Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

অর্জুন

ধৃতরাষ্ট্রের আর ধৈর্য বাঁধ মানছে না। ভাবছেন এরপর বুঝি যুদ্ধ শেষ। জয় তাঁর পুত্রদের করায়ত্ত। বারবার চক্ষুহীন মুখ তুলে তাকাচ্ছেন সঞ্জয়ের মুখের দিকে। সঞ্জয় আবার বলতে শুরু করলেন—অর্জুন এই রকম শোকাভিভূত হওয়ায়, অশ্রুপূর্ণ হওয়ার কারণে চোখে দেখতে পাচ্ছেন না। তখন শ্রীভগবান (যিনি ‘ভগ’ অর্থাৎ সমস্ত এনার্জির অধীশ্বর তিনিই ভগবান) বললেন— ওহে অর্জুন, এই সময়ে কোথা থেকে তোমার মনে এই মোহের উদয় হলো।

অর্জুন
  • ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

ধৃতরাষ্ট্রের আর ধৈর্য বাঁধ মানছে না। ভাবছেন এরপর বুঝি যুদ্ধ শেষ। জয় তাঁর পুত্রদের করায়ত্ত। বারবার চক্ষুহীন মুখ তুলে তাকাচ্ছেন সঞ্জয়ের মুখের দিকে। সঞ্জয় আবার বলতে শুরু করলেন—অর্জুন এই রকম শোকাভিভূত হওয়ায়, অশ্রুপূর্ণ হওয়ার কারণে চোখে দেখতে পাচ্ছেন না। তখন শ্রীভগবান (যিনি ‘ভগ’ অর্থাৎ সমস্ত এনার্জির অধীশ্বর তিনিই ভগবান) বললেন— ওহে অর্জুন, এই সময়ে কোথা থেকে তোমার মনে এই মোহের উদয় হলো। যা আর্যগণের অযোগ্য। স্বর্গপথের প্রতিবন্ধক ও যা অযশস্কর। এবার তিনি ধমকের সুরে বললেন—হে অর্জুন, এই ক্লীবত্ব আশ্রয় করিও না। এই কাপুরুষতা তোমার শোভা পায় না। হে শত্রুপীড়নকারী, এই ক্ষুদ্র হৃদয় দৌর্বল্য ত্যাগ করো। ওঠো। জাগো, যুদ্ধ করো।
দ্বিতীয় অধ্যায়ের নাম ‘সাংখ্যযোগ’। এই অধ্যায়ে মোট বাহাত্তরটি শ্লোক। বিষাদগ্রস্ত—যুদ্ধবিমুখ অর্জুনকে স্ব-ভাবে ফিরিয়ে আনার জন্যে সারিথ, বন্ধু তথা গুরুরূপী শ্রীকৃষ্ণকে নানা পন্থার আশ্রয় নিতে হয়েছে। কখনও কর্মের পথ, কখনও ভক্তির পথ, আবার কখনও বা জ্ঞানের পথ। ‘সাংখ্য’ শব্দের অর্থ ‘জ্ঞান’। যেহেতু এই অধ্যায়ে মূলত জ্ঞানমার্গের কথা সবিস্তারে বলা হয়েছে তাই এই অধ্যায়ের শিরোনাম-সাংখ্যযোগ।
অবসাদগ্রস্ত, কিংকর্তব্যবিমূঢ় অর্জুন যেন সমস্ত বল, বীর্য, সাহস হারিয়ে ফেলেছেন। তিনি সকাতরে সখা, সারথি ও গুরু শ্রীকৃষ্ণকে বলছেন—
হে অরিসূদন, (যিনি অরি অর্থাৎ শত্রুকে মর্দন করেন) ভীষ্ম, দ্রোণ প্রমুখ আমার গুরুজন, পূজার্হ। আমি তাঁদের সঙ্গে কিভাবে বাণের দ্বারা প্রতিযুদ্ধ করব? হে মধুসূদন (মধু নামক দৈত্য বিনাশকারী), মহানুভব গুরুজনদের বধ না করে যদি ভিক্ষা করে খায় তাতেই বরং আমাদের পক্ষে কল্যাণকর কিন্তু তা না করে যদি যুদ্ধে এঁদের হত্যা করি তবে রক্তস্নাত ধনসম্পদ ও ভোগ্য বস্তুসকল ভোগ করতে হবে ইহজগতে। এই যুদ্ধে আমরা জিতি বা ওরা আমাদের পরাজিত করে এর মধ্যে কোন্‌টা শ্রেয় বুঝতে পারছি না। যাদের বধ করে রাজ্য লাভ তো দূরের কথা বাঁচতেও চাই না সেই ধৃতরাষ্ট্রীয়পক্ষগণ আমাদের সামনে যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত। এদের হত্যা করে কিভাবে জীবনধারণ করবো এই ভাবনায় আমি ব্যথিত। আমার শৌর্য প্রায় অস্তমিত। বীর্যে হীনবল। মন ভাবনাব্যাকুল। মনে সন্দেহের দোলাচল। আমি আপনার শিষ্য। আমার পক্ষে যা শ্রেয়, বা মঙ্গলকর তা নিশ্চয়রূপে বলুন। আমাকে সঠিক উপদেশ দিন। আমি আপনার শরণাগত। 
অর্জুনের মনের বাঁধন আলগা। দিশাহীন। প্রশ্নের বিপুল স্রোতে বিধ্বস্ত তিনি । দেখতে পাচ্ছেন না কোথাও কোনো আলোর রূপালী রেখা। চারদিকে যেন নিবিড় তিমিরঘন রজনী। তিনি আবার বলে চলেছেন—পৃথিবীতে শত্রুশূন্য রাজ্যে এমনকি স্বর্গের অধিকার পেলেও আমি স্বস্তি পাবো না। কেননা, আমার ইন্দ্রিয়বর্গের শোকসন্তাপক কোনও উপায় আমি দেখতে পাচ্ছি না।

Advertisement

পার্থসারথি গায়েন-এর ‘শ্রীমদ্‌ভগবদ্‌গীতা ও দিব্যজীবন’ থেকে

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ