সমৃদ্ধ দত্ত: তার মানে হল জীবনবিমা এবং স্বাস্থ্যবিমায় জিএসটি প্রথম থেকেই একেবারে শূন্য করা যেতে পারত? কিন্তু এত বছর ধরে করা হয়নি। তাই তো? কেন? যাতে সরকার অসুস্থ, রুগ্ণ ও মৃত্যপথযাত্রী মানুষের থেকে ৮ বছর ধরে উচ্চহারে ট্যাক্স আদায় করে বিপুল মুনাফা করতে পারে। তাই না? কখন এই জিএসটি শূন্য করা হয়নি? করোনার সময়ও। যখন হাসপাতালগুলিতে মানুষের ভিড় উপচে পড়ছে। যখন একটিও বেড খালি নেই। যখন প্রতিদিন অসংখ্য মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। যখন ভয়ে আতঙ্কে কোটি কোটি মানুষ স্বাস্থ্যবিমা করতে মরিয়া হয়েছে। তখন কিন্তু কমানো হয়নি বিমার জিএসটি। সরকার কি জানে যে, স্বাস্থ্যবিমার প্রিমিয়াম আকাশছোঁয়া হয়ে যাওয়ার কারণে বিগত পাঁচ বছর ধরে লক্ষ লক্ষ মানুষ স্বাস্থ্যবিমা বন্ধ করে দিয়েছে? জিএসটি শূন্য থাকলে তারা তো চালাতে পারত!
তার মানে হল ক্যান্সার অথবা অন্য জীবনদায়ী ওষুধের জিএসটি এতকাল কমানো যেতে পারত? কমানো হয়নি। তার মানে এই যে সবথেকে ব্যয়বহুল হয়েছে মানুষের প্রাত্যহিক প্যাথলজি ও ডায়াগনস্টিক টেস্টের খরচ, সেটি অনায়াসে সরকার কম করতে পারত ২০১৭ সালেই? যখন জিএসটি চালু হল! প্রথমেই জিএসটি সর্বনিম্ন ৫ শতাংশ রেখে! কিন্তু কই, করা হয়নি তো? এখন ঘোষণা করা হল সবরকম ডায়াগনস্টিক কিট এবং রিএজেন্টের জিএসটি হয়ে যাবে অনেক কম। মাত্র ৫ শতাংশ।
তার মানে মধ্যবিত্ত যে ২৮ শতাংশ জিএসটি এবং তার সঙ্গে নানাবিধ ট্যাক্সের ধাক্কায় ছোট একটি গাড়ি অথবা মোটরবাইক কিনতে পারেনি এতকাল ধরে কিংবা বহু টাকা ট্যাক্স দিয়ে কিনতে বাধ্য হয়েছে, সেটি কমানো যেতে পারত আগেই? অন্তত অটোমোবাইল সেক্টর এবং সাধারণ মানুষের একটু সুরাহা হতো, কিন্তু করা হয়নি। এখন করা হল! কখন? যখন অটোমোবাইল সেক্টরের বিক্রি তলানিতে।
তার মানে তেল, শ্যাম্পু, টুথপেস্ট, সাবান, মাখন অথবা বাসনকোসনের মতো একেবারে গরিব বড়লোক সকলের নিত্যব্যবহার্যকে সবথেকে কম জিএসটির আওতায় নিয়ে আসা যায়? অথচ আনা হয়নি ৮ বছর ধরে। বস্তিবাসী গরিব মানুষ মাথার তেল, সাবান কেনার জন্য দিয়েছে ১৮ শতাংশ জিএসটি। আবার শিল্পপতিও তাই। এবার সেগুলি এক ধাক্কায় দ্বিগুণ তিনগুণ কমিয়ে দেওয়া হল? অর্থাৎ আগেই করা যেত!
তার মানে কৃষকদের একটু সুরাহা দিতে ট্রাক্টরের টায়ার, যন্ত্রাংশ, ট্রাক্টর ইত্যাদির জিএসটি কমানো যেত আগেই? অথচ কমানো হয়নি। আবার এসি টিভির দাম উত্তরোত্তর বেড়ে চলেছে দেখেও এতকাল ধরে জিএসটিকে সর্বোচ্চ স্তরে রেখে দেওয়া হয়েছিল? যাতে বেশি টাকা আসে সরকারের কাছে। এবার একেবারে ১০ শতাংশ কমিয়ে দিতে পারছে সরকার! অর্থাৎ করা যায়? কিন্তু করা হয়নি।
করোনাকালের দু’বছর কোটি কোটি মানুষের চাকরি চলে গিয়েছে। কোটি কোটি মানুষের জীবিকা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। কোটি কোটি মানুষের সংসারে আয়ের পথ বলতে আর কিছু ছিল না। সেই সময় এই যে সিদ্ধান্তগুলি এখন নেওয়া হল জিএসটি কমানোর, সেটা নেওয়া হয়নি ইচ্ছাকৃতভাবে? কেন? যাতে ‘ভরপেট নাও খাই, রাজকর দেওয়া চাই?’
২০১৭ সালে জিএসটি চালু হয়েছিল। সেই সময় থেকে এই ৮ বছর ধরে চারটি স্ল্যাবের জিএসটি রেখে দেওয়া হল তাহলে কী কারণে? ১৪০ কোটি ভারতবাসীকে লুট করার জন্য। রাষ্ট্র ৮ বছর ধরে দেশবাসীর থেকে উচ্চহারে ট্যাক্স আদায় করে গেল শুধুমাত্র রাজকোষ ভরানোর জন্য। অর্থমন্ত্রক এবং জিএসটি কাউন্সিল বুধবার দিনভর বৈঠক করে অবশেষে রাতে ঘোষণা করল যে নতুন একটি জিএসটি যুগ শুরু হচ্ছে। জিএসটি কমে গেল। অত্যন্ত স্বস্তির খবর। বিরাট বড় সুসংবাদ। আর ঠিক এই কারণেই প্রশ্ন জাগছে যে, এই যে এত পণ্যের জিএসটি কমিয়ে দেওয়া হল, এটা তার মানে তো করাই যায়! আগেই করা যেত! করা হয়নি তো!
১২০ লক্ষ কোটি টাকা। কীসের হিসাব? ২০১৭ সালে ভারতে জিএসটি শুরু হয়েছিল। তখন থেকে ২০২৪ আর্থিক বছর সমাপ্ত হওয়া পর্যন্ত সাত বছরে সরকার যে পরিমাণ জিএসটি আদায় করেছে, সেই অঙ্ক হল ওই ১২০ লক্ষ কোটি টাকা।
এ তো শুধু জিএসটি। এর বাইরে কেন্দ্রীয় সরকার শুধু ডাইরেক্ট ট্যাক্স থেকে গত পাঁচ বছরে কত টাকা আয় করেছে? ৯২ লক্ষ কোটি টাকা। যার মধ্যে রয়েছে ইনকাম ট্যাক্স এবং কর্পোরেট ট্যাক্স। জনগণ আর কী কী ট্যাক্স দেয়? রোড ট্যাক্স দিতে হয়, সেস দিতে হয়, সার্ভিস ট্যাক্স দিতে হয়। বাড়ি কিনলে ট্যাক্স। বাড়ি বিক্রি করলে ট্যাক্স। ট্যাক্স আদায়ের সব টাকা কি কেন্দ্র একাই পায়? না। রাজ্যগুলিকে দেওয়া হয় ট্যাক্স থেকে আদায় হওয়া অর্থের একাংশ। সেজন্য ফর্মুলা আছে।
ভারত সরকারের বাজেটে ব্যয় বরাদ্দ কত হয়? কোনও বছর হয়েছে ৩৪ লক্ষ কোটি টাকা। কোনও বছর ৩৭ লক্ষ কোটি। কোনও বছর ৪৫ লক্ষ কোটি টাকা। সাম্প্রতিক ৫০ লক্ষ কোটি টাকা। এবার মোটামুটি বোঝাই তো যাচ্ছে যে, বাজেটের খরচ সরকারকে কে জোগায়? গরিবদের বিনামূল্যে রেশন দেওয়ার যে কৃতিত্ব বিপুল প্রচারে বলা হয়, সেই টাকা তাহলে কাদের টাকায় হচ্ছে? জনগণের এবং করদাতার। সরকার দারুণ দারুণ হাইওয়ে, এক্সপ্রেসওয়ে করছে বলে যে বিজ্ঞাপন চলে অহরহ, সেগুলি নির্মাণের গৌরী সেন কে? জনগণ। কেন্দ্র অথবা রাজ্য যে কোনও পরিষেবা প্রদান করে ট্যাক্সের টাকায়। কেন্দ্রের হাতে থাকে ট্যাক্স আদায়ের সিংহভাগ অংশ। রাজ্যের হাতে থাকে তুলনায় কম। আপাতত মদ, পেট্রল ইত্যাদির ট্যাক্স রাজ্যের আওতায়। কতদিন থাকবে জানা নেই। কারণ এগুলি জিএসটির আওতায় আনার জন্য প্রবল চাপ দেয় কেন্দ্র। রাজ্যগুলি রাজি হয়নি এখনও পর্যন্ত।
জিএসটি এক ধাক্কায় অনেকটা কমিয়ে দেওয়ায় যেটা জলের মতো স্পষ্ট হল, সেটা হল, এই জিএসটিগুলি তাহলে প্রথম থেকেই এরকম কম রাখা যেত। সরকার জেনেশুনে রাখেনি। কেন করেনি তারও আন্দাজ পাওয়া যায়। সেটি হল, এমন কিছু পণ্যকে ১২, ১৮ এবং ২৮ শতাংশ জিএসটির মধ্যে রাখা হবে যাতে সেগুলি থেকে বড়রকম আয় করে নেওয়া যায়। প্রথম থেকে বেশি বেশি জিএসটি আদায় করে, তারপর আট দশ বছর পর যখন বলা হবে আমরা জিএসটি কমিয়ে দেব, মানুষ তখন আকস্মিক উপহারে খুশি হবে। তারা ভাববে সরকার আমাদের জন্য কত চিন্তা করে। অর্থাৎ বিখ্যাত শো রুমে জামার দাম প্রথমেই চার হাজার টাকা করে বিক্রি করে, হঠাৎ মাঝেমাঝে বলা হবে ফিফটি পার্সেন্ট পর্যন্ত ডিসকাউন্ট। মানুষ খুব খুশি হয়ে যায়। কারণ দামি জিনিস সস্তায় পাওয়া যাবে। কিন্তু আদতে ওই জামার দাম হয়তো অনেক কমে বিক্রি করেও মুনাফা করা যায়। সেটা করা হয় না। কেন? কারণ উচ্চহারে জামার দাম রেখে দিয়ে ১১ মাস ধরে বিক্রি করার পর একটি মাসে বলা হয় ঢালাও ডিসকাউন্ট। তখন সস্তায় সেই জামা পেতে মানুষের ঢল নামে কিনতে। তখন ডাবল মুনাফা।
ঠিক এটাই বুধবার রাতে বলতে চেয়েছেন অর্থমন্ত্রী। তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল এই যে জিএসটি কমিয়ে দেওয়া হল, এজন্য কত টাকা ক্ষতি হবে সরকারের? অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ৪৮ হাজার কোটি টাকা মতো! তাহলে এই ক্ষতিপূরণ হবে কীভাবে? অর্থমন্ত্রী বলেছেন, যেহেতু বহু পণ্যের জিএসটি কমে যাওয়ায় দামও কমবে, তাই আগের তুলনায় এবার বিক্রি অনেক বেড়ে যাবে। অনেক বেশি বিক্রি হলে আবার জিএসটি আগের পর্যায়েই পৌঁছে যাবে। সুতরাং লোকসান নিয়ে যে সরকার খুব চিন্তিত এমন নয়।
সরকার না হয় উপকার করল। এবার একটি কাজ করতে হবে সাধারণ মানুষকে। কাজটি হল, লক্ষ্য রাখতে হবে আগামী দিনে সকলের অগোচরে বিভিন্ন পণ্যের এমআরপি অথবা বেস প্রাইস বাড়িয়ে দেওয়া হল না তো বহু পণ্যের? জিএসটি কমে গিয়ে কোনও এক পণ্যের দাম ধরা যাক ১৯ টাকা কম হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু দেখা গেল কমেছে ১১ টাকা! কেন? কারণ এই সুযোগে বেস প্রাইস ও এমআরপি বাড়িয়ে দেওয়া হবে না তো? বিমায় লক্ষ্য রাখতে হবে, কাঙ্ক্ষিত প্রিমিয়াম কমল তো? জনগণকে লুট করার কিন্তু একশো এক ফর্মুলা আছে!