শুভঙ্কর বসু, কলকাতা: মাত্র তিন বস্তা চাল চুরির অভিযোগ! মাঝে কেটে গিয়েছে ৩৪টা বছর! জীবন সায়াহ্নে এসে সেই চুরির দায় থেকে মুক্ত হলেন দক্ষিণ দিনাজপুরের বালুরঘাটের চন্দ্রমোহন রায়। দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের জন্য অর্থের অভাব তো ছিলই। সেই সঙ্গে ছিল চুরির অপবাদ। স্বাভাবিকভাবেই চন্দ্রমোহনের লড়াইটা মোটেও সহজ ছিল না। কিন্তু লড়াইয়ে শেষ হাসি হাসলেন তিনিই।
১৯৯১ সালের ২০ ডিসেম্বরের ঘটনা। বিকেল সোয়া চারটে নাগাদ দক্ষিণ দিনাজপুরের তেহেরচক, পাতিরাম-ত্রিমোহিনী রোড ধরে সাইকেলে তিন বস্তা চাল চাপিয়ে ফিরছিলেন চন্দ্রমোহন। পুলিস তাঁর রাস্তা আটকায়। জিজ্ঞাসাবাদে পুলিসকে তিনি জানান, ব্যবসার জন্য তেহেরচক হাট থেকে তিনি ৬ মন চাল কিনেছেন। তখন পুলিস তাঁকে চালের ব্যবসার জন্য প্রয়োজনীয় লাইসেন্স দেখাতে বলে। সেই সময় তেমন কোনও লাইসেন্স দেখাতে পারেননি চন্দ্রমোহন। এরপরই পুলিস ওই তিন বস্তা চাল বাজেয়াপ্ত করে চন্দ্রমোহনকে চাল চুরির দায়ে গ্রেপ্তার করে।
দক্ষিণ দিনাজপুরের বালুরঘাট বিশেষ আদালতে মামলাটি উঠলে তাঁর বিরুদ্ধে অত্যাবশকীয় বা অপরিহার্য পণ্য আইন ১৯৫৫-র ৭(১)(এ)(ii) ধারায় চার্জ গঠন করে পুলিস। চন্দ্রমোহনের তরফে দু’জন এবং সরকার পক্ষের তরফে তিনজন সাক্ষী পেশ করা হয়। চার বছর মামলা চলার পর বিশেষ আদালত চন্দ্রমোহনকে দোষী সাব্যস্ত করে ৬ মাসের কারাবাস ও ৫০০ টাকা জরিমানার নির্দেশ দেয়। কিন্তু চুরির অপবাদে শাস্তি মানতে পারেননি তিনি। ১৯৯৬ সালে কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন চন্দ্রমোহন।
২৯ বছর ধরে মামলাটি হাইকোর্টের এক এজলাস থেকে অন্য এজলাস হয়ে অবশেষে আসে বিচারপতি অনন্যা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে। এই মামলায় আইনজীবী মনামী মুখোপাধ্যায়কে আদালত-বান্ধব নিয়োগ করা হয়। মামলার শুনানিতে তিনি দাবি করেন, চন্দ্রমোহনের বিরুদ্ধে যে এফআইআর দায়ের হয়েছে, সেটি আদালতগ্রাহ্য অপরাধের পর্যায়ে পড়ে না। রাজ্যের তরফে পাল্টা দাবি করা হয়, অপরাধ প্রমাণিত, তাই মামলাকারীর আবেদন খারিজ করা হোক। সব পক্ষের বক্তব্য শোনার পর বিচারপতি রায়ে জানান, যে ছ’মণ চালের কথা বলা হচ্ছে, তা যে পুলিস পরিমাপ করেছিল, এমন প্রমাণ নেই। অনুমানের ভিত্তিতে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা যায় না। তাই বিশেষ আদালতের নির্দেশ খারিজ করে চন্দ্রমোহনকে বেকসুর খালাসের নির্দেশ দেন তিনি।