


ভগবানের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের সঙ্গে প্রাকৃত বস্তুর কোন তুলনা হয় না। যে সমস্ত সাধারণ মানুষ ভগবানের অপ্রাকৃত রূপ বুঝতে অসমর্থ, তারা যাতে ভগবানের অপ্রাকৃত রূপের সৌন্দর্য উপলব্ধি করতে পারে, সেই জন্য লৌকিক উপমা দেওয়া হয়। বলা হয় যে, শ্রীকৃষ্ণের মুখমণ্ডল চন্দ্রের মতো সুন্দর, তাঁর ঊরুদ্বয় হাতির শুঁড়ের মতো শক্তিশালী, তাঁর বাহুদ্বয় স্তম্ভের মতো দৃঢ়, তাঁর করদ্বয় পদ্মফুলের মতো বিকশিত, তাঁর বক্ষঃস্থল কপাটের মতো প্রশস্ত, তাঁর নিতম্ব নিবিড়, এবং তাঁর দেহের মধ্যভাগ সংকীর্ণ।
শুভ লক্ষণ
শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে কতকগুলি লক্ষণ দেখা যায়, যা অত্যন্ত মঙ্গলসূচক এবং পরমেশ্বর ভগবানের শরীরে সেগুলি পূর্ণরূপে বর্তমান। এই সম্বন্ধে নন্দ মহারাজের এক সখা কৃষ্ণের শরীরে প্রকাশিত শুভ লক্ষণগুলি সম্বন্ধে বলেন, “হে গোপরাজ নন্দ! তোমার এই শিশু-পুত্রটির দেহ বত্রিশটি শুভ লক্ষণযুক্ত! এই বালক যে কিভাবে গোপকুলে জন্মগ্রহণ করল, তা ভেবে আমি আশ্চর্য হচ্ছি।” সাধারণত শ্রীকৃষ্ণ যখন অবতরণ করেন, তখন তিনি ক্ষত্রিয়কুলে জন্মগ্রহণ করেন, যেমন শ্রীরামচন্দ্র। কখনও কখনও তিনি ব্রাহ্মণকুলেও জন্মগ্রহণ করেন। কিন্তু নন্দ মহারাজ বৈশ্য হওয়া সত্ত্বেও শ্রীকৃষ্ণ তাঁর পুত্রত্ব বরণ করে আবির্ভূত হয়েছিলেন। বৈশ্যদের বৃত্তি হচ্ছে কৃষি গোরক্ষা ও বাণিজ্য। তাই তাঁর সখাটি এই রকম একজন সর্ব সুলক্ষণযুক্ত শিশুকে বৈশ্য পরিবারে জন্মগ্রহণ করতে দেখে বিস্ময়ান্বিত হয়েছিলেন। এইভাবে তিনি শ্রীকৃষ্ণের শরীরে সমস্ত সুলক্ষণগুলি তাঁর পালক পিতা নন্দ মহারাজকে দেখিয়েছিলেন। তিনি আরও বললেন, “এই শিশুটির দেহের সাতটি অঙ্গ রক্তিম—চক্ষু, করদ্বয়, পদদ্বয়, তালু, ঠোঁট, জিহ্বা ও নখ—এই সাতটি স্থান রক্তিম হলে মঙ্গলময় বলে বিচার করা হয়। তাঁর দেহের তিনটি অঙ্গ প্রশস্ত—তাঁর কোমর, ললাট, বক্ষ। তাঁর দেহের তিনটি অঙ্গ হ্রস্ব—গলা, ঊরুদ্বয় ও উপস্থ। তাঁর দেহের তিনটি অঙ্গ গভীর—তাঁর কণ্ঠস্বর, বুদ্ধি ও নাভি। তাঁর দেহের পাঁচটি অঙ্গ উন্নত—তাঁর নাক, বাহুদ্বয়, কর্ণদ্বয়, কপাল ও জঙ্ঘা। তাঁর দেহের পাঁচটি অঙ্গ সূক্ষ্ম—তাঁর ত্বক, কেশ, লোম, দাঁত ও আঙুলের অগ্রভাগ। এই সমস্ত লক্ষণের প্রকাশ কেবল মহাপুরুষদের শরীরেই দেখতে পাওয়া যায়।” হাতে যশরেখাকেও একটি সুলক্ষণ বলে বিবেচনা করা হয়। এই সম্বন্ধে একজন বয়স্কা গোপী নন্দ মহারাজকে বলেন, “আপনার শিশু-পুত্রটির হাতে নানা রকম অদ্ভুত সমস্ত রেখা রয়েছে। তাঁর হাতে পদ্ম, চক্র আদি চিহ্ন রয়েছে, এবং তাঁর পায়ে ধ্বজ, বজ্র, মীন, অঙ্কুশ ও পদ্ম রয়েছে। দয়া করে আপনি এই মঙ্গলময় চিহ্নগুলি দর্শন করুন।”
রুচির
যে সৌন্দর্য স্বাভাবিকভাবে চক্ষুকে আকর্ষণ করে, তাকে বলা হয় রুচির। শ্রীকৃষ্ণের স্বরূপ অতিশয় রুচির। শ্রীমদ্ভাগবতের তৃতীয় স্কন্ধে সেই সম্বন্ধে বলা হয়েছে, “ভগবান শ্রীকৃষ্ণ যখন সুন্দর বেশভূষায় সজ্জিত হয়ে যুধিষ্ঠির মহারাজের রাজসূয় যজ্ঞে এসে উপস্থিত হলেন, তখন সেখানে উপস্থিত ব্রহ্মাণ্ডের সমস্ত মহাপুরুষেরা তাঁকে দেখে অনুভব করলেন যে, শ্রীকৃষ্ণের এই শরীরটি তৈরি করতে গিয়ে বিধাতার সমস্ত কর্মকুশলতা শেষ হয়ে গেছে।”
শ্রীল রূপ গোস্বামী বিরচিত ‘ভক্তিরসামৃতসিন্ধু’ থেকে