


নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: ব্যাংকে সঞ্চয় নিয়ে কি ঝুঁকি বাড়ছে? গ্রাহকের জমানো টাকা ফেরত পাওয়ার দিকটি কি ক্রমশ অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে? এই প্রশ্ন তুলছেন খোদ ব্যাংকের কর্মী ও অফিসাররাই। এমন আশঙ্কার পিছনে রয়েছে রিজার্ভ ব্যাংকের একটি সার্কুলার। সেটি কার্যকর হতে চলেছে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষে, ১ এপ্রিল থেকে।
প্রতিটি গ্রাহকের ব্যাংক সঞ্চয়ের উপর বিমা করা থাকে। ব্যাংক বন্ধ কিংবা দেউলিয়া ঘোষিত হলে গ্রাহক সর্বোচ্চ পাঁচ লক্ষ টাকা ফেরত পান। ফেরত দেয় ডিপোজিট ইনশিয়োরেন্স অ্যান্ড ক্রেডিট গ্যারান্টি কর্পোরেশন। এজন্য প্রিমিয়াম মেটায় সংশ্লিষ্ট ব্যাংক। এতদিন পর্যন্ত প্রতি ১০০ টাকা জমা বাবদ প্রিমিয়াম ছিল ১২ পয়সা। এই হিসেবে বদল আনছে আরবিআই। তারা বলছে, ১২ পয়সা প্রিমিয়াম সব ব্যাংক নয়, যাদের ঝুঁকি বেশি শুধু তারাই মেটাবে। ঝুঁকির পরিমাণ একাধিক বিষয়ের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়। কোন ব্যাংক কত তাড়াতাড়ি পাততাড়ি গোটাতে পারে, সেই আশঙ্কা বিশেষভাবে বিচার্য। মোট চারটি ভাগে ভাগ করা হবে ব্যাংকগুলিকে। সবচেয়ে কম ঝুঁকির ব্যাংক প্রতি ১০০ টাকা জমার জন্য ৮ পয়সা দেবে। ঝুঁকির তারতম্য অনুযায়ী বাকি তিন ক্যাটিগরিতে প্রিমিয়ামের অঙ্ক ১০, ১১ ও ১২ টাকা। কোন ব্যাংকে ঝুঁকি কত, তা কোনোভাবেই প্রকাশ্যে আনবে না ব্যাংক বা বিমা কর্পোরেশন।
আরবিআইয়ের নয়া সিদ্ধান্তে সিঁদুরে মেঘ দেখছেন কর্মীরা। ব্যাংক অফিসারদের সংগঠন অল ইন্ডিয়া ব্যাংক অফিসার্স কনফেডারেশনের রাজ্য সম্পাদক শুভজ্যোতি চট্টোপাধ্যায় বলেন, ২০০৮ সালে বিশ্বের আর্থিক মন্দায় কঠিন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল ব্যাংক ব্যবস্থায়। তখনো কিন্তু গ্রাহকের ডিপোজিটে ঝুঁকির প্রশ্ন ওঠেনি। এখন আরবিআই তথা সরকার কেন ঝুঁকির হিসেব কষছে? তার মানে কি দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে? আমানত কি সব ব্যাংকে আর সুরক্ষিত নয়? অল ইন্ডিয়া ব্যাংক এমপ্লয়িজ অ্যাসোসিয়েশনের সর্বভারতীয় সভাপতি রাজেন নাগর বলেন, আমাদের হিসাবে, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলি গ্রাহকের ডিপোজিটের উপর প্রিমিয়াম মেটায় প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা। এই টাকা খরচ না-হলে, তা ব্যাংকের মুনাফায় যুক্ত হতে পারত। সরকার নিয়ন্ত্রিত ব্যাংকগুলিকেও প্রিমিয়াম দিতে হবে কেন? গ্রাহকের টাকা সেখানে এমনিতেই নিরাপদে থাকা উচিত। আসলে, ঝুঁকি সম্পূর্ণতই বেসরকারি ব্যাংকে। সরকার তা জানলেও স্বীকার করে না। বেসরকারি ব্যাংকগুলির ঝুঁকির কথা মাথায় রেখেই এই ফর্মুলা সামনে আনা হয়েছে। তবে আমাদের উদ্বেগ আরো গভীরে। মোদি সরকার একসময় ব্যাংকিং ব্যবস্থার উপর এফআরডিআই বিল আনার চেষ্টা করেছিল। আমাদের সর্বাত্মক প্রতিবাদে তাদের সেই ইচ্ছা সফল হয়নি। ওই বিলে বলা হয়েছিল, জনগণের আমানতের টাকা খাটানো হবে ব্যাংকের মূলধন হিসেবে। অর্থাৎ চরম ঝুঁকির মুখে ফেলা হবে আম জনতার সঞ্চয়কে। সে-যাত্রায় সরকার সফল হয়নি। আমাদের ধারণা, সরকার ঘুরপথে ফের তেমন কোনো ফন্দি আঁটছে। এবারের বাজেটেই সরকার ব্যাংক ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজতে উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গড়ার কথা ঘোষণা করেছে। সরকার এসব করে গ্রাহকের আমানতকে ফের ঝুঁকির দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে না তো? আমাদের এই আশঙ্কা আরো জোরালো হচ্ছে।