Bartaman Logo
৬ জুলাই, ২০২৬
বর্তমান / রাজ্য

ঊনআশি টাকা বারো আনা বাকি আছে

প্রায় পঞ্চাশ বছর আগের কথা। যখন বাংলা নববর্ষে গ্রামের অরুণ তথা অরু মুদির দোকানের হালখাতার মোতিচুরের লাড্ডু চুম্বকের মতো আকর্ষণ করত সেদিনের শিশু হৃদয়কে।

ঊনআশি টাকা বারো আনা বাকি আছে
  • ১৫ এপ্রিল, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

রজতকিশোর দে: প্রায় পঞ্চাশ বছর আগের কথা। যখন বাংলা নববর্ষে গ্রামের অরুণ তথা অরু মুদির দোকানের হালখাতার মোতিচুরের লাড্ডু চুম্বকের মতো আকর্ষণ করত সেদিনের শিশু হৃদয়কে। বিদগ্ধ ব্যক্তিত্বের মানুষের বিজ্ঞমনের বিচারে এটাকে নিছক গ্রাম্যতা দোষে দুষ্ট ছেলেমিপনা বলে দূরে সরিয়ে রাখতে পারেন। কিন্তু এত বছর পার হয়ে গেলেও জীবনের নানা ওঠানামা, ঘাত-প্রতিঘাতের ধাক্কা খাওয়া চলমানতা যেন অমলিন। পয়লা বৈশাখের সকালে ধূমধাম করে গণেশ পুজো হয়ে গেলে গ্রামের একমাত্র মুদিখানার মালিক ভুঁড়ির ওপর পৈতেটা দুলিয়ে লাল শালু জড়ানো দু’খানি হিসেবের খাতায় বার বার মাথা ঠুকে তার ভাঙা তক্তপোষে বসতে বসতে যেভাবে বিড়বিড় মন্ত্র উচ্চারণ করতেন–সে দৃশ্য কখনও ভোলা যায়  না।

Advertisement

সারা গ্রামের মঙ্গলের জন্য পয়লা বৈশাখ গ্রামদেবীকালীতলায় ধুমধাম করে পুজো হবে – ঢাক-কাঁসর বাজানো শুরু হয়েছে ভোরবেলা থেকে। আমাদের তখন সকালের স্কুল শুরু হয়েছে। গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সব্বাই একসঙ্গে হইহই করে স্কুলে যায় কিংবা আসে  ওই অরু মুদির দোকানের পাশ দিয়েই। খুব বিরক্ত করার জন্য ছেলেমেয়ের দলকে লাঠি হাতে তাড়াও করে অরু ঠাকুর-আবার ভালোবেসে আদর করে কখনও কখনও তাদের ডেকে টিকটিকি লজেন্স দেয়। তবে নববর্ষে অরু ঠাকুরের হাস্যময় মুখ দিন গড়িয়ে বিকেলের দিকে এগিয়ে যাওয়ার চিহ্ন রাখে- তখন বলিরেখাময় কপালে চিন্তার ভাঁজ গুলো খুব স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
নববর্ষের সকালে দোকানের বাইরে দু’খানি কলাগাছ দরজার দু’পাশে, উপরে আমের শাখা ও পাতা সুন্দর ভাবে লাগানো হয়েছে। আর সামনের ফাঁকা জায়গা থেকে দোকানের ভিতর পর্যন্ত খুব সুন্দর ভাবে আলপনা দেওয়া। আমরা কয়েকজন অতি উৎসাহী বালক নতুন বছরে হালখাতার পুজোর প্রসাদ খাওয়ার লোভে সকাল থেকেই দোকানের সামনে ভিড় করেছিলাম। কে-একজন বলে উঠল – এই ছোঁড়ারা, তোরা এখন যা-পুজো হতে ঢের দেরি আছে! কিন্তু কে কার কথা শোনে- এর মধ্যে হালখাতার পুজোও শেষ হলো। বহু প্রতিক্ষিত লাড্ডু প্রসাদও জুটল দু’হাত ভরে।
প্রসাদের লাড্ডু, মিঠাই পেটে পড়ার পরেই বাড়ির দিকে দৌড় লাগানোর জন্য পা বাড়াতে যাব, অরু ঠাকুরের কণ্ঠ ভেসে এলো– খোকা, বাবা বাড়িতে আছে তো? ঘাড় নাড়িয়ে সম্মতি জানাতেই লাল শালু মোড়া জাবদা খতিয়ানের পুরনো খাতাটা খুলে প্রায়হু ঙ্কারের মতো বলে উঠলেন - বাবাকে বোলো, ঊনআশি টাকা বারো আনা বাকি আছে, ওটা যেন আজই মিটিয়ে দেয়! আর হ্যাঁ, এও বোলো- এবার থেকে বাকি খাওয়া বন্ধ। যেন নগদ দিয়ে মাল নিয়ে যায়। নববর্ষের হালখাতার লাড্ডুর স্বাদ ঠিক মিষ্টি না অন্যকিছু তা বুঝতে বুঝতেই বাড়ির দিকে দৌড় লাগিয়েছিল সেদিনের বালক হৃদয়। আজও বিরামহীন সেই নববর্ষের পথচলা। (লেখক অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, গৌড়বঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় তথা প্রাক্তন উপাচার্য)

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ