শরীর-মনের অসুখ থেকে মুক্তি পেতে আমরা শরণাপন্ন হই ডাক্তারদের। কিন্তু একবারও কি জানতে চাই, তাঁরা কেমন আছেন? তাঁরাও তো আমার-আপনার মতোই মানুষ! তাঁদেরও শারীরিক-মানসিক ক্লান্তি রয়েছে। আছে গগনচুম্বী স্ট্রেস। প্রবল চাপের মধ্যেও ডাক্তারদের ভালো থাকার মোক্ষম কতগুলি টিপস দিলেন বিশিষ্ট ক্রিটিক্যাল কেয়ার বিশেষজ্ঞ ডাঃ সুগত দাশগুপ্ত, বিশিষ্ট মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডাঃ আশিস মিত্র এবং বিশিষ্ট সাইকিয়াট্রিস্ট ডাঃ ওমপ্রকাশ সিং।
কেন এত চাপ?
সাংসারিক, ব্যক্তিগত চাপ তো আর পাঁচজনের মতো ডাক্তারদেরও থাকে। কিন্তু তার সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে একটা অমানুষিক পেশাগত চাপ। ভারতের জনসংখ্যার নিরিখে ডাক্তারের সংখ্যা অনেক কম। পরিসংখ্যান বলছে, ভারতে প্রতি ৮৩৪ জন রোগীর জন্য এক জন চিকিৎসক (রেজিস্টার্ড অ্যালোপ্যাথি ও আয়ূষ চিকিৎসক)। ফলে এত সংখ্যক মানুষের চিকিৎসার চাপ যে কীরকম, তা সহজেই অনুমেয়। ওয়ার্ক লাইফ ব্যালেন্সই থাকছে না।
চাপমুক্তির উপায়?
সৃষ্টিশীলতা
সকলেরই কিছু না কিছু হবি থাকে। কেউ হয়তো গান করতে ভালোবাসেন। কেউ ভালোবাসেন ফোটো তুলতে বা ছবি আঁকতে। কারও আবার লেখার হাত খুব ভালো। কিন্তু জীবিকার চাপে এই সব হবিগুলোই হারিয়ে ফেলি। আর তা না করতে করতে একটা সময় ইচ্ছাটাই চলে যায়। এই প্রবণতাটি থেকে বেরনো অত্যন্ত জরুরি। পেশা বহির্ভূত যে কোনও সৃষ্টিশীল কাজকে নিজের মধ্যে বাঁচিয়ে রাখুন, লালন করুন এবং তার উৎকর্ষ বৃদ্ধির চেষ্টা করে যান প্রতিনিয়ত। সৃষ্টির আনন্দের মতো স্থায়ী আনন্দ খুব কম জিনিসে পাওয়া যায়। তাই ছোটবেলার শখের শিল্প-সাহিত্য-সঙ্গীতের ধুলো পড়ে যাওয়া ভালোলাগাগুলোকে ঝেড়ে-মুছে নতুন করে তাদের জীবনের অনিবার্য অংশ করে নিন।
ওয়ার্ক লাইফ ব্যালেন্স
দিনের একটা বড় অংশই কেটে যায় হাসপাতালে বা চেম্বারে। কিন্তু সেটা হতে দিলে তো চলবে না। আপন-সময়ও বের করে নিতে হবে শত ব্যস্ততার মাঝেই। হ্যাঁ বলাটা সহজ, করাটা কঠিন। কিন্তু এই কঠিনটাই করে দেখাতে হবে। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে রোগী দেখার সংখ্যাটাও কমিয়ে আনা দরকার।
নিত্যজীবনে থাকুক লাগাম
ডাক্তারবাবুরা রোগীদের পরামর্শ দেন সময়মতো ঘুমনো, খাওয়া-দাওয়া করার। কিন্তু বাস্তবে নিজেরাই সেটা অনেক সময় করে উঠতে পারেন না কাজের চাপে। শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ থাকতে অবশ্যই সঠিক সময়ে খাওয়াদাওয়া, ঘুমনোর অভ্যাস করতেই হবে। বাইরের খাবার যথাসম্ভব এড়িয়ে চলতে হবে। পর্যাপ্ত ঘুম খুবই জরুরি।
এছাড়া, দিনের কোনও একটা সময় আধ ঘণ্টা- ৪৫ মিনিট হলেও শারীরিক কসরত করতে হবে। দিনে অন্তত ৫-৬ হাজার স্টেপ হাঁটতে পারলে খুব ভালো। অনেক চিকিৎসকই স্ট্রেস থেকে সাময়িক স্বস্তি পেতে ধূমপান করেন। এটা ছাড়তেই হবে।
আত্মসমীক্ষা
বিশেষ করে সিনিয়র চিকিৎসকদের উপর প্রত্যাশার চাপ অনেক। রোগীরা ভাবেন, সিনিয়র মানেই সব রোগের সমস্যা এক চুটকিতেই করে দেবেন। এই প্রত্যাশার চাপ অনেক সময়ই বোঝার মতো হয়ে পড়ে। ফলে কোনও ক্ষেত্রে ফেলিওর হলে হীনমন্যতায় ভুগতে হয়।
সকলকে বুঝতে হবে, সবার একটা সীমাবদ্ধতা আছে। সিনিয়র চিকিৎসক মানেই তিনি তো মানুষের ঊর্ধ্বে নন। নিজের এই সীমাবদ্ধতাকে বুঝে নিতে পারলেই ব্যর্থতার গ্লানিটা অনেকটা কম হবে।
চিকিৎসকরা নিজেরাই নিজেদের অসুস্থতাকে খাটো করে দেখেন। অনেক সময়ই অন্য চিকিৎসকের সাহায্য নিতে চান না। এই অভ্যাস অবশ্যই বন্ধ হওয়া উচিত। নিজের স্বাস্থ্যের সঙ্গে কোনও রকম কম্প্রোমাইজ একেবারেই নয়।
আগামীর ডাক্তারদের প্রতি
পড়াশোনার চাপ মারাত্মক। তার মধ্যে উঠতি বয়সের আলাদা কিছু টানাপোড়েন মনের মধ্যে সারাক্ষণ চলে। জীবনে প্রেম ভালোবাসা আসে, আবার হুট করে কোনও কিছু করে ফেলারও ঝোঁক থেকে যায়। সবার আগে বুঝতে হবে আর পাঁচটা বিষয় নিয়ে পড়াশোনার সঙ্গে ডাক্তারি পড়ার পার্থক্য রয়েছে। তাই সমবয়সি অন্য বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করা বন্ধুর সঙ্গে তুলনা করলে চলবে না। এই প্রফেশনে অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হবে, এই মানসিকতাটা শুরু থেকেই তৈরি করতে হবে।
মানুষের সেবার জন্য কাজ করব, এই ধারণাটা মনে গেঁথে নিলেই পড়ার প্রতি আলাদা টান তৈরি হবে। সিনিয়র-জুনিয়র সুসম্পর্ক তৈরি করা দরকার। আর মনে রাখতে হবে, প্রেম আসে। তা দীর্ঘস্থায়ী হতেও পারে, নাও হতে পারে। কিন্তু সেখানেই জীবনের সব শেষ, তা কিন্তু একদমই নয়। জীবনের লক্ষ্যটা কিন্তু অনেক বড়।
লিখেছেন: সায়ন মজুমদার