Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

কুম্ভীরাশ্রু!

মাঞ্চলের গরিব পরিবারের মায়েদের চোখের জল মুছতে নরেন্দ্র মোদির চোখের জল ফেলা দেখলে পাথরও গলে জল হয়ে যেতে বাধ্য। মূলত শহরাঞ্চলে মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত পরিবারে দৈনন্দিন রান্নার কাজে এলপিজি গ্যাসের ব্যবহার শুরু হয়েছে বেশ অনেক বছর আগেই।

কুম্ভীরাশ্রু!
  • ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

মাঞ্চলের গরিব পরিবারের মায়েদের চোখের জল মুছতে নরেন্দ্র মোদির চোখের জল ফেলা দেখলে পাথরও গলে জল হয়ে যেতে বাধ্য। মূলত শহরাঞ্চলে মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত পরিবারে দৈনন্দিন রান্নার কাজে এলপিজি গ্যাসের ব্যবহার শুরু হয়েছে বেশ অনেক বছর আগেই। কিন্তু গ্রামাঞ্চলে গরিব পরিবারে কয়লা, কাঠ, শুকনো পাতাই যে উনুন জ্বালাতে একমাত্র ভরসা! এই বিষাক্ত ধোঁয়া শুধু যে দু’চোখ বেয়ে জলের ঝরনা ধারা বইয়ে দিচ্ছে তাই নয়, বিজেপি নেতারা অহরাত্র প্রচারেও বলেছেন, উনুনের ধোঁয়া থেকে মহিলাদের শরীরে দিনে ৪০০টি সিগারেটের সমান ধোঁয়া ঢোকে। একেবারে ঠিক কথা। মায়েদের সেই চোখের জল, বিষাক্ত ধোঁয়া থেকে রক্ষা করেছেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁরই সৌজন্যে জন্ম নিয়েছে উজ্জ্বলা যোজনা। নিখরচায় রান্নার গ্যাসের সংযোগ, সঙ্গে ভরতুকি গ্যাস। ২০১৬ সালে চালু এই প্রকল্পে গ্রাহকের সংখ্যা নাকি এখন সাড়ে ১০ কোটিতে পৌঁছেছে। সব মিলিয়ে দেশের প্রায় ৩৫ কোটি পরিবারের অন্যতম চাহিদা এখন এলপিজি গ্যাস। সরকারের দাবি মানলে বলতে হয়, ভারতে শহরের ৯৩ শতাংশ এবং গ্রামাঞ্চলের ৫০ শতাংশ পরিবার রান্নার কাজে গ্যাস ব্যবহার করে। মোদি জমানার দশ বছরে এই বৃদ্ধি নাকি সম্ভব হয়েছে ভরতুকির উজ্জ্বলা যোজনার জন্য। ভরতুকি মানে সিলিন্ডার পিছু ৩০০ টাকা। 

Advertisement

কিন্তু গ্রামীণ মহিলাদের জন্য প্রধানমন্ত্রীর চোখের জল, বিজেপির প্রচার, সাফল্যের দাবিতে কার্যত জল ঢেলে দিয়েছে সংসদের স্থায়ী কমিটি। লোকসভায় গত ডিসেম্বরে পেট্রলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটি রিপোর্ট পেশ করে বলেছে, বিগত বছরগুলিতে কেন গ্রাহকরা উজ্জ্বলা প্রকল্পে গ্যাসের সংযোগ নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছে না, তার কারণ খুঁজে বের করা দরকার। এই প্রকল্পে যে গ্রামীণ পরিবারগুলির আস্থা কমছে, প্রকারান্তরে সেটাই বলা হয়েছে কমিটির রিপোর্টে। ঘটনা হল, কমিটির এই পর্যবেক্ষণের জবাবে নিজেদের ঢাক পেটাতে কেন্দ্রীয় সরকার দাবি করেছিল, ২০২৩-২৪ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষের মধ্যে নতুন ৭৫ লক্ষ গ্যাসের সংযোগ দেওয়ার কাজ চলছে। কিন্তু এর মধ্যে কত সংখ্যক সাধারণ গ্রাহক এবং কত সংখ্যক উজ্জ্বলা প্রকল্পের আয়ত্তাধীন, সেই তথ্য কেন্দ্র না দেওয়ায় সরকারের জবাবে যে তারা সন্তুষ্ট নয়, সে কথা রিপোর্টে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। সংসদীয় স্থায়ী কমিটি কেন্দ্রের দেওয়া তথ্য উল্লেখ করেই জানিয়েছে, উজ্জ্বলা প্রকল্পে ২০২০-২১ সালে যত সংখ্যক গ্রাহক ছিল ২০২৪-২৫-এও তা একই রয়ে গিয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, নিখরচায় গ্যাসের সংযোগ, বছরে ৯টি গ্যাস সিলিন্ডারে ৩০০ টাকা করে ভরতুকির হাতছানিও কেন গ্রামীণ পরিবারগুলিকে আকর্ষণ করতে পারছে না, তা নিয়েও। এর পরেও কোন মুখে সরকার সাফল্যের দাবি করছে, তা নিয়ে বিস্মিত অনেকেই। 
সংসদীয় কমিটি তো শুধু প্রশ্ন আর সুপারিশ করেই দায় সেরেছে। কিন্তু এই মহিলাকেন্দ্রিক প্রকল্পটি নিয়ে সরকারি প্রচার ও তথ্যকে রীতিমতো চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক বা এডিবি। দেখা যাচ্ছে, তাদের সাম্প্রতিক রিপোর্টের সঙ্গে সরকারের দাবির কোনো মিল নেই। কীরকম? উজ্জ্বলা যোজনার গ্রহণযোগ্যতা বুঝতে সমীক্ষার জন্য ভারতের আটটি রাজ্যের প্রায় সাড়ে আট হাজার পরিবারকে বেছে নিয়েছিল এডিবি। এদের ৮৩ শতাংশ গ্রামের, ১৭ শতাংশ শহরের। দেখা গিয়েছে, গ্রাহকদের অর্ধেকেরই উজ্জ্বলা প্রকল্প নেই। আর এই সাড়ে আট হাজারের মধ্যে যে অংশটি উজ্জ্বলা প্রকল্পের গ্রাহক নয় তাদের মধ্যে মাত্র ৭৫৭টি পরিবার রান্নার গ্যাস ব্যবহার করে। বাকিদের গ্যাসের সংযোগ থাকলেও অর্থের অভাবে গ্যাস বুকিং করেন না। অন্যদিকে বাকি অর্ধেক অংশ অর্থাৎ যারা উজ্জ্বলা যোজনার অন্তর্ভুক্ত তাদের মধ্যেও মাত্র ৮৭৬ জন প্রাথমিক জ্বালানি হিসেবে গ্যাস ব্যবহার করলেও বাকিরা (৩ হাজার ৩৬৪ জন গ্রাহক) সেই কাঠ-কয়লা-শুকনো পাতার উপরই জ্বালানির জন্য নির্ভরশীল। সমীক্ষায় স্পষ্ট হয়েছে, দেশের ৮১ শতাংশের গ্যাস কেনার ক্ষমতাই নেই। আজও এই বিপুল সংখ্যক দেশবাসীর দিনযাপন সেই কাঠ-কয়লার ধোঁয়ার সঙ্গেই। এই অপারগতা, গ্যাস অনেক উন্নত জ্বালানি জেনেও তা ব্যবহার করতে না পারার অক্ষমতার যে এক ও একমাত্র কারণ পরিবারের সীমিত আর্থিক অবস্থা, দুর্মূল্যের বাজার— তার ইঙ্গিত সর্বত্র। তবু গল্পের গোরুকে মগডালে চড়িয়ে উজ্জ্বলায় সাফল্য নিয়ে ধুন্ধুমার প্রচার চলছে দেশজুড়ে। আর গরিব পরিবারের মা-বোনেদের চোখ সেই আগের মতোই জ্বালানির ধোঁয়ায় জলে ভেজা!

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ