


না, আর সহ্য করা যায় না, মানুষের এত দুর্ব্যবহার আর সহ্য করতে পারছি না, অনেক সহ্য করেছি—এর একটা প্রতিবিধান করতেই হ’বে। একটি লোক অশ্বথবৃক্ষের তলায় বসিয়া আপন মনে ঐ কথাগুলি বলিতেছিল। উঠিয়া দাঁড়াইয়া ‘অসহ্য অসহ্য’ বলিতে বলিতে সেস্থান ত্যাগের উপক্রম করিতেছে—এমন সময় শুনিতে পাইল কে বলিতেছে—“সহ্য কর”। সেই ব্যক্তি চতুর্দিকে চাহিয়া কাহাকেও দেখিতে না পাইয়া বলিল—অনেক সহ্য করেছি, আর না। গাছ হইতে উত্তর আসিল—কতটুকু সহ্য করেছ বাপু? সেই ব্যক্তিটি লোক দেখিতে না পাইয়া ভাবিল, হয়তো গাছই কথা কহিতেছে। সে তখন বলিল—দেখুন গাছমহাশয়! আপনি জানেন না স্ত্রীর লাঞ্ছনা কত ভীষণ! গাছ উত্তর করিল—তুমি কি মনে কর গাছ কম সহ্য করে? গ্রীষ্মকালে প্রখর রৌদ্র সে মাথা পেতে নিয়ে নির্ব্বাক্ অবস্থায় সহ্য করে, বর্ষায় ঝড়-জল, বাত-বজ্র, তাহার উপর দিয়ে যায়—সে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকে, শীতকালে শিশিরবিন্দুকে আভরণ ক’রে সে সুদীর্ঘ রাত্রি স্থিরভাবে যাপন করে; বল দেখি বাপু, তুমি গাছের মত এত পীড়ন নীরবে সহ্য করতে পার?
ব্যক্তি। গাছ জড় তাই সহ্য করে, তা’ না হ’লে পারত না।
গাছ। কে বললে গাছ জড়? তোমার যেমন প্রাণ আছে গাছেরও সেইরূপ প্রাণ আছে, তুমি যেমন চৈতন্য-সত্তায় সজীব, গাছও তাই। গাছ সহ্য করতে পারে আর তুমি সহ্য করতে পার না? একটি গল্প বলি শোন—একটি লোক এক সন্ন্যাসীর কাছে গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করেছিল। তার ইচ্ছা যে—সন্ন্যাসী ঠাকুর কৃপা ক’রে তা’কে সাধন ভজন শেখাবেন—সে ভগবদ্ দর্শন লাভে কৃতাৰ্থ হ’বে। দিবারাত্র শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা-বাদল নাই—সে সন্ন্যাসীর সেবায় লেগে রইল। এইরূপে বহুবর্ষ চ’লে গেল, তবু সন্ন্যাসী তাকে কৃপা করলেন না। ক্রমশঃ সে অধৈর্য্য হয়ে স্থানত্যাগের সঙ্কল্প করল। একদিন সন্ন্যাসী ঠাকুর ধ্যানস্থ হ’য়ে আছেন, চেলাটী পলায়নের উদ্যোগ করছে, এমন সময় সে শুনতে পেল, শূন্য হ’তে কে বলছে—‘ধৈর্য্য ধর’। সে অবাক্ হ’য়ে শূন্য গৃহ পানে চেয়ে দেখল, জলের কলস কথা বলছে।
কলস বললে—‘অত ব্যস্ত হয়ো না, ধৈর্য্য ধর, সহ্য কর।’ চেলা বললে—সহ্যের ত সীমা আছে! আজ ২০। ২৫ বৎসর ধৈর্য্য ধরে আছি আর সহ্য করতে পারছি না। কলস বললে—‘তুমি কতটুকু সহ্য করেছ? আমার সহ্যের কথা শুনবে? তবে শোন—প্রথমে আমি মাটী ছিলাম, কত রৌদ্র-বৃষ্টি সহ্য করেছি, কত লোকে আমার উপর মলমূত্র ত্যাগ করেছে। এইরূপ কত বৎসর নীরবে কত পীড়ন সহ্য করছি!
শ্রীগুরুপ্রকাশন প্রকাশিত ‘শ্রীওঙ্কারনাথ-রচনাবলী’ (১ম খণ্ড) থেকে