


ডাঃ আবদুর রহমান: ডাঃ নবনীতা মহাকাল আয়ুর্বেদশাস্ত্রে বলা হয়েছে ‘শরীরং ব্যাধি মন্দিরম’ অর্থাৎ আমাদের শরীর ব্যাধির মন্দির আর এই ব্যাধি থেকে আরোগ্য লাভ করাই হল আয়ুর্বেদের মূলমন্ত্র।
এটা দু’ভাবে ভাগ করা যেতে পারে—
১. স্বস্থস্য স্বাস্থ্য রক্ষনম—অর্থাৎসুস্থের স্বাস্থ্য রক্ষা করা এবং
২. ‘আতুরস্য বিকার প্রশমনন চ’— অসুস্থের চিকিৎসা করা।
দরজায় কড়া নাড়তে নাড়তে চলেও এসেছে আমাদের সবার আকাঙ্ক্ষিত শীতকাল। সন্ধ্যার ঝিরঝিরে বাতাস সেই বার্তা ইতোমধ্যে দিতে শুরু করেছে। আপনি প্রস্তুতি নিয়েছেন তো?
খুসখুসে কাশি, নাক সরসর কিংবা ভোরের দিকে গলাব্যথা ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে অনেকের। ঋতু পরিবর্তনের সময় এমন হবেই। তার ওপর শীত পড়লেই ত্বকের শুষ্কতা, মাথায় খুশকি, চুলপড়ার সমস্যা শুরু হয়ে যাবে। শীতের সময় অনেকেই আবার মানসিক অবসাদে ভোগেন। জ্বর, সর্দি, শরীর ব্যথা, বমিভাব, তাছাড়া বিভিন্ন রোগ যেমন ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, লিভারের সমস্যা, সন্ধিবাত ইত্যাদি তো লেগেই আছে।
আর রোগ মানেই কাঁড়ি কাঁড়ি ওষুধ। আমরা চিকিত্সা বিজ্ঞানের ভাষাতে বলি, চিকিত্সা দু’রকম ভাবে করতে হয়। প্রথমটি হল রোগ সারাতে ওষুধ প্রয়োগ ও দ্বিতীয়টি ওষুধ ছাড়াতে রোগীকে পরামর্শ দেওয়া। আমরা জানি কিছু সাধারণ প্রতিকার আমাদের বিভিন্ন রোগে খুব কাজে লাগে। তাছাড়া আয়ুর্বেদিক ওষুধগুলির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া তুলনামূলক ভাবে নগণ্য। তাই আজ এই প্রতিবেদনে কিছু খুব বেশি পরিচিত রোগ ও তার আয়ুর্বেদিক প্রতিকার ও ওষুধ সম্পর্কে জানব শুধুমাত্র সাধারণ ধারণার জন্য। এটি কখনওই চিকিত্সকের পরামর্শের বিকল্প হতে পারে না। আসুন তাহলে জেনে নিই কিছু রোগ ও তার প্রতিকার ও প্রচলিত আয়ুর্বেদিক ওষুধ সম্পর্কে—
৯৪. অস্টিওপোরোসিস: আমাদের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাড়ের ঘনত্ব কমতে শুরু করে। এ কারণে হাঁটাচলা ও কাজ করতে সমস্যা হয়। ৩০ বছর বয়সের পর থেকে বেশিরভাগ মানুষের হাড় দুর্বল হতে শুরু করে। হাড়ের দুর্বল হওয়া ফ্র্যাকচারের ঝুঁকি বাড়ায়। অস্টিওপোরোসিস হল একটি হাড়ের রোগ। এই রোগে আক্রান্ত মানুষের সমস্যার শেষ থাকে না। আমাদের দেশের একটা বড় অংশের মানুষের হয়ে থাকে এই সমস্যা। অনেকেই এই অস্টিওপোরোসিস রোগটিকে আর্থ্রাইটিস ভেবে ভুল করেন। তবে এটা আর্থ্রাইটিস নয়, আর্থ্রাইটিস আলাদা রোগ। বরং এটা হাড় ক্ষয়ে যাওয়ার অসুখ। অস্টিওপোরোসিস রোগটিতে হাড় ক্ষয়ে ঝাঁঝরা হয়ে যায়।
চিকিৎসা :হাড়ের স্বাস্থ্য বজায় রাখতে খাওয়া-দাওয়া মেনে চলা খুব জরুরি। মদ্যপান ও ধূমপান ছাড়তে হবে। এই দুই নেশা সমস্যা বাড়তে পারে। এছাড়া মাছ, ডিম, দুধ, মাংস খান। কারণ এই খাবারে রয়েছে ভিটামিন ডি ও ক্যালশিয়াম। এতে হাড়ের ক্ষয় রোধ করা যাবে। তাই এই বিষয়টি মাথায় রাখার চেষ্টা করুন।
অস্টিওপোরোসিসে কিছু ব্যবহৃত আয়ুর্বেদিক ওষুধসমূহ
লাক্ষাদি গুগুল /আভা গুগুল /হাড়জোড় ট্যাবলেট /শাল্লকী ট্যাবলেট /প্রবাল পিষ্টি / মুক্তা পিষ্টি /কোকিলাক্ষ কষায়
৯৫. সন্ধি-বাত (অস্টিওআর্থ্রাইটিস)
সন্ধিবাতের সমস্যা একটি অতি পরিচিত কষ্টকর অস্থি রোগ। আমাদের দেশের প্রায় ২০ কোটি মানুষ এই রোগে ভুগছেন। ৬০ বছরের উপরে ১৮ শতাংশ মহিলা ও ৯.৬ শতাংশ পুরুষ বাতের ব্যথায় কাতর। বার্ধক্য জনিত ক্ষয়ের জন্য এই রোগের প্রাদুর্ভাব বাড়ে। এই সন্ধিবাত রোগটিকে আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানে অস্টিওআর্থ্রাইটিস নামে অভিহিত করা হয়।
বেশি রাত জাগা, অত্যধিক হাঁটা, সারাক্ষণ একনাগাড়ে বসে থাকা, অতিরিক্ত পরিশ্রম, ঠান্ডা জলের ব্যবহার ও বেশিক্ষণ এসি-তে থাকা, মল-মূত্র ইত্যাদির বেগ ধারণ করা, বেশি ভার বহন করা, ভুলভাবে ব্যায়াম বা আসন করা ইত্যাদি কারণে বায়ু বৃদ্ধি পায়। আয়ুর্বেদ শাস্ত্র মতে, বায়ু, পিত্ত ও কফের বৈষম্যই সকল রোগের কারণ। তাই এই প্রকুপিত বায়ু শরীরে কফ ও পিত্তের সাম্যতাকেও নষ্ট করে ও সঙ্গে সপ্তধাতু অর্থাৎ রস, রক্ত, মাংস, মেদ, অস্থি, মজ্জা, শুক্র বিকৃত করে এবং এই রোগ তৈরি হয়। বিশেষভাবে বড় ও মাঝারি ধরনের ভারবাহী অস্থি সন্ধিগুলোর ক্ষয় হয়। দীর্ঘদিনের অনিয়মের ফলে জানুসন্ধি (হাঁটু), গুল্ফসন্ধি (গোড়ালি), ত্রিক সন্ধি (ঊরু সন্ধি), অংসসন্ধি (কাঁধের সন্ধি), কনুই, মণিবন্ধ (কব্জির সন্ধি) ইত্যাদিতে অবস্থিত শ্লেষ্মাধরা কলা বা এক ধরনের পিচ্ছিল জেলি জাতীয় পদার্থ (সাইনোভিয়াল ফ্লুইড) শুকিয়ে যায়। এর ফলে ওই সমস্ত সন্ধির হাড়ের প্রান্তগুলি পারস্পরিক ঘর্ষণ হয় ও প্রদাহ সৃষ্টি করে। এর ফলস্বরূপ ফোলা ও বেদনা (ইনফ্লামেশন ও পেইন) হয়। সাধারণত মধ্যবয়সি মায়েদের বা যেকোনও বেশি বয়স্ক মানুষের ক্ষেত্রে এই অস্থি ও সন্ধির ক্ষয় দেখা যায়। কারণ, এই সময় শরীরে ভিটামিন, খনিজ ইত্যাদি কম শোষণ হয় এবং অস্থি ধাতুর পোষণ ঠিকমতো হয় না।
চিকিৎসা
আয়ুর্বেদের মূল চিকিৎসা যা নিদান পরিবর্জন নামে পরিচিত। জীবনশৈলীর পরিবর্তন যেমন অনাহার, রাতজাগা, শীতল বাতাস ও জলের উপযোগ করা, বেশি পরিশ্রম করা, অতিরিক্ত হাঁটা, মল-মূত্রের বেগ ধারণ করা ইত্যাদি থেকে বিরত থাকতে হবে।
পরিমাণ মতো জল, শাক-সব্জি, মাছ, মাংস, দুধ, ঘি এবং মরশুমি ফল খেতে হবে, যা শারীরিক ক্ষয়কে রোধ করতে পারে।
শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
অল্প একটু সর্ষের তেল বা তিল তেলে ৪-৫ কোয়া রসুনকে ফুটিয়ে সেই তেল আক্রান্ত সন্ধির ওপর হালকা মালিশ করে গরম একটু সেঁক দিলে আরাম মেলে। তাছাড়া আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে বর্ণিত কিছু তেল যেমন— মহানারায়ণ তেল, কর্পূরদি তৈল, মহাবিষগর্ভ তেল ইত্যাদি একটু হালকা হতে মালিশ ও তারপরে বাত নাশক কয়েকটি দ্রব্য যেমন —দশমূল, রাস্না, নিশিন্দা ইত্যাদি ফোটানো জলের গরম সেঁক দিলে উপকার পাওয়া যায়।
শুঁট (শুকনো আদা) ফুটিয়ে চায়ের মতো করে খেলে বেদনা ও ফোলা উভয়ই কমে যাবে।
আয়ুর্বেদ চিকিৎসায় বেশ কিছু ওষুধ ব্যবহৃত হয়। যেমন- ত্রয়োদশাঙ্গ গুগ্গুল যোগরাজ গুগ্গুল, মহাযোগরাজ গুগ্গুল, বাতগজাঙ্কুশ রস, মহাবাত বিধ্বংস রস, বাত গজেন্দ্র সিংহ রস, দশমূল ক্বাথ, মহারাস্নাদি ক্বাথ ইত্যাদি।
৯৬. আম-বাত (রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস)
আমবাত রোগটি একটি অতি কষ্টদায়ক অস্থিসন্ধিগত রোগ। যা রোগীকে ক্রমশ কর্মহীন করে তোলে। অস্থি ও সন্ধির আকারকে বিকৃত করে দেয় ও রোগীর জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে। এই রোগটিকে আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের পরিভাষায় রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস বলে। যা এক ধরনের ইমিউনিটি সম্পর্কিত আর্থ্রাইটিস। ১৬ বছর বয়স থেকে ৬০ বছর বযস্ক মানুষের ক্ষেত্রে এই রোগ দেখা যেতে পারে। সারা ভারতে প্রায় দেড় কোটির বেশি মানুষ এই রোগে ভুগছেন। পুরুষের চেয়ে মেয়েদের এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার হার প্রায় তিন গুণ বেশি। আধুনিক বিজ্ঞানে ‘রিউমাটয়েড ফ্যাক্টর পজিটিভ’ বা ‘অ্যান্টি সিসিপি পজিটিভ’ রোগীদের এই রোগের আওতায় আনলে ও আয়ুর্বেদে সেরো পজিটিভ এবং সেরো নেগেটিভ এই দুই ধরনের আর্থ্রাইটিসের কারণ এবং লক্ষণ গত সাদৃশ্যতা বিচার করে আমবাত রূপে চিহ্নিত করা যেতে পারে।
চিকিৎসা
প্রথমেই রোগের যা কারণ বা নিদান তা পরিবর্জন করতেই হবে। যেমন গুরুপাক খাওয়া, দুগ্ধজাত খাবার, লাল মাংস বা রেড মিট, বড় মাছ, অতিরিক্ত তেল-ঝাল মশলাযুক্ত খাবার ইত্যাদি বর্জন করতে হবে। সারাদিন এসিতে থাকা, রাতজাগা, অত্যধিক পরিশ্রম, অধিক ব্যায়াম, অসময়ে খাওয়া, অত্যধিক খাওয়া ইত্যাদিও বর্জন করতে হবে।
শরীরের বিপাক শক্তি বাড়ানোর জন্য শুণ্ঠী চূর্ণ (শুকনো আদার চূর্ণ) জলে ফুটিয়ে খাওয়া যেতে পারে। এতে ফোলা ও ব্যথায় আরাম মেলে।
আয়ুর্বেদ শাস্ত্রের কিছু ওষুধ যেমন— বৈশ্বানর চূর্ণ বা বৃহৎ বৈশ্বানর চূর্ণ গরম জল সহ খাওয়ানো যেতে পারে। বেশ কিছু ওষুধ যেমন— সিংহনাদ গুগ্গুল, শিগ্রু গুগ্গুল, পুনর্নবা গুগ্গুল ব্যবহার করা হয়ে থাকে।
বেশ কিছু রসৌষধি যেমন সমীরপণ্যগ রস, সূর্যপ্রভা গুলিকা, বাতগজাঙ্কুশ রস, বাতগজেন্দ্র সিংহ রস, আমবাতারি রস, মৃত্যুঞ্জয় রস ইত্যাদি ওষুধ মধু অনুপানে দেওয়া যায়।
যেহেতু এই রোগ সহজে সারে না, তাই শোধন চিকিৎসা অর্থাৎ পঞ্চকর্ম চিকিৎসা খুব কার্যকর। যেমন, স্নেহন, স্বেদন, বিরেচন, বস্তি ইত্যাদি প্রক্রিয়া করানো হয়। বস্তি হল একটি পঞ্চকর্ম প্রক্রিয়া যাতে মলদ্বার দিয়ে ওষুধ প্রয়োগ করা হয়। বস্তি যেগুলি ব্যবহৃত হয় সেগুলি হল নিরুহ বস্তি, ক্ষার বস্তি, বৈতরণ বস্তি ইত্যাদি। এই বস্তি চিকিৎসায় আমবাতে আশ্চর্যরকম ফল মেলে।
৯৭. বাতরক্ত (গাউটি আর্থ্রাইটিস)
বর্তমান জীবনযাত্রায় ‘বাতরক্ত’ নামে এই রোগে অসংখ্য পুরুষ ও মহিলা ভোগেন, এই রোগটিকে আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় ‘গাউট’ বা ‘গাউটি আর্থ্রাইটিস’ বলে। এতে সাধারণত ছোট ছোট সন্ধিগুলি যেমন পা ও হাতের আঙুলের সন্ধি, কব্জি বা কনুইয়ের সন্ধি অথবা অন্যান্য অনেক সন্ধিতে লাল ভাব, ব্যথা, ফোলা, প্রদাহ দেখা যায়। বিশেষভাবে পায়ের বুড়ো আঙুলের সন্ধি প্রায়ই প্রথমে ফোলে ও ব্যথা অনুভূত হয়। আধুনিক মতে, রক্তে ইউরিক অ্যাসিডের মাত্রা যদি বাড়ে বা পিউরিন মেটাবলিজম যদি মাত্রাতিরিক্ত হয় তাহলে এই সমস্যা দেখা যায়।
চিকিৎসা
আয়ুর্বেদের চিকিৎসায় নিদান বা রোগের কারণগুলিকে বর্জন করা চিকিৎসার প্রথম কর্তব্য। তাই আহার সম্বন্ধীয় এবং জীবনশৈলী সম্পর্কিত কারণগুলি বলা আছে তা পরিবর্জন করতে হবে। বিভিন্ন চূর্ণ ওষুধ যেমন তেউড়ি চূর্ণ বা নিশোথ চূর্ণ, গুড়ুচ্যাদি চূর্ণ, চোপচিন্যাদি চূর্ণ গরম জলে মিশিয়ে রোগীকে দেওয়া হয়। পাচন ও ক্বাথ ঔষধি হিসাবে হিসাবে গুডুচ্যাদি ক্বাথ, পটোলাদি ক্বাথ, মহারাস্নাদি ক্বাথ, রাস্নাসপ্তক ক্বাথ, পুনর্নবাদি ক্বাথ ইত্যাদি ব্যবহৃত হয়। বটি ওষুধের মধ্যে কৈশোর গুগ্গুল, অমৃতাদি গুগ্গুল, শিগ্রু গুগ্গুল ইত্যাদি গরম জল সহ দেওয়া যায়।
এগুলি হল শমন ওষুধ, আরও ভালো ফল পেতে শোধন চিকিত্সা অর্থাৎ পঞ্চকর্ম চিকিত্সা করানো যেতে পারে।
৯৮. গৃধ্রসী রোগ বা সায়াটিকা সিনড্রোম:
আয়ুর্বেদে বর্ণিত বাতজব্যাধির মধ্যে গৃধ্রসী রোগ খুব বড় একটি সমস্যা, যেখানে কটি (কোমর), নিতম্ব, পায়ে প্রবল ব্যথা হয় এবং সেই ব্যথা গোড়ালি পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। রোগী যন্ত্রণায় কাতর হন ও হাঁটা চলায় খুব কষ্ট হয়। এই অসুখের কারণে রোগী কর্মক্ষমতাহীন হয়ে পড়েন।
সায়াটিকার চিকিৎসা
যেহেতু আয়ুর্বেদশাস্ত্র মতে রোগের কারণ বা নিদানকে বাদ দেওয়া প্রধান চিকিৎসা, তাই রোগ উত্পত্তির ক্ষেত্রে যে যে কারণগুলি বলা হয়েছে তার থেকে রোগীকে বিরত রাখাটাই চিকিত্সার প্রথম কাজ।
এই রোগের চিকিৎসায় কর্পূরাদি তেল, ক্ষীরবলা তেল, পিণ্ড তেল, মধ্যমনারায়ণ তেল, মহানারায়ণ তেল, মহামাষ তেল ব্যবহার করা হয় যা খুব উপকারী। এছাড়াও বলীয় রাস্নাদি কষায়, দশমূল ক্বাথ, রাস্না দশমূল ক্বাথ, অষ্টবর্গ কষায়, মুস্তাদি মর্ম কষায় ইত্যাদি গরম জল-সহ ব্যবহারে খুবই ভালো ফল মেলে। বেশকিছু গুগ্গুল ও রসৌষধি বটিও সায়াটিকার ব্যথায় অব্যর্থ যেমন— ত্রয়োদশাঙ্গ গুগ্গুল, সিংহনাথ গুগ্গুল, যোগরাজ গুগ্গুল, রাস্নাদি গুগ্গুল, বাতগজাঙ্কুশ, বাতোগজেন্দ্র সিংহ রস ইত্যাদি।
আয়ুর্বেদ মতে উপযুক্ত ব্যবস্থাগুলি ছাড়াও পঞ্চকর্ম চিকিত্সায় বস্তি প্রয়োগ নিয়ম মতো করলে আরও ভালো ফল পাওয়া যাবে।
৯৯. অববাহুক (ফ্রোজেন শোল্ডার):
আয়ুর্বেদে উল্লেখিত অববাহুক রোগটিতে কাঁধের সন্ধি আড়ষ্ট ও শক্ত হয়ে যায় যাকে আধুনিক চিকিৎসা পরিভাষায় বলে ‘ফ্রোজেন শোল্ডার’। অনেক সময় ঘুম থেকে উঠে কিংবা বিশ্রাম অবস্থা থেকে নড়াচড়া করতে গেলে প্রবল ব্যথা অনুভূত হয় কাঁধের সন্ধিতে। মনে হয় যেন কোনওমতেই নাড়ানো যাচ্ছে না কাঁধ। চিকিত্সা বিজ্ঞানের ভাষায় বিষয়টির আর এক নাম ‘অ্যাডেসিভ ক্যাপসুলাইটিস’। মূলত চল্লিশোর্ধ্ব ব্যক্তিদের এই রোগের ঝুঁকি বেশি। তাছাড়া ডায়াবেটিস, থাইরয়েড ও হৃদ্যন্ত্রের সমস্যায় ভোগা রোগীর ক্ষেত্রেও এই রোগের ঝুঁকি অনেকটাই বেশি। পুরুষের তুলনায় নারীর এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে বেশি।
চিকিত্সা
আয়ুর্বেদশাস্ত্রে এই রোগের জন্য বাতনাশক ওষুধ প্রয়োগ ও নানা ধরনের নস্য ব্যবহারের কথা উল্লেখিত আছে। এই রোগের চিকিৎসায় প্রসারণী কষায়, বলীয় রাস্নাদি কষায়, দশমূল ক্বাথ, রাস্না দশমূল ক্বাথ, অষ্টবর্গ কষায়, মুস্তাদি মর্ম কষায় ইত্যাদি গরম জল সহ ব্যবহারে খুবই ভালো ফল পাওয়া যায়। বেশ কিছু গুগ্গুল ও রসৌষধি বটিও ফ্রোজেন শোল্ডারের ব্যথায় অব্যর্থ যেমন— বাতগজাঙ্কুশ, বাতোগজেন্দ্র সিংহ রস, ত্রয়োদশাঙ্গ গুগ্গুল, সিংহনাথ গুগ্গুল, যোগরাজ গুগ্গুল, রাস্নাদি গুগ্গুল ইত্যাদি। বৃহ্ণণ নস্যের জন্য— ক্ষীরবলা ১০১ ড্রপস, অণু তৈল, মহারাজ প্রসারণী তৈল অথবা বাদাম তেল ব্যবহার করা হয়। এই নস্য ব্যথা ও আড়ষ্ট ভাব কমাতে অব্যর্থ। এছাড়াও কাঁধের এক্সারসাইজ ও স্ট্রেচও খুব ফলপ্রসূ।
১০০. প্রতিশ্যায় (রাইনাইটিস):
প্রতিশ্যায় হল নাকের অতিপরিচিত রোগ। এই রোগে নাক থেকে অনবরত স্রাব বের হতে থাকে ও দীর্ঘদিন ভুগলে বেশ কিছু সমস্যা তৈরি করে যেমন— নাকে গন্ধ না পাওয়া, মাথা ব্যথা বা অনবরত হাঁচি ও নাক থেকে জল পড়তে থাকে।
চিকিত্সা: এই রোগের প্রাথমিক অবস্থায় লংঘণ অর্থাৎ উপবাস বা হালকা ভোজনে থাকতে হবে। এছাড়া স্টিম নেওয়া বা স্বেদন, দীপন-পাচন অর্থাৎ মেটাবলিজম বাড়িয়ে দেওয়ার মতো চিকিত্সা করতে হবে। রোগী ঈষদুষ্ণ জল পান করবেন ও ঈষদুষ্ণ জলে স্নান করবেন। যেসব আয়ুর্বেদিক ওষুধগুলো ব্যবহার করা হয়ে থাকে সেগুলি হল— ব্যোষাদি বটি, লক্ষ্মীবিলাস রস (নারদীয়), অগস্ত হরীতকী ও নস্য অর্থাৎ নাকের ড্রপ হিসাবে ষড়বিন্দু তৈল ও অণু তৈল ইত্যাদি।
ক্ষবথু (সাইনুসাইটিস):
এই রোগে আমাদের নাকের প্রকোষ্ঠ প্রায় বন্ধ থাকে ও সঙ্গে মাথায় যন্ত্রণা ও একটা ভারীভাব থাকে। আমাদের নাকের চারপাশে মুখমণ্ডলের হাড়ে চার জোড়া কুঠুরি থাকে। এগুলিকে সাইনাস বলে। ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাস প্রভৃতির দ্বারা এর মধ্যে প্রদাহ হলে তাকে সাইনুসাইটিস বলে। এই রোগে বন্ধ নাকের সঙ্গে মাথা ব্যথা, নাক দিয়ে জল পড়া, হাঁচি ইত্যাদি লক্ষণ দেখা যায়। আয়ুর্বেদে এই রোগের চিকিত্সা প্রতিশ্যায় রোগের অনুরূপ করা হয় ।
অর্ধাবভেদক বা মাইগ্রেন:
আমরা দুই ধরনের মাইগ্রেন দেখতে পাই, প্রথমটি হল মাথা যন্ত্রণা শুরুর আগে একটি আলোর ঝলকানি দেখতে পাওয়া অর্থাৎ আভাযুক্ত মাইগ্রেন। দ্বিতীয়টি হল মেনস্ট্রুয়াল মাইগ্রেন অর্থাৎ মেনসট্রুয়েশনের আগে বা পরে আলোর ঝলকানি ছাড়া আভাহীন মাইগ্রেন। এই রোগটি এতটাই পরিচিত ও যন্ত্রণাদায়ক যে এর লক্ষণ আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এর লক্ষণ দেখে চিকিত্সা করা হয়। শুকনো আদা অর্থাৎ শুঁঠের নিত্য সেবন ও মেয়েদের ক্ষেত্রে ঘৃতকুমারীর শাঁসের প্রয়োগ খুব ভালো কাজে দেয়। আয়ুর্বেদ ওষুধ যেমন শিরঃশূলাদি বজ্র রস, লক্ষীবিলাস রস, সূর্যপ্রভা বটি ও অণুতৈল নস্য খুব কাজে দেয়।
পাণ্ডু রোগ (অ্যানিমিয়া):
চরক সংহিতা অনুসারে পাণ্ডু রোগের কারণ হল— ক্ষারীয় পদার্থ, অম্ল, লবণ, অত্যন্ত উষ্ণ, পরস্পর বিরোধী আহার, দিনে ঘুমানো, ঋতুর বিপরীত আহার, শারীরিক বেগ (তৃষ্ণা, হাঁচি, কাশি, নিদ্রা ইত্যাদি) রোধ করা ইত্যাদি। এছাড়াও অত্যধিক চিন্তা, ভয়, ক্রোধ, শোক ইত্যাদি বিবিধ মানসিক কারণে এই রোগ হয়ে থাকে।
আয়ুর্বেদে পাণ্ডু রোগ পাঁচ প্রকার। পাণ্ডু রোগের উপসর্গগুলি হল অগ্নিমান্দ্য, দুর্বলতা, অরুচি, মাথা ঘোরা, বুক ধড়ফড়, শারীরিক রুক্ষতা, পরিশ্রম ছাড়াই ক্লান্তি ভাব, কানে অবাঞ্ছিত শব্দ অনুভব করা ইত্যাদি লক্ষণ দেখা যায়।
চিকিৎসা
মধুর সঙ্গে যষ্টিমধু সেবন করলে পাণ্ডুরোগে হিতকারী।
আয়ুর্বেদের বিশিষ্ট গ্রন্থ ভৈষজ রত্নাবলীতে উল্লেখিত গুঁড়ো হরীতকী পাণ্ডু রোগের উত্তম যোগ। তবে অবশ্যই চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে এটি সেবন করা উচিত। এছাড়াও নবায়স চূর্ণ, একক দ্রব্যের মধ্যে আমলকী, ভৃঙ্গরাজ, ভূমি আমলকী, কুটকি, পূনর্নভা, গুলঞ্চ, হরিদ্রা ইত্যাদি যথেষ্ট ফলপ্রসূ। আয়ুর্বেদ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রোগ ও রোগীর সাপেক্ষে পঞ্চকর্ম চিকিৎসা, কৃমিহর চিকিৎসা ও দোষের অবস্থা অনুযায়ী বিবিধপ্রকার চিকিৎসার ব্যবস্থা রয়েছে। যে আয়ুর্বেদে ওষুধগুলি সাধারণত ব্যবহার করা হয় সেগুলি হল— নবয়াস লৌহ, ধাত্রী লৌহ, লৌহ সিন্দুরম, লৌহাসব, দ্রাক্ষাসব, সুবর্ণমাক্ষিক ভস্ম উল্লেখ্যযোগ্য।
মুখের ব্রণ বা যৌবন পিড়কা:
হরমোনের তারতম্য, ধুলোবালি, ধোঁয়ার দূষণ, অনিয়মিত লাইফস্টাইল এবং ভুল খাদ্যাভ্যাসের কারণেই মুখের যেখানে-সেখানে গজিয়ে ওঠে ব্রণ। আর ব্রণের ভিড়ে ঢাকা পড়ে ত্বকের জেল্লা।
হলুদে রয়েছে অ্যান্টিইনফ্লেমেটরি ও অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল। এর গুণেই ব্রণ থেকে রেহাই মিলবে দ্রুত। এর জন্য জল বা মধুর সঙ্গে এক চিমটে হলুদ গুঁড়ো মিশিয়ে মুখে মাখুন। ১৫ মিনিট রেখে ধুয়ে নিলেই চমকাবে ত্বক।
নিমপাতাও কার্যকরী ভূমিকা পালন করে ব্রণ কমাতে। নিমপাতার অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল বিষয়ে সবাই জানেন। তাহলে এ দিয়েই দূর করুন ত্বকের ব্রণ। কয়েকটি নিমপাতা বেটে ব্রণে লাগিয়ে দিন। এর ছোঁয়াতেই ব্রণ সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস হবে।
চাইলে অ্যালোভেরা দিয়েও ব্রণ দূর করতে পারেন। বাড়িতে থাকা অ্যালোভেরা গাছের থেকে রস বের করে ত্বকে লাগান। এর অ্যান্টিইনফ্ল্যামেটরি ধর্ম ব্রণের জ্বালাপোড়া ও ব্যথা কমাতে সাহায্য করে। এর ছোঁয়ায় মিলিয়ে যাবে ব্রণের দাগও।
ব্রণ কমাতে সিদ্ধহস্ত চন্দনও। তাই চন্দনের পেস্ট বানিয়ে ত্বকে লাগান। কিছুক্ষণ রেখে ধুয়ে ফেলুন। তাতেই ব্রণ থেকে রেহাই মিলবে। ত্বকও হবে ঝলমলে।
এ ছাড়া ত্রিফলাও ব্রণের চিকিৎসায় ভালো কাজে লাগে। আমলকী, বহেড়া ও হরীতকী নিয়ে তৈরি হয় ত্রিফলা। এর চূর্ণ জলের সঙ্গে মিশিয়ে একটি মিশ্রণ বানিয়ে নিন। তারপর ব্রণতে লাগান। এর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ধর্ম ত্বকে ব্রণ-র দাপট কমাবে। এছাড়াও মহামঞ্জিষ্ঠাদি ক্বাথ, আরোগ্যবর্ধনী বটি ও কুমকুমাদি তৈল আয়ুর্বেদ শাস্ত্রের চিরাচরিত ওষুধ।
লিভার বা যকৃতের সমস্যা:
আমাদের শরীরের অন্যতম প্রয়োজনীয় অঙ্গ হল লিভার বা যকৃৎ। অস্বাস্থ্যকর জীবনধারা, নিম্নমানের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, পর্যাপ্ত পরিমাণে ডায়েটারি ফাইবার গ্রহণ না করা, ব্যায়াম না করা, অ্যালকোহল পান, অসময়ে খাদ্যগ্রহণ এবং দূষণের কারণে লিভারের সমস্যা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা থাকে।
প্রতিকার— মেথির দানা লিভারের সমস্যা দূর করতে সহায়ক। এক চামচ মেথির দানা রাতে জলে ভিজিয়ে রাখুন। পরের দিন সকালে উঠে খালি পেটে সেই জল পান করুন। মেথির দানা ফাইবার সমৃদ্ধ যা ওজনকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং লিভার ও মেটাবলিজমের জন্য সহায়ক। রান্না ঘরে থাকা আরেকটি দুর্দান্ত মশলা হল লবঙ্গ।
এই লবঙ্গ লিভার সিরোসিসের উপসর্গগুলিকে হ্রাস করে এবং ফ্যাটি লিভারের সমস্যাকেও দূর করে। প্রতিদিন খাদ্যের সঙ্গে লবঙ্গ খেলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা উন্নত হয়। এটি শরীর থেকে ক্ষতিকারক র্যাডিকেলকেও দূর করতে সাহায্য করে। আয়ুর্বেদ ওষুধ যেগুলি ব্যবহার হয় সেগুলি হল—আরোগ্যবর্ধনী বটি, ভৃঙ্গারাজ চূর্ণ ও আসব, রোহিতকারিষ্ট, ফলাত্রিকাদি পাঁচন, যকৃৎপ্লীহারি লৌহ ইত্যাদি।
কাশ রোগ বা কাশি:
আয়ুর্বেদে কাশ রোগ ও কাশ লক্ষণ এই দুই ভাবে কাশিকে বিবেচনা করা হয়েছে। কাশ যখন স্বতন্ত্রভাবে দেখা যায় তখন সেটা কাশ রোগ। কিন্তু যখন অন্য রোগের লক্ষণ হিসাবে প্রতীয়মান হয় তখন শুধুই কাশ নামে পরিচিত হয়। আধুনিক বিজ্ঞানে কাশ বা কাশি মূলত একটি লক্ষণ।
ড্রাই কাফ: এক্ষেত্রে শুধুমাত্র শুকনো কাশি থাকে। কোনওরকম কফ ওঠে না।
প্রোডাক্টিভ কাফ: কাশির সঙ্গে কফ জলের মতো বা থোকা থোকা ওঠে। একে ওয়েট কাফও বলা হয়ে থাকে।
প্যারাক্সিসমাল কাফ: অত্যন্ত বীভৎস কাশি। কিছুতেই রুখতে পারা যায় না। খুবই বেদনাদায়ক এবং কষ্টকর কাশি।
ক্রাউপ কাফ: নাসারন্ধ্র থেকে শ্বাসযন্ত্র পর্যন্ত ঊর্ধ্বভাগের শ্বাসনালীতে জীবাণু সংক্রমণের কারণে শ্বাস প্রশ্বাস যাতায়াতের রাস্তায় অবরোধ তৈরি হয় এবং কাশি উৎপন্ন হয়। সাধারণত বাচ্চাদের ক্ষেত্রেই বেশি দেখা যায়।
হুপিং কাফ: এটি একটি ভাইরাসের সংক্রমণ। অত্যন্ত কষ্টকর কাশি হয়। এই কাশি প্রতিহত করার জন্য প্রতিষেধক টিকা নেওয়া যেতে পারে।
স্মোকার্স কাফ: এই নামকরণ থেকে সহজেই বোঝা যাচ্ছে যাঁরা বিড়ি, সিগারেট খান তাঁদেরই এই ধরনের কাশি হয়। অত্যন্ত বিরক্তিকর এই কাশি যে কোনও সময় দেখা দিতে পারে।
জেরিয়াট্রিক কাফ: বার্ধক্যের জন্য রোগী যখন ঘন ঘন কাশিতে আক্রান্ত হন, বিশেষ করে শ্বাসযন্ত্রের ক্ষমতা যখন কমে যায় তখনই এই কাশি হয়। নিউমোনিয়া বা ব্রঙ্কাইটিসের লক্ষণ হিসাবে বয়স্ক মানুষেরা এই কাশিতে কাহিল হন।
চিকিৎসা
অন্যান্য রোগের মতো এই রোগের চিকিৎসাতেও প্রথমেই নিদান বা কারণকে বর্জন করার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ ধুলো ধোঁয়ার সংস্পর্শে আসা, অতি পরিশ্রম করা, শুকনো, রুক্ষ, ঝাল খাবার খাওয়া, উপবাস করা ইত্যাদি যে নিদান তাকে পরিত্যাগ করতেই হবে।
শুষ্ক কাশে: তালিসাদি চূর্ণ ও শৃঙ্গাদি চূর্ণ সহযোগে দুই গ্রাম করে দিনে দুই থেকে তিনবার মধু-সহ চেটে খাওয়া যায়। চন্দ্রামৃত রস-২৫০ মিলিগ্রাম দিনে তিন বার মধুসহ চেটে খাওয়া যায়। কাশ কুঠার রস— ২৫০ মিলিগ্রাম দিনে দুবার মধু-সহ খাওয়া যায়। লবঙ্গাদি বটি ও মরিচ্যাদি বটি ২৫০ মিলিগ্রাম দিনে তিনবার মধু সহ খাওয়া যায়।
আর্দ্র কাশিতে: সিতোপলাদি চূর্ণ দুই গ্রাম করে দিনে তিনবার মধু সহ চেটে খাওয়া যায়।
লক্ষ্মীবিলাস রস: ২৫০ মিলিগ্রাম দিনে দু’বার আদার রস দিয়ে চিবিয়ে খাওয়া যায়।
আর্দ্র বা শুষ্ক বা যে কোনও কাশিতে: শ্বাসকাস চিন্তামণি রস—১২৫ থেকে ২৫০ মিলিগ্রাম দিনে দু’বার মধু সহ খেতে দিতে হবে। দশমূলকটুত্রয়য়াদি ক্বাথ ২০ মিলি লিটার দিনে দু’বার সমপরিমাণে জল সহ খেতে হবে। অভ্র ভস্ম, প্রবাল ভস্ম ২৫০ মিলিগ্রাম করে দিনে দু’বার খাওয়া ভীষণ উপকারী। লঘুমালিনী রস ১২৫ মিলিগ্রাম দিনে দু’বার মধু সহ উপকারী।
শ্বাস রোগ বা ব্রঙ্কিয়াল অ্যাজমা ও ব্রঙ্কাইটিস:
শ্বাস রোগে বিশেষ করে ব্রঙ্কিয়াল অ্যাজমা ও ব্রঙ্কাইটিস অত্যন্ত কষ্টদায়ক ক্রনিক দুরারোগ্য ব্যাধি। পৃথিবী জুড়ে অ্যাজমা একটি ভয়ঙ্কর সমস্যা। ভারতে প্রায় সাড়ে তিন কোটি মানুষ অ্যাজমায় আক্রান্ত। পৃথিবীর যত মানুষ অ্যাজমাতে ভোগেন, তার সাড়ে ১৭ শতাংশ মানুষ ভারতে থাকেন। ইনহেলার, স্টেরয়েড, ব্রঙ্কোডায়োলেটর, অ্যালার্জিনাশক ওষুধ ইত্যাদির মাধ্যমে আপাতত রোগীর শ্বাসকষ্ট লাঘব করা গেলেও এ রোগ থেকে সম্পূর্ণ নিষ্কৃতি কেউ পাচ্ছে না। তাই দেখে নেওয়া যাক এরকম একটি গুরুতর কষ্টদায়ক স্বাস্থ্য সমস্যায় আয়ুর্বেদ কীভাবে সাহায্য করতে পারে।
আয়ুর্বেদ মতে, কার্ডিও রেসপিরেটরি সিস্টেম বা শ্বাসরোগ প্রাণবহ স্রোতের অর্থাৎ হৃদয় ও শ্বাসনালীর একটি রোগ, এই সমস্যায় রোগীর শ্বাস নেওয়া ও শ্বাস ছাড়ার প্রক্রিয়ায় অতীব কষ্ট অনুভূত হয়। সাঁ সাঁ শব্দ হয় বলে একে শ্বাসরোগ বলে। এই রোগে মূলত বায়ু ও কফ কুপিত হয়। এই কুপিত কফ দ্বারা বায়ু বিশেষ করে প্রশ্বাসবায়ু বা প্রাণবায়ুর যাতায়াতের রাস্তা যখন অবরুদ্ধ হয়, তখনই শ্বাসকষ্ট সহ অন্যান্য লক্ষণ প্রকাশিত হয়।
চিকিৎসা
অন্যান্য রোগের চিকিৎসার মতো এই তমক শ্বাস বা ব্রঙ্কিয়াল অ্যাজমার চিকিৎসায় ও রোগীর নিদান বা কারণগুলিকে যেমন ধুলো, ধোঁয়ার সংস্পর্শে আসা, শীতল পানীয়, গুরুপাক খাবার, দুপুরে ঘুম ইত্যাদি বায়ু ও কফ প্রকোপক যে নিদানগুলি আগে বলা হয়েছে সেগুলিকে পরিত্যাগ করা অবশ্য কর্তব্য। যেসব আয়ুর্বেদিক ওষুধ সচরাচর ব্যবহার হয়ে থাকে—
শীতপলাদি চূর্ণ: ৩ গ্রাম মাত্রায় দু’ বার মধু সহ খাওয়া যায়। সকালে ও সন্ধ্যায় খাওয়া যেতে পারে।
শৃঙ্গাদি চূর্ণ: ৩ গ্রাম মাত্রায় দুপুরে ও রাতে খাবার পর গরম জল সহ খাওয়া যায়।
পিপুল চুর্ণ: ১২৫ মিলিগ্রাম মাত্রায় পিপুল চূর্ণ নিয়ে প্রতিদিন মধু সহ চেটে খেলে শ্বাসকষ্ট সারে। এই সমস্ত ওষুধ সংশমনীয় অর্থাৎ দোষকে সাম্যাবস্থায় আনতে সাহায্য করে।
শ্বাসকুঠার রস: ১২৫ মিলিগ্রাম থেকে ২৫০ মিলিগ্রাম দিনে দু’ বার মধু সহ খাওয়া যায়।
শঙ্খ ভস্ম, অভ্রক ভস্ম, টঙ্কন ভস্ম ইত্যাদি ২৫০ মিলিগ্রাম থেকে ৫০০ মিলিগ্রাম খাওয়া যেতে পারে।
দশমূল ক্বাথ, শিরিষ ক্বাথ, দেবদাব্বাদি ক্বাথ, বাসাদি ক্বাথ ২০ মিলিলিটার দিনে দু’ বার দেওয়া যেতে পারে। অত্যধিক শ্বাসকষ্টে এই ক্বাথগুলির যেকোনও একটির সঙ্গে সোমলতা চূর্ণ ৫০০ মিলিগ্রাম দিনে দু’বার প্রক্ষেপ দিয়ে খাওয়া যায়।
বাসাবলেহ, চ্যবনপ্রাশ, ইত্যাদি ৫ থেকে ১০ গ্রাম করে দু’ বার চেটে চেটে খেতে হয়।
দ্রাক্ষারিস্ট, দ্রাক্ষাসব, কনকাসব ইত্যাদি ২০ মিলিলিটার দিনে দু’বার সমপরিমাণ জল সহ খাওয়া যায়।
অম্লপিত্ত (হাইপার অ্যাসিডিটি):
গ্যাস, অম্বল আমাদের রোজকার সমস্যা। এমনকী অনেকেই ভাত, ডাল, আলু সেদ্ধ খাওয়ার পরও গ্যাস, অ্যাসিডিটির খপ্পরে পড়েন। সাধারণত দু’টি কারণে গ্যাস, অ্যাসিডিটির ফাঁদে পড়তে হয়। প্রথমত, কোনও কারণে হজমরস বা জঠরাগ্নি ঠিক মতো তৈরি হয় না। ফলে খাবার হজম হতে চায় না। দ্বিতীয়ত, অত্যধিক পরিমাণে জঠরাগ্নি তৈরি হয়। ফলে পাকস্থলীর লাইনিং বা অন্দরের দেওয়ালে ক্ষত তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়।
চিকিত্সা
জঠরাগ্নি কম থাকলে জিরে, শুঁঠ, সৈন্ধব লবণ, আমলকী সহযোগে তৈরি কিছু হজমি অত্যন্ত কার্যকরী। অপরদিকে পেটে বায়ু জমার প্রবণতা থাকলে পিপুল চূর্ণ, হরীতকী চূর্ণ হল মহৌষধির সমান। আবার পাকস্থলীতে বেশি অ্যাসিড তৈরি হলে যষ্ঠীমধু, ত্রিফলা এবং আমলকী অত্যন্ত কার্যকরী। তাছাড়া ধাত্রী লৌহ, লবণভাস্কর চূর্ণ, অবিপত্তিকার চূর্ণ, চিত্রকাদি বটি ও মহাশঙ্খ বটি ইত্যাদি ব্যবহার করা হয়ে থাকে।
কোষ্ঠকাঠিন্য
একটি গুরুতর সমস্যা তবে লোকেরা এটিকে হালকাভাবে নেয়। শরীরে অস্বস্তি বোধ করা থেকে শুরু করে পেটে ব্যথার মতো সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। কোষ্ঠকাঠিন্যের প্রধান কারণ হল অনিয়মিত জীবনযাপন এবং দুর্বল খাদ্যাভ্যাস। এর সঠিক চিকিৎসা জরুরি। যদি কোষ্ঠকাঠিন্যের চিকিৎসা না করা হয় তবে এটি পরবর্তীতে একটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যায় পরিণত হতে পারে, যা অর্শ, বায়ু, অন্ত্র এবং পাকস্থলীর অনেক গুরুতর রোগের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
চিকিত্সা:
কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা থাকলে, তা থেকে মুক্তি পেতে গরম জল ও ঘি ব্যবহার করতে পারেন। ঘি আমাদের শরীরকে লুব্রিকেট করতে এবং অন্ত্র পরিষ্কার করতে সাহায্য করে। এটি বর্জ্য সঞ্চালন উন্নত করে ও কোষ্ঠকাঠিন্যের ঝুঁকি কমায়।
ঘি বিউটরিক অ্যাসিডের একটি বড় উৎস। বিউটরিক অ্যাসিড খাওয়া অন্ত্রের বিপাক প্রক্রিয়া উন্নত করে এবং মল চলাচলে সহায়তা করে। এছাড়া উচ্চ ফাইবারযুক্ত খাবার খেতে হবে। যে ওষুধগুলি ব্যবহার হয় সেগুলি হল, ত্রিবৃত চূর্ণ ও অবলেহ, অবিপত্তিকার চূর্ণ, ত্রিফলা চূর্ণ, বিরেচন চূর্ণ ইত্যাদি। পরিশেষে বলতে চাই যেকোনও রোগে শুধুমাত্র ঔষধ সেবন ছাড়াও, খাদ্য খাবার ও জীবনশৈলীর পরিবর্তন করা খুব জরুরি।