নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: শিয়ালদহ স্টেশনের কাছে বৈঠকখানা বাজার। যখনকার কথা হচ্ছে তখন বৈঠকখানা বাজার এমন ছিল না। গঙ্গা থেকে সেখানে যাওয়ার জন্য ছিল পথচলার সরু একটি রাস্তা। মাঝপথে বিশাল এক গাছ ছিল। সৈই ঝোপজঙ্গলে ঘেরা বৈঠকখানা বাজারে রাখা হতো একটি রথ। কয়েকজন ইতিহাসবিদের মতে সেই রথটিই কলকাতার প্রথম রথ। তাতে উঠতেন জগন্নাথ-বলরাম-সুভদ্রা। দেবযানটির হদিশ স্বাভাবিকভাবেই এখন মেলে না। তবে পুরনো পুঁথিতে সেটির উল্লেখ রয়েছে। বহুবাজার স্ট্রিটে রথটি রাখা থাকত। রথযাত্রার দিন বসত বিরাট মেলা। সুতানুটি-গোবিন্দপুর-কলকাতা ছাড়াও আশপাশ অঞ্চলের বহু গ্রামের মানুষ তল্পিতল্পা নিয়ে মেলায় আসতেন। বৈঠকখানা বাজার এলাকাটিকে তখন অনেকেই চিনত। শোনা যায়, জোব চার্নক এসে ওই গাছটির নীচে বসতেন। টুকটাক ব্যবসা করতেন স্থানীয়দের সঙ্গে।
নগেন্দ্রনাথ শেঠ কর্তৃক সম্পাদিত ‘কলকাতাস্থিত তন্তু-বণিক জাতির ইতিহাস’-প্রাচীন এই বইটির ১২৩ থেকে ১২৫ নম্বর পৃষ্ঠায় রয়েছে, শোভারাম বসাক এক প্রসিদ্ধ তন্তুবণিক ছিলেন। ১৬৯০ সালে মুর্শিদাবাদে জন্মেছিলেন। একসময় সপরিবারে চলে আসেন গোবিন্দপুর। শেঠেদের কাছে এসে বসবাস শুরু করেন। আর নবাব সরকারের থেকে জমি-জমা নিয়ে বাড়ি করেন। সেই শোভারাম গোবিন্দপুরে প্রতিষ্ঠা করেন জগন্নাথ-বলরাম-সুভদ্রা। বৈঠকখানার পথে সে রথযাত্রা হতো। চৈতন্যচরণ বসাক বাগানে রাখা থাকত রথ। সেটি ৭০ ফুট উঁচু। শোভারাম পরে জগন্নাথদেবকে নিয়ে বড়বাজারে চলে আসেন। সেখানে দেবস্থাপনা করেন। তারপর মুর্শিদাবাদের নবাবকে বলে গঙ্গার পাড়ে সাত কাঠা জমির বন্দোবস্ত করে স্থাপন করেন জগন্নাথের মন্দির। জায়গাটি ‘জগন্নাথ ঘাট’ বলে পরিচিতি পায়।
এখনও হাওড়া ব্রিজের নীচে জগন্নাথ ঘাট আছে। তবে সে জগন্নাথ মন্দিরটির কথা কেউ বলতে পারেন না। বর্তমানে ঘাটের ভিতর একটি জগন্নাথ মন্দির আছে। কিন্তু স্থানীয়রা বলেন, এর বয়স মেরেকেটে চার থেকে পাঁচ বছর। তবে ঘাট থেকে নবাব লেনের দিকে সোজা হেঁটে গেলে পরপর অনেকগুলি মন্দির। সেখানে একটি জগন্নাথ মন্দিরও আছে। সেটিরও চেহারা ঝাঁ চকচকে। পুরোহিতদের বক্তব্য, ‘মন্দিরের বয়স প্রায় ২৫০ বছর।’ তরুণ এক পুরোহিত জানালেন, ‘এই জগন্নাথ মন্দিরের সঙ্গে মুর্শিদাবাদের যোগ আছে।’ তবে পুরোহিতরা জানালেন, এখনও ধুমধাম করে এখানে রথযাত্রা হয়। তবে এর সঙ্গে বৈঠকখানার কোনও যোগ রয়েছে কি না, তাঁদের জানা নেই। আজ অবশ্য চৈতন্যচরণ বসাক বাগানের অস্তিত্ব নেই। বৈঠকখানার রথটিরও খোঁজ মেলে না। শোভারামের সেই রথটি যেটি কলকাতার প্রথম রথ, সেটির হদিশও কেউ জানেন না। তবে জগন্নাথ ঘাট আছে। সেখানে এখনও কয়েকশো বছর পুরনো কলকাতার অংশবিশেষ রয়ে গিয়েছে গল্প হয়ে। প্রতিটি ইট-কাঠ-গাছ সে গল্প গেলেই শুনিয়ে দেবে।