১৯১৯ সালের ১৩ এপ্রিল। জালিয়ানওয়ালা বাগের নারকীয় হত্যাকাণ্ড। নেপথ্যে সেই কুখ্যাত ব্রিটিশ সেনাকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রেজিনাল্ড মাইকেল ডায়ার। ইতিহাসে তিনি ‘অমৃতসরের কসাই’ নামে পরিচিত। কিন্তু ষড়যন্ত্রে নাকি জড়িত ছিলেন এক ভারতীয়ও। কে সেই ‘বিশ্বাসঘাতক’? তাঁর নাম হংস রাজ। জালিয়ানওয়ালা বাগে সেদিনের সেই মিটিংয়ের আয়োজক ছিলেন তিনিই। ১৯১৯ সালের পাঞ্জাব— রাওলাট আইন ও ব্রিটিশ আতঙ্কের জাঁতাকলে পিষ্ট। দেশজুড়ে বলশেভিক প্রভাবের আশঙ্কায় তড়িঘড়ি কঠোর দমনমূলক রাওলাট আইন চালু করে ইংরেজ সরকার। ওই বছরেরই ৯ এপ্রিল পাঞ্জাবে হিন্দু-মুসলিম একত্র হয়ে রাওলাট আইনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ শুরু করে। লাহোরের এক মসজিদ থেকে ভাষণ দেন স্বামী শ্রদ্ধানন্দ। স্লোগান ওঠে ‘হিন্দু-মুসলিম কি জয়’। আর দুই সম্প্রদায়ের এই ঐক্যের ভয়ে ব্রিটিশরা অস্থির হয়ে ওঠে। পরদিন ১০ এপ্রিল দুই কংগ্রেস নেতা ডঃ সত্যপাল ও ব্যারিস্টার সইফুদ্দিন কিচলুকে ডেপুটি কমিশনারের অফিসে ডেকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁদেরই বন্ধু হংস রাজ সেদিন ডেপুটি কমিশনারের দপ্তরে হাজির ছিলেন। ধৃত দুই কংগ্রেস নেতার লেখা চিঠি পরিবারের কাছে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব ছিল তাঁর উপরই। দুই নেতার গ্রেপ্তারির প্রতিবাদে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে অমৃতসর। পুলিস গুলি চালায়। ১০ জন মারা যান। জমায়েতের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে ব্রিটিশরা। সেই নিষেধাজ্ঞা উড়িয়ে জালিয়ানওয়ালা বাগে সভার ডাক দেন হংস রাজ। জড়ো হন প্রায় ২৫ হাজার মানুষ। ডায়ারও হাজির হন তাঁর সশস্ত্র বাহিনী নিয়ে। হংস রাজ মঞ্চে ওঠেন। সাদা পতাকা নেড়ে বলেন, ‘ভয় পেও না। সেনারা কিছুই করবে না।’ প্রায় ১০ মিনিট ধরে ১৬০০ রাউন্ড গুলি চলে। অসংখ্য মানুষের প্রাণহানি ঘটে। হংস রাজ নাকি গুলি চলার ঠিক আগে মঞ্চের আড়ালে লুকিয়ে পড়েন। পরে রাজসাক্ষী হয়ে যান। ইতিহাসবিদদের একাংশের দাবি, হংস রাজ ছিলেন ব্রিটিশ-গুপ্তচর। মঞ্চ তৈরি, সভা ডাকা, সাদা পতাকা ওড়ানো—এ সবই ছিল ষড়যন্ত্রের অংশ। একজন ‘কসাই’ ও এক ‘বিশ্বাসঘাতক’ মিলে সেদিন হত্যালীলা চালিয়েছিলেন। ইতিহাসবিদ ভিএন দত্তের মতে, হংস রাজের আচরণ ও পুলিসের ভূমিকা ইঙ্গিত দেয়, পুরোটাই ছিল পরিকল্পিত ফাঁদ। তবে ইতিহাসবিদ কিম ওয়াগনার মনে করেন, হংস রাজ শুধুই একজন সুবিধাবাদী।



