির্বাচন কমিশন পাঠাচ্ছে প্রায় আড়াই লাখ কেন্দ্রীয় বাহিনী। এখনও পর্যন্ত তাই ঠিক আছে। তবে কমিশনের অন্দরে কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে, প্রয়োজনে আড়াই লাখের পরও অতিরিক্ত আধা সেনা পাঠাতে কার্পণ্য করবে না কমিশন। যদি সংগঠন শূন্য বিজেপির দরকার হয়। দেখেশুনে মনে হচ্ছে, একমাত্র বাংলাতেই ভোট হচ্ছে এবং এখানকার সবাই সমাজবিরোধী, সব বুথ দখল হয়ে যায়? ঘুরিয়ে এটাই তো বলতে চায় বাংলা বিরোধী বিজেপি ও বশংবদ জ্ঞানেশ কুমারের নির্বাচন কমিশন। এটা বাংলা ও বাঙালির অপমান নয়?
দেশে আধা সেনা আছে দশ লক্ষের মতো। সেনা চোদ্দো লক্ষ। আধা সেনার ২৫ শতাংশ শুধু একটি রাজ্যে মোতায়েন? জাতীয় অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ব্যুরোর (এনসিআরবি) রিপোর্টের সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের এই সিদ্ধান্ত সামঞ্জস্যপূর্ণ কি? নাকি এটাও মোদি, অমিত শাহের নির্মম জুমলার আর একটা নিকৃষ্ট উদাহরণ!
ফল ঘোষণা পর্যন্ত তর সইছে না। আগামী ৪ মে যুদ্ধের পরিণাম ঘোষণার অনেক আগে থেকেই প্রশাসনের খোলনলচে গোড়া থেকে টেনে উপড়ে ফেলার কাজ শুরু হয়েছে। পার্থক্য একটাই, অপারেশন সিন্দুরের মতো এই যুদ্ধের ফলাফল দূর আমেরিকায় বসে ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করবেন না। করবে মোদি, অমিত শাহের একান্ত অনুগত কমিশন। রাফাল নামাতে হবে না, কিন্তু রক্তাক্ত হবে বাংলা ও বাঙালির হৃদয়। এই সংঘাতকে যুদ্ধের মানবিক রীতি অমান্য করে বাংলায় হানাদারি চালানো ছাড়া আর কী বলা যায়?
একসঙ্গে তামিলনাড়ুতেও ভোট হচ্ছে। নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘোষণা হয়ে গিয়েছে অসম, তামিলনাড়ু, কেরল এবং পুদুচেরিতেও। কিন্তু কোথায় ৬০ লক্ষ ভোটারের ভাগ্য ঝুলে? শেষপর্যন্ত ভোটের দিন তালিকায় নাম থাকবে কি না তা নিয়ে হাপিত্যেশ করে বসে আছে। অনেক কেঁদে-কঁকিয়ে প্রথম দফার সাপ্লিমেন্টারি তালিকা বেরোবে কাল। তারপরও বিচারাধীন অন্তত ৩২ লক্ষ নির্বাচকের ভাগ্য ঝুলে থাকবে। কবে বিচারাধীন ৬০ লক্ষ মানুষের ভাগ্যের নিষ্পত্তি হবে, তা ভগবানেরও অজানা। বলুন তো অসম, তামিলনাড়ু, কেরলে সবাই সাধু? ওখানে কতজন আমলা বদলি হয়েছেন বিগত একসপ্তাহে? কত কেন্দ্রীয় বাহিনী ভোট ঘোষণার আগেই নেমেছে কেন্দ্রের শাসক দলের স্বার্থরক্ষা করতে? সাংবিধানিক সংস্থা যখন কোনো অঙ্গরাজ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে, তখন আকাশপথে বোমাবর্ষণ না হলেও, রাফাল না উড়লেও মাটিতে বারুদের গন্ধ ম ম করে। প্রায় আড়াই লক্ষ কেন্দ্রীয় বাহিনী, দেদার অর্থ আর মোদি, অমিত শাহের হাওয়াই জাহাজের ধুলোয় পদ্ম কী ফুটবে কাকদ্বীপ থেকে কোচবিহারে!
এই যুদ্ধে যে প্রশ্নের উত্তর নির্বাচন কমিশনের কাছে নেই, আসি সেই প্রসঙ্গে। একুশ সালে কোভিডের থাবায় যখন সব মানুষ ঘরবন্দি, চাকুরিজীবীরা ওয়ার্ক ফ্রম হোম করছেন তখন ক’দফায় ভোট হয়েছিল? দ্বিতীয় ওয়েভের ধাক্কায় একুশ সালে মানুষ যখন রেমডিসিভির, আইভারমেকটিন, মনটেক এলসি সহ হরেক কিসিমের ওষুধের খোঁজে হন্যে, তখন এরাজ্যে কমিশন ভোট করিয়েছিল আট দফায়। ২৬ ফেব্রুয়ারি ভোট ঘোষণা হয়। ৩৪ দিন ধরে চলেছিল বিভিন্ন জেলায় ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া। ২৭ মার্চ থেকে শুরু করে শেষ দফার ভোট হয়েছিল ২৯ এপ্রিল পর্যন্ত। আর এবার প্যানডেমিক নেই, ঘরবন্দি থাকার সেই আতঙ্কও কাজ করছে না। কিন্তু ভোট মাত্র দু’দফায়। ২৩ ও ২৯ এপ্রিল। কারণ এসআইআর বিভ্রাট এবং গেরুয়া দলের মরজি। চব্বিশের লোকসভা ভোট হয়েছিল ৭ দফায় ৪৪ দিন ধরে। ১৯ এপ্রিল থেকে ১ জুন। এই একটা তথ্য থেকেই পরিষ্কার নিরাপত্তার প্রয়োজনে নয়, কেন্দ্রীয় বাহিনীর অপ্রতুলতার কারণেও নয়, সম্পূর্ণ শাসকের খামখেয়ালিপনার অসুখে আক্রান্ত হয়েই পশ্চিমবঙ্গে একেকবার একেক রকম স্টাইলে ভোট সম্পন্ন করেছে কমিশন। বাংলার রাজনৈতিক ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক এবং দোসর কমিশন। কে জানে পরের বার নতুন ‘ভ্যানিশ কুমার’ এক দফাতেও নির্বাচন করতে পারেন, আবার ৯ দফার শরণাপন্নও হতে পারেন। ২০৩১ সালে বিজেপির কী নির্দেশ হবে, তা ভগবানেরও অজানা।
যে ভয়ঙ্কর শক্তি আজ বাংলা দখলে মরিয়া শেষ পাঁচ বছরে বিরোধী দল হিসাবে তারা একটাও গণআন্দোলন করেনি। আর জি কর আন্দোলন করেছে বামপন্থীরা। বিজেপি শুধু হিন্দু-মুসলমান বিষ ছড়িয়েছে। এ রাজ্যে গেরুয়া শক্তির রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতার কাছাকাছি আসা মানে আরএসএসের বিভাজনের ভিত পোক্ত হওয়া এবং সমাজে ভাগবাঁটোয়ারা ও ঘৃণার চাষ বৃদ্ধি পাওয়া। সমাজের সব স্তরের মানুষকে বুঝতে হবে বিজেপিকে ভোট দেওয়া মানে বাইনারির রাজনীতিকে শক্ত করা এবং সমাজকে টুকরো টুকরো করার ঐতিহাসিক কলঙ্কের দায় ঘাড়ে নেওয়া।
আজকের শপথ একটাই ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাকে রক্ষা করুন। না হলে নিঃশ্বাস নেওয়ার সুযোগটাও যে আর থাকবে না!