Bartaman Logo
১ জুন, ২০২৬
বর্তমান / কলকাতা

বেনজির তৈলমর্দন

‘তেল কুমার’? নাকি ‘বদলি কুমার’? দুটো নামই কিন্তু এখন ভদ্রলোকের সঙ্গে বেশ লাগসই। ভোট ঘোষণার ৭২ ঘণ্টার মধ্যে ৪৩টা বদলি! একেবারে রাজ্য প্রশাসনের আগাপাশতলা। লক্ষ্য একটাই—বাংলার ‘মুখ্যমন্ত্রী’ বদল।

বেনজির তৈলমর্দন
  • ১৯ মার্চ, ২০২৬ ০৪:০০

শান্তনু দত্তগুপ্ত: ‘তেল কুমার’? নাকি ‘বদলি কুমার’? দুটো নামই কিন্তু এখন ভদ্রলোকের সঙ্গে বেশ লাগসই। ভোট ঘোষণার ৭২ ঘণ্টার মধ্যে ৪৩টা বদলি! একেবারে রাজ্য প্রশাসনের আগাপাশতলা। লক্ষ্য একটাই—বাংলার ‘মুখ্যমন্ত্রী’ বদল। আর তার জন্য মজার খেলা চলছে বটে। চোখের চামড়া বলে কিস্যু নেই। সাংবিধানিক অধিকারকে নির্লজ্জের মতো ব্যবহার করে ছুটে চলেছেন তিনি। রীতিমতো লেজে আগুন দিয়ে। গেরুয়া শিবিরের ‘বিধাতা’রা কেরোসিন ঢেলে দিয়েছেন। আর উনি যখন পারছেন আগুন লাগিয়ে ছুটে বেড়াচ্ছেন। অবসরে বায়ো ডেটা কতটা ‘স্ট্রং’ করে নেওয়া যায়, এটাই তাঁর ধ্যান-জ্ঞান, ধম্ম-কম্ম। কী পাবেন স্যার? রাষ্ট্রপতি পুরস্কার? নাগপুরে সংবর্ধনা? নাকি কোনো বিশেষ প্রাইজ পোস্টিং? আপনার কাছে নিশ্চয়ই বার্তা পৌঁছে গিয়েছে... বিলাসবহুল অবসরকাল অপেক্ষা করছে আপনার জন্য। নির্ঘণ্ট ঘোষণার সময় শেষে পশ্চিমবঙ্গের নাম নিয়েছিলেন। আর সেই ঘোষণার শুরুতেই যা ইঙ্গিতপূর্ণ হাসি এবং ‘পজ’ দিয়েছিলেন, নির্বোধেরও যা বোঝার বোঝা হয়ে গিয়েছিল। এসআইআরের নামে বাংলার মানুষকে হয়রান করেছেন। কাঁদিয়ে ছেড়েছেন। আর এবার বদলি। 

Advertisement

দলের সংগঠন খাবি খাচ্ছে? খেতে দিন সাহেব। আমি তো আছি! ভোটে বিজেপির ধ্বজা উড়বেই। তাই গেরুয়া সম্রাটদের তৈলমর্দন চলছে। লাগাতার। নির্বাচনি নির্ঘণ্ট প্রকাশের মাঝরাতে মুখ্যসচিব, স্বরাষ্ট্র সচিব। তারপর একে একে ডিজি, ২৩ জন পুলিশ কর্তা এবং ১৪ জন জেলাশাসক পদমর্যাদার অফিসার। কারণটা কী? তাঁর কি ধারণা, যাঁরা সাফল্যের সঙ্গে রাজ্য প্রশাসন চালাচ্ছিলেন, তাঁরা সবাই শাসক দলের লোক? মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘কর্মী’? এঁদের গ্যারাজ করে দিলেই ভোটে কেল্লা ফতে? আসলে ধারণাটা তাঁর একার নয়। পুরো গেমপ্ল্যানটাই বৃত্তাকারে ঘুরছে। বঙ্গ বিজেপির দলবদলু খোকাবাবুর সঙ্গে প্রশাসনের একটা মহলের যে যোগাযোগ রয়েছে, সেটা কারও অজানা নয়। নবান্ন বা লালবাজারের চৌহদ্দিতে যাঁরা নিজেদের ‘বঞ্চিত’ বলে মনে করেন, তাঁরা অনেকেই খোকাবাবুর সঙ্গে যোগ রেখে চলেন। বদলির তালিকা দেখলেই বোঝা যাবে, এমন অনেকেই হঠাৎ সামনের সারিতে চলে এসেছেন। কাদের সরানো হবে এবং কাদের আনা হবে... বঙ্গ বিজেপি থেকে সেইসব আধিকারিকদের তালিকা যাচ্ছে দিল্লির দরবারে। সেই সব নাম পাঠানো হচ্ছে ‘তেল কুমারে’র কাছে। আর তিনিও ‘হেঁ হেঁ, যেমন বলবেন স্যার’ বলে যাবতীয় বদলি ‘এগজিকিউট’ করছেন। এমন একটা গুরুত্বপূর্ণ পদে বসেও তিনি কি জানেন না, বছরের পর বছর সাইডলাইনে বসে থাকা অফিসারদের হঠাৎ করে ভোটের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজে এনে ফেললে তাঁরাও নড়বড় করবেন? নির্বাচন সুষ্ঠু ও অবাধ করার দাবি নির্বাচন কমিশন দিল্লির ঠান্ডা ঘরে বসে করে ফেলে। কিন্তু সেই দাবি কার্যকর করে কারা? মুখ্যসচিব নির্ভর করেন জেলাশাসকদের উপর। আর জেলাশাসকরা পুলিশ কমিশনার-পুলিশ সুপারদের উপর। পুরো সিস্টেমটাই যদি বদলে দেওয়া হয়, তাহলে কাজ কে করবে? ভোটটা কে করাচ্ছে? নির্বাচন কমিশন? নাকি বিরোধী দলনেতা? হ্যাঁ, এমন যদি হয় বিরোধী নেতা যা বলবেন, ‘নতুন প্রশাসন’ সেই সব নির্দেশই কার্যকর করবে... তাহলে এ তো দারুণ পদক্ষেপ! কিন্তু তাতে গণতন্ত্র বলে কিছু থাকল তো? আর বছরের পর বছর বসে থাকা এইসব অফিসারদের পরিচালনায় ভুল হলে কি এঁদের উপরই দায় চাপবে? তা কিন্তু নয়। তখন আমরা দেখব, প্রচারের অভিমুখটাই ঘুরে গিয়েছে। বলা হবে, তৃণমূল ও সিপিএমের ক্যাডারদের জন্য সুষ্ঠু নির্বাচন হতে পারেনি। তারা বাগড়া দিয়েছে। অশান্তি পাকিয়েছে। চিত্রনাট্য তৈরি। কিন্তু হ্যাঁ, বড্ড দুর্বল এই চিত্রনাট্য। সাধারণ মানুষও এসব এখন বুঝে গিয়েছে। তাতে অবশ্য এই ভদ্দরলোকদের কিছু আসে-যায় না। নির্দেশ পালন হলেই হল। তাহলেই মাথায় নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহের হাত। চড়চড় করে বাড়বে নম্বর। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর মুকুটে শুধু এই পালকটাই যে নেই! বাংলা দখল। তার ব্যবস্থা করতেই হবে। তাহলে তাঁর প্রস্থানটা সত্যিই ‘সম্মানজনক’ হবে। না হলে? চোনা পড়া দুধের গ্লাস হাতেই অবসর। 
তবে তেল কুমাররা ভুলে যাচ্ছেন, এসআইআর হোক বা রদবদল, এই সবই মোড়ক মাত্র। গণতন্ত্রের মজ্জা কিন্তু সাধারণ মানুষ। ভোটার। ২৩ ও ২৯ এপ্রিল তাঁরা কোন দলকে এবং কোন প্রার্থীকে ভোট দেবেন, সেটাই শেষ কথা। এরপরও দিল্লির গেরুয়া কর্তাদের তল্পিবাহকরা কী করতে পারেন? বহিরাগত ক্যাডারদের জন্য ‘গ্রিন করিডর’। তৃণমূলের কোর ভোটারদের বুথে আসতে বাধা। আধাসেনাকে নির্লজ্জভাবে কাজে লাগানো। ইভিএমে গড়বড়। চেষ্টা চালিয়ে যান স্যার। কিন্তু মনে রাখবেন, এ পরীক্ষা বড্ড কঠিন। বাঘের পিঠে চড়ার মতো। ভোটের শেষে রাজনীতির কারবারিদের কিছুই হয় না। কিন্তু সংবিধানকে ফেল করালে তখন আর পুরস্কার জুটবে না। বাংলার মানুষ আপনাদের জন্য অপেক্ষায় থাকবে... ঘুঁটের মালা হাতে।

সম্পর্কিত সংবাদ