


দীপন ঘোষাল, রানাঘাট: নদীয়া জেলার প্রাচীন রথযাত্রাগুলির মধ্যে অন্যতম বীরনগরের মুখোপাধ্যায় বাড়ির পিতলের রথ। এই রথের সূচনা হয় পূর্ববঙ্গের ঢাকায়। এটি সম্পূর্ণ পিতলের। উচ্চতা প্রায় ১২ ফুট। তবে জগন্নাথদেব নন, এই রথের মূল দেব নারায়ণ। স্থানীয়দের দাবি, প্রায় পাঁচ শতাধিক বছরের পুরনো এই রথ। পিতলের রথটি কেবল ধাতব গড়নের কারণেই বিশেষ নয়, প্রাচীনত্বের কারণে জীবন্ত ইতিহাসও।
রথের ইতিহাস খুঁজতে পৌঁছে যেতে হয় রাঢ় বঙ্গীয় সামন্তরাজা আদিশূরের রাজত্বকালে। বঙ্গে উচ্চবংশীয় ব্রাহ্মণদের অভাব অনুধাবন করে সুদূর কোনৌজ থেকে কিছু উচ্চবংশীয় ব্রাহ্মণদের এনে সভাপণ্ডিত পদে বসান। সেই সূত্র ধরেই ভরদ্বাজ গোত্রীয় ব্রাহ্মণ শ্রীহর্ষের আগমন। দ্বাদশ শতকের শেষভাগে তাঁরই উত্তরপুরুষরা অলংকৃত করেন লক্ষ্মণসেনের সভা। পরে লক্ষ্মণ সেন তাঁর রাজধানী ঢাকায় স্থানান্তর করলে শ্রীহর্ষের উত্তরপুরুষরা একটি পিতলের রথ তৈরি করে রথযাত্রার সূচনা করেন। পরে শ্রীহর্ষের ষড়শ উত্তরপুরুষরা ঢাকা পরিত্যাগ করে নদীপথে পিতলের রথটি নিয়ে চলে আসেন ফুলিয়া। সেই যুগের ধাতব শিল্পের অনন্য নিদর্শন এটি। সেই রাম ওঝা ও নরসিংহ ওঝার একটি বংশ সূত্র কৃত্তিবাস ওঝা। আর অন্য সূত্রের বংশধর গঙ্গনন্দ বর্তমান বীরনগরের মুখোপাধ্যায় জমিদার পরিবারের পূর্বপুরুষ। তাদের পরিবারের উদ্যোগে এবং উলা মহাদেব মুখার্জি মেমোরিয়াল ট্রাস্টের পরিচালনায় আজও প্রতি রথ যাত্রার দিনে রশিতে টান পড়ে ঐতিহাসিক এই রথে। মহাদেব মুখোপাধ্যায় ছিলেন এইবংশের শ্রেষ্ঠ পুরুষ।
কেমন দেখতে রথটি? ছয় ফুট দুই ইঞ্চি দৈর্ঘ্যের এবং ছয় ফুট চার ইঞ্চি প্রস্থের পিতলের রথটির নয়টি চূড়া। উচ্চতা সব মিলিয়ে ১২ফুট। বর্তমানে জগন্নাথ সুভদ্র এবং বলরাম থাকলেও রথের মূল অধিষ্ঠতা দেব ‘শ্রীধর’ নারায়ণ শিলা। রথযাত্রার দিন বীরনগরের রাস্তায় এই পিতলের সুউচ্চ রথের যাত্রা দেখার ভিড় রূপ নেয় এক মহোৎসবের।
মুখোপাধ্যায় পরিবারের বর্তমান প্রজন্মের সৌরভ মুখোপাধ্যায় বলেন, বামনদাস মুখোপাধ্যায় আমাদের মুখোপাধ্যায় বংশের রূপকার। তার সময়ে জমিদারীর সর্বোচ্চ শ্রীবৃদ্ধি ঘটে। স্নানযাত্রা আর রথযাত্রাতে বহু বিখ্যাত পণ্ডিত তার শিষ্যদের নিয়ে আসতেন। তাঁর সঙ্গে শ্রীরামকৃষ্ণর কথোপকথন কথামৃতে উল্লেখ আছে। এই রথ বংশের অন্যতম গর্ব। নব চূড়া বিশিষ্ট সম্পূর্ণ পিতল আর তামা দিয়ে তৈরি এই রথ এই ঐতিহাসিক নিদর্শন। -নিজস্ব চিত্র