Bartaman Logo
১৬ জুলাই, ২০২৬

পায়ের দৈত্যাকার বুড়ো আঙুল, নিষ্প্রাণ ১২ দেহ, তিন দশক পরও স্টোনম্যানের আতঙ্ক তাজা কলকাতার ফুটপাতে

তারপর সে উঠে চলে গেল। রেখে গেল ২০ কিলো ওজনের একটা পাথর। সেই পাথরের গায়ে লেগে কালচে-লাল রক্ত। কোথায় গেল? কে ছিল সে? কেমন দেখতে?

পায়ের দৈত্যাকার বুড়ো আঙুল, নিষ্প্রাণ ১২ দেহ, তিন দশক পরও স্টোনম্যানের আতঙ্ক তাজা কলকাতার ফুটপাতে
  • ১০ জুলাই, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

তারপর সে উঠে চলে গেল। রেখে গেল ২০ কিলো ওজনের একটা পাথর। সেই পাথরের গায়ে লেগে কালচে-লাল রক্ত। কোথায় গেল? কে ছিল সে? কেমন দেখতে? রক্তের উপর পায়ের ছাপ থেকে পুলিস জানতে পেরেছিল, চেহারা মাঝারি হওয়ার সম্ভাবনা। ডান পায়ের বুড়ো আঙুলটা অস্বাভাবিক বড়। পুলিস তাকে খুঁজতে জ্যোতিষীর কাছেও গিয়েছিল। জ্যোতিষীর মতে, সেই ব্যক্তি বকের মতো লম্বা পা ফেলে হাঁটে। ব্যস! এটুকুই। ১৯৯০ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারির পর তার আর কোনও ‘অ্যাক্টিভিটি’ পাওয়া যায়নি। বলা ভালো, চেনা ‘অ্যাক্টিভিটি’ পাওয়া যায়নি। সে ৯ মাসে শহরের ফুটপাতবাসী নিম্নবিত্ত মোট ১২ জন মানুষকে পাথর দিয়ে থেঁতলে খুন করেছিল। সে... নাকি তারা? উত্তর নেই। মহিলা না পুরুষ? উত্তর নেই। বছর ৩৫ আগে সংবাদমাধ্যম তার নাম দিয়েছিল ‘স্টোনম্যান’। পুলিসও সেই নামেই ডাকে তাকে।

Advertisement

‘এই যে ঠিক এইভাবে পাথরটা হাতে নিত, তারপর...’, আর আহমেদ ডেন্টাল কলেজের সামনে এক ব্যক্তি হাতে পাথর নিয়ে স্টোনম্যানের গল্প করছিলেন। খালি গায়ে, প্যান্ট পরা সেই ফুটপাতবাসীর চোখের সামনে ৩৫ বছর আগের স্মৃতি এখনও টাটকা। বলছিলেন, ‘আমরা এখানে রাস্তায় শুয়ে থাকতাম। কিছুই জানি না। পুলিস এসে লাঠি দিয়ে খোঁচা মেরে উঠিয়ে দিত।’ জিজ্ঞেস করলে বলত, মুচিপাড়া থানা। চল... যা এখান থেকে! কিন্তু ধরতে কি আদৌ পেরেছে স্টোনম্যানকে? কষ্ট কারা পেয়েছিল? বলুন...!’ ক্রমাগত উত্তেজনা বাড়তে থাকে সেই ফুটপাতবাসীর। এই আর আহমেদ ডেন্টাল কলেজের সামনে ১৯৮৯ সালে ১৯ অক্টোবর অষ্টম খুন করেছিল স্টোনম্যান। এখানেই এককালে মুচিপাড়া থানা, এন্টালি থানার পুলিস অফিসাররা ফুটপাতে চাদর চাপা দিয়ে শুয়ে থাকতেন। হাতেনাতে স্টোনম্যানকে ধরবেন বলে। চাকরি বাঁচাবেন বলে। ১৯৮৯ সালের ৪ জুন বিবাদী বাগে বছর তিরিশের এক মহিলার খুন দিয়ে অপারেশন শুরু করেছিল সেই স্টোনম্যান। ১৯ জুলাই জোড়া খুন। তারপর ২৭ আগস্ট, ৬ সেপ্টেম্বর, ৮ সেপ্টেম্বর, ১১ সেপ্টেম্বর, ১৯ অক্টোবর, ২৬ নভেম্বর। সে বছরের মতো শেষ। ‘লোকেশন’ ছিল মূলত শিয়ালদহ, লালবাজার, হাওড়া ব্রিজ চত্বর। মৃতদের একজন মহিলা। কিশোরও ছিল। কেউ ভিক্ষা করেন, কেউ দুধ দেন, কেউ  স্রেফ ভবঘুরে। সকলের ‘কমন ফ্যাক্টর’ একটাই—কারও মাথায় ছাদ নেই। কেন শুধু ফুটপাতবাসীই টার্গেট? উত্তর পাওয়া যায়নি। ফুটপাত দখলের পরিকল্পনা থাকলেও এমন চরম পথ বেছে নেওয়ার মতো বুকের পাটা কার আছে? এমন সিরিয়াল কিলিংয়ের জন্য প্রয়োজন বিকারগ্রস্ত বা অপরাধমনস্ক মন। এইসব তর্ক তিন দশক আগেই ছেড়ে এসেছে বাঙালি। কেউ কেউ আবার এমনও ভেবেছে, ও তো হচ্ছে ফুটপাতবাসীদের সঙ্গে। আমাদের নিশ্চয়ই কিছু করবে না! তারপরও আতঙ্ক কাটেনি। রাতে ফেরার আতঙ্ক। অন্ধকার গলির আতঙ্ক। ধীরে ধীরে আলোচনা-বিতর্ক-আতঙ্ক... সবই ভোজবাজির মতো মিশে গিয়েছে ফিল্মের রিলে। উবে গিয়েছে ত্রাসের মেঘ। কারণ, কাউকে ধরতেই পারেনি কলকাতা পুলিস। এমনকী কাছাকাছিও পৌঁছতে পারেনি। কিন্তু সে ফিরেছিল। নতুন বছরে। (চলবে)

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ