‘মহাজাগ্রত তীর্থ’ বলেই সকলের কাছে পরিচিত পূর্ব বর্ধমানের ক্ষীরগ্রামের যোগাদ্যা মন্দির। সতীর একান্ন পীঠের একটি পীঠ এই ক্ষীরগ্রাম। যেখানে সতীর ডান পায়ের বুড়ো আঙুল পড়েছিল। এখানকার বিশেষত্ব সারা বছর দেবী থাকেন জলের নীচে। কেবলমাত্র বৈশাখ সংক্রান্তিতে জল থেকে দেবীর প্রস্তরবিগ্রহ তুলে পুজো করা হয়। যোগাদ্যা দেবীর আবির্ভাব নিয়ে লোকমুখে বিভিন্ন কাহিনি প্রচলিত রয়েছে। সেইরকমই একটি কাহিনি হল— কোনও এক সময় হরিদত্ত নামে এক ধার্মিক ও প্রজাবৎসল রাজা ওই অঞ্চলে বাস করতেন। এক রাতে তাঁকে স্বপ্নে দেখা দেন জগন্মাতা যোগাদ্যা। তিনি আদেশ করলেন, নিত্যদিন নরবলি দিয়ে রাজা যেন তাঁর পুজো করেন। পরদিন থেকে রাজা হরিদত্ত তাঁর সাত পুত্রকে পরপর বলি দিয়ে মায়ের পুজো করলেন। এরপর অষ্টম দিন থেকে গ্রামের প্রতি পরিবার থেকে পালাক্রমে একজন করে মায়ের কাছে বলি দিতে থাকলেন। এরপর এমন একদিন এল যখন মায়ের পূজারির পরিবারের পালা পড়ল। পূজারি ও তাঁর স্ত্রী-সন্তান অনেক ভাবনা চিন্তা করে স্থির করলেন প্রাণ বাঁচাতে গেলে গ্রাম ত্যাগ করতে হবে। সেইমতো নিশুতি রাতে তাঁরা তিনজন মিলে জঙ্গলের পথ ধরলেন। হঠাৎ এক বৃদ্ধার সঙ্গে তাঁদের দেখা হল। এত রাতে কোথায় চলেছেন তিনজনে, প্রশ্ন করলেন বৃদ্ধা। ব্রাহ্মণ সত্যভাষী, তাই সব কথাই খুলে ব্যক্ত করলেন। তখন সেই বৃদ্ধা বললেন, ‘যে ভয়ে পালাও তুমি, সেই মা যোগাদ্যা আমি।’ এর পর তিনি ব্রাহ্মণকে বললেন, অতি প্রিয় সাত সন্তানকে উৎসর্গ করার মধ্যে দিয়েই রাজা তাঁর ভক্তির পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। আর নরবলির দরকার নেই, পুরোহিত নিশ্চিন্তে বাড়ি ফিরে রাজাকে দেবীর আদেশের কথা জানিয়ে দিতে পারেন। দেবীকে ঘিরে এইরকম অজস্র কাহিনি আজও লোকমুখে ঘোরে। চৈত্র সংক্রান্তিতে হোমযজ্ঞ দিয়ে শুরু করে এক মাস ধরে চলে লগ্ন উৎসব, ক্ষীরকলস সিঞ্চন, ময়ূরনাচ, বীরদর্পে মাটি কাঁপানো, মালাকারের বিয়ে, উলগ পুজো, ডোম-চুয়ারি খেলা ইত্যাদি অনুষ্ঠান। সব শেষে অনুষ্ঠিত হয় মহাপুজো।



