


যদিও পরমেশ্বর ভগবানরূপে শ্রীকৃষ্ণ কারও প্রতি পক্ষপাতিত্ব করেন না, কিন্তু তবুও ভগবদ্গীতার বর্ণনা অনুসারে যিনি শ্রদ্ধা ও প্রেম সহকারে তাঁর নাম কীর্তন করেন, সেই ভক্তের প্রতি তিনি বিশেষভাবে আকৃষ্ট হন। শ্রীকৃষ্ণ যখন এই লোকে লীলাবিলাস করছিলেন, তখন এক ভক্ত তাঁর মনের কথা ব্যক্ত করে বলেন, “হে পুরুষোত্তম! যদি আপনি জগতের কল্যাণের জন্য অবতরণ না করতেন, তা হলে অসুরদের ভয়ঙ্কর কার্যকলাপের প্রভাবে না জানি সাধুদের কী অবস্থা হত!” শ্রীকৃষ্ণ তাঁর আবির্ভাবের প্রথম থেকেই সব রকম আসুরিক জীবদের পরম শত্রু ছিলেন। তবে অসুরদের প্রতি তাঁর দ্বেষ এবং ভক্তদের প্রতি তাঁর প্রেমের মধ্যে কোন ভেদ নেই, কেন না তাঁর হাতে নিহত অসুসেরাও তৎক্ষণাৎ মুক্তিলাভ করে।
রমণী-মনোহর
যে পুরুষের মধ্যে বিশেষ গুণ থাকে, তিনি নারীদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয় হন। দ্বারকায় মহিষীদের সম্বন্ধে এক ভক্ত বলেছেন, “সাক্ষাৎ ভগবানের সেবাপরায়ণা দ্বারকার মহিষীদের মহিমা কে বর্ণনা করতে পারে? ভগবানের মহিমা এতই অসীম যে, কেবল তাঁর নাম কীর্তন করার ফলেই নারদ আদি মহর্ষিরা দিব্য আনন্দ আস্বাদন করেন। সুতরাং যে সমস্ত মহিষীরা নিরন্তর তাঁকে দর্শন করতে এবং তাঁর সেবা করতেন, তাঁদের মহিমা কে বর্ণনা করতে পারে?” দ্বারকায় শ্রীকৃষ্ণের ১৬,১০৮জন মহিষী ছিলেন। তাঁরা সকলেই লোহা যেমন চুম্বকের প্রতি আকৃষ্ট হয়, ঠিক সেইভাবে শ্রীকৃষ্ণের প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন। এক ভক্ত সেই সম্বন্ধে বলেছেন, “হে শ্রীকৃষ্ণ! আপনি হচ্ছেন চুম্বকের মতো, আর ব্রজাঙ্গনারা হচ্ছেন লোহার মতো—আপনি যেখানেই যান, তাঁরাও আপনার পিছু পিছু সেখানে ধাবিত হন।”
সর্ব-আরাধ্য
যে ব্যক্তি সমস্ত মানুষ ও দেবতাদের শ্রদ্ধাভাজন হন এবং তাঁদের দ্বারা পূজিত হন, তাঁকে বলা হয় সর্ব-আরাধ্য। শ্রীকৃষ্ণ কেবল ব্রহ্মা, শিব আদি সমস্ত জীবদেরই নন, তিনি বলদেব, শেষ আদি বিষ্ণুতত্ত্বদেরও আরাধ্য। বলদেব হচ্ছেন শ্রীকৃষ্ণের স্বয়ংপ্রকাশ, এবং সেই বলদেবও তাঁকে আরাধ্য বলে মনে করেন। যখন শ্রীকৃষ্ণ যুধিষ্ঠিরের রাজসূয় যজ্ঞে উপস্থিত হন, তখন তিনি সেখানে উপস্থিত সমস্ত ঋষি ও দেবতা সহ সকলের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়েছিলেন এবং সকলেই তাঁর আরাধনা করেছিলেন।
সর্ব-ঐশ্বর্যশালী
শ্রীকৃষ্ণ বৈভব, বীর্য, শ্রী, যশ, জ্ঞান ও বৈরাগ্য—এই সমস্ত ঐশ্বর্যে পূর্ণ। শ্রীকৃষ্ণ যখন দ্বারকায় বিরাজ করছিলেন, তখন যদুবংশে ছাপান্ন কোটি সদস্য ছিলেন। তাঁরা সকলেই শ্রীকৃষ্ণের অত্যন্ত অনুগত ও বিশ্বস্ত ছিলেন। নগরবাসীদের বসবাসের জন্য নয় লক্ষ প্রাসাদ ছিল এবং সেখানে সকলেই শ্রীকৃষ্ণকে পরম আরাধ্য বলে মনে করতেন। ভক্তরা শ্রীকৃষ্ণের এই অতুল ঐশ্বর্য দর্শন করে বিস্ময়ান্বিত হতেন। কৃষ্ণকর্ণামৃত গ্রন্থে বিল্বমঙ্গল ঠাকুর শ্রীকৃষ্ণকে সম্বোধন করে বলেছেন, “হে শ্রীকৃষ্ণ! তোমার বৃন্দাবনের ঐশ্বর্যের কথা আমি কি বলব? ব্রজাঙ্গনাদের ঐশ্বর্যের কথা আমি কি বলব? ব্রজাঙ্গনাদের চরণের আভরণ চিন্তামণির থেকেও মূল্যবান মণিরাজির দ্বারা রচিত, তাঁরা পারিজাত ফুল দিয়ে শৃঙ্গার (অঙ্গরাগ) করেন।’’
শ্রীল রূপ গোস্বামী বিরচিত ‘ভক্তিরসামৃতসিন্ধু’ থেকে