সুখেন্দু পাল, বর্ধমান: দিনে সাত-আট ঘণ্টা কাজ করলেই মাসে ৫০ হাজার টাকা আয়! তার জন্য মাথার ঘাম পায়ে ফেলারও দরকার নেই। মূলত রান্নাবান্না, সেই সঙ্গে বাড়ির লোকজনের পরিচর্যা—এটুকু করতে পারলেই মিলবে মোটা টাকা পারিশ্রমিক। তবে রাজ্য বা দেশের কোথাও নয়, এই কাজ পেতে গেলে পাড়ি দিতে হবে সুদূর দুবাই। দুঃস্থ ও অসহায় অনেক গৃহবধূর কাছে এমন সুযোগ তো হাতে চাঁদ পাওয়ার সমান! তাই অনেকে এজেন্ট বা দালালের মাধ্যমে দুবাই যাচ্ছেন। কয়েকদিন পর তাঁরা বুঝতে পারছেন, ভয়ানক ফাঁদে পা দিয়ে ফেলেছেন তাঁরা। ‘ভালো কাজ’-এর টোপ দিয়ে গৃহবধূদের দুবাই যেতে রাজি করাচ্ছে এজেন্টরা। প্রয়োজনীয় নথি ও টিকিটের ব্যবস্থা তারাই করে দিচ্ছে। সেখানে পৌঁছে মহিলারা বুঝতে পারছেন, এজেন্টের দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণ তো দূরের কথা, প্রাণ নিয়ে দেশে ফেরাটাই দুষ্কর। প্রতিদিন নিত্যনতুন অত্যাচারের মুখে পড়তে হচ্ছে তাঁদের। এমনকী তাঁদের যৌনদাসী হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
সম্প্রতি দুবাই থেকে কোনওরকমে বাড়ি ফিরেছেন মুর্শিদাবাদের কান্দির এক গৃহবধূ। তিনি বলেন, ‘সারাদিন বাড়ির কাজ করার পর রাতে একটি ঘরে যেতে হতো। সেখানে বিভিন্ন বয়সের একাধিক পুরুষ যৌন নির্যাতন চালাত। এই রাজ্যের আরও অনেক গৃহবধূ সেখানে আটকে রয়েছে। হাজার চেষ্টা করেও তারা ফিরতে পারছে না।’ তাহলে তিনি ফিরলেন কীভাবে? কান্দির গৃহবধূ বলেন, ‘বাড়ির লোকজন বিদেশ মন্ত্রকে অভিযোগ করেছিল। তাদের সহযোগিতায় ঘরে ফিরতে পেরেছি।’ পরিযায়ী শ্রমিকদের স্বার্থে দীর্ঘদিন কাজ করছেন মতিউর রহমান। তিনি বলেন, ‘এর আগে আলিপুরদুয়ার এবং নদীয়ার কয়েকজন মহিলাকে একইভাবে ভুল বুঝিয়ে দুবাই নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা হয়েছিল। তাঁদের কোনওরকমে উদ্ধার করা গিয়েছে। মুর্শিদাবাদ, নদীয়া, উত্তর ২৪ পরগনা এবং পূর্ব বর্ধমানে এই সিন্ডিকেটের এজেন্টরা ছড়িয়ে রয়েছে। এরা দুবাইয়ে গৃহবধূদের পাঠাতে পারলে মোটা অঙ্কের কমিশন পায়। বিদেশ মন্ত্রকে এনিয়ে আমরা একাধিকবার অভিযোগ জানিয়েছি।’ তিনি আরও জানান, দুবাইয়ে যাওয়ার পর অনেকেই পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন না। বাধ্য হয়ে অত্যাচার সহ্য করেন।
প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, এতদিন এজেন্টরা মূলত যুবকদের কাজের জন্য দুবাই বা অন্যত্র পাঠাত। বৈধ নথি থাকলে কোনও সমস্যা হতো না। তিন বা চার বছর পর মোটা টাকা নিয়ে বাড়ি ফিরতেন যুবকরা। কিন্তু, গৃহবধূদের দুবাই পাঠাতে পারলে কমিশন বাবদ তাদের অনেকে বেশি আয় হচ্ছে। সেই কারণে মূলত দুঃস্থ পরিবারের মহিলাদের টার্গেট করছে এজেন্টরা। এক পুলিস আধিকারিক বলছিলেন, ‘দুবাই যাওয়ার সময় থানাকে কিছু জানানো হয় না। সমস্যায় পড়লে থানায় আসে সবাই। কোথাও কাজ করতে যাওয়ার আগে বিস্তারিত খোঁজ নিয়ে যাওয়া উচিত। অনেক সময় অপরিচিত এজেন্টের উপর ভরসা করেই তাঁরা দেশ ছাড়েন। এজেন্টরা বিদেশে পাঠিয়ে দেওয়ার পর আর কোনও দায়িত্ব নিতে চায় না। সব ঝক্কি সামলাতে হয় পরিবার ও পুলিসকে।’