Bartaman Logo
৩ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রবিবার

গ্যালিলিওর আঙুল

ডিমের আকারে তৈরি কাচের জার। ভিতরে রাখা রয়েছে একটি আঙুল। শীর্ণকায়। দেখলে মনে হবে যেন কোনও মমির অংশ। ইতালির ফ্লোরেন্স মিউজিয়ামে এই আঙুল দেখতেই ভিড় জমান হাজার হাজার পর্যটক।

গ্যালিলিওর আঙুল
  • ৩০ মার্চ, ২০২৫ ০৪:০০

সায়নদীপ ঘোষ: ডিমের আকারে তৈরি কাচের জার। ভিতরে রাখা রয়েছে একটি আঙুল। শীর্ণকায়। দেখলে মনে হবে যেন কোনও মমির অংশ। ইতালির ফ্লোরেন্স মিউজিয়ামে এই আঙুল দেখতেই ভিড় জমান হাজার হাজার পর্যটক। কারণ এই আঙুল তো আর যে সে মানুষের আঙুল নয়। এই আঙুল একসময় মানুষকে শিখিয়েছিল যে, পৃথিবী সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে। ঠিকই ধরেছ ছোট্ট বন্ধুরা। মিউজিয়ামে সযত্নে রাখা আঙুলটি জ্যোতির্বিজ্ঞানী গ্যালিলিও গ্যালিলির। তবে শুধু একটা আঙুল কেন? এমন মহান ব্যক্তিত্বের তো গোটা শরীর সংরক্ষণ করা উচিত ছিল। সব ঘটনার পিছনেই থাকে একাধিক কাহিনি। লম্বা ইতিহাস। এক্ষেত্রেও তার অন্যথা হয়নি। এসো এবার গ্যালিলিওর আঙুলের গল্প জানা যাক।

Advertisement

ইতালির ইউনিভার্সিটি অব পাদুয়া। এক সময় এখানেই গণিত ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের অধ্যাপক ছিলেন গ্যালিলিও। সেখানে থাকাকালীন নিজের শেষ ইচ্ছার কথা জানিয়েছিলেন। বলেছিলেন, মৃত্যুর পর যেন তাঁকে সান্তা ক্রোসে ব্যাসিলিকায় সমাধিস্থ করা হয়। সেখানেই রয়েছে গ্যালিলিও পূর্বপুরুষের সমাধি। 
কিন্তু সবকিছু তো আর ইচ্ছামতো হয় না। অধ্যাপক হিসেবে গ্যালিলিওর খ্যাতি কম ছিল না। তা সত্ত্বেও নিজের শেষ ইচ্ছা তিনি পূরণ করতে পারলেন‌ না। এই কাজে বাধা হয়ে দাঁড়াল তাঁরই আবিষ্কার। এক সময় গ্যালিলিও দেখিয়েছিলেন, সূর্য পৃথিবীকে নয়, উল্টে পৃথিবী সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে চলেছে। সেই আবিষ্কার গোটা বিশ্বকে রীতিমতো চমকে দিয়েছিল। কারণটা অত্যন্ত স্পষ্ট। এই তত্ত্ব তৎকালীন ক্যাথলিক চার্চ ও পোপের ধর্মমতের বিরুদ্ধে কথা বলছিল। তাই সমাজ ও প্রশাসনের রোষানলে পড়তে বেশি সময় লাগেনি। আমৃত্যু গৃহবন্দি হলেন গ্যালিলিও। ১৬৪২ সালে বাড়িতেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন আধুনিক যুগের অন্যতম জ্যোতির্বিজ্ঞানী। বিশ শতকের শেষে গিয়ে অবশ্য নিজেদের ভুল বুঝতে পারে ক্যাথলিক সমাজ। তুলে নেওয়া হয় যাবতীয় নিষেধাজ্ঞা। সরে যায় ‘অপরাধে’র বোঝা। ততদিনে গ্যালিলিওর তত্ত্ব অবশ্য প্রমাণ করে দিয়েছেন আইজ্যাক নিউটন। 
মৃত্যুর পর গ্যালিলিওর কী হল? তখন তিনি গোঁড়া ক্যাথলিক সমাজের শত্রু। কাজেই সান্তা ক্রোসে ঠাঁই হল না। উল্টে সেন্ট কসিমো ও দামিয়ানোর চ্যাপেলের কাছে গ্যালিলিওকে সমাধিস্থ করা হল। এভাবেই দেখতে দেখতে ৯৫ বছর কেটে গেল। ১৭৩৭ সাল। গ্যালিলিওর বেশ কয়েকজন অনুরাগী ও অন্যান্য বিজ্ঞানীদের দাবিতে তাঁর দেহ সান্তা ক্রোসের ব্যাসিলিকার ভিতরে নিয়ে যাওয়া হয়। এই কাজে অংশ নিয়েছিলেন গিওভান্নি তারগিয়োনি তোজেত্তি, আন্তোনিও কোচি, ভিন্সেনজিও কাপ্পোনি, অ্যান্টন ফ্রান্সেস্কো গোরি। মরদেহ ব্যাসিলাকায় নিয়ে যাওয়ার সময় গ্যালিলিওর তিনটি আঙুল (মধ্যমা, তর্জনী ও বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ), একটি দাঁত ও কশেরুকার একটি অংশ কেটে নিয়েছিলেন তাঁরা।
বিশ শতকের শুরু পর্যন্ত কাপ্পোনি পরিবারের সংগ্ৰহে ছিল গ্যালিলিওর তর্জনী, বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ ও দাঁত। কশেরুকার অংশটি ১৮২৩ সালে ইউনিভার্সিটি অব পাদুয়াকে দান করেন ডোমেনিকো থিয়েন নামে এক ব্যক্তি। আর মধ্যমা আঙুলটি প্রথমে ছিল অ্যাঞ্জেলো মারিয়া বান্দিনি নামে এক ব্যক্তির কাছে। লরেন্সিয়ান লাইব্রেরিতে সেটি রাখা ছিল। ১৮৪১ সালে আঙুলটি চলে যায় লা স্পেকোলার ট্রিবিউন অব গ্যালিলিওতে। ১৯২৭ সালে অবশেষে সেটি স্থান পায় ফ্লোরেন্স মিউজিয়ামে। কিন্তু কাপ্পোনি পরিবারের কাছে থাকা দেহাংশের কী হল? ইতিহাস জানাচ্ছে, ১৯০৫ সালের পর সেগুলির কোনও হদিশ মিলছিল না। আচমকা ২০০৯ সালে একটি নিলামে গ্যালিলিওর হারিয়ে যাওয়া আঙুল, দাঁতের সন্ধান মেলে। সঙ্গে সঙ্গে সেগুলিকে ফ্লোরেন্স মিউজিয়ামে (মিউজিও গ্যালিলিও) নিয়ে আসা হয়। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা এই দাবি মানতে রাজি ছিলেন না। শেষে ডিএনএ পরীক্ষা করা হল। তাতেই জানা গেল যে, মধ্যম আঙুল সহ প্রত্যেকটি দেহাংশ গ্যালিলিওর। আজও ফ্লোরেন্স মিউজিয়ামে গেলে এই আশ্চর্য দৃশ্য দেখা যাবে। আঙুল দিয়ে যেন নিজের আবিষ্কার দেখিয়ে দিচ্ছেন গ্যালিলিও!

সম্পর্কিত সংবাদ