যাত্রা বাংলার সুপ্রাচীন জনপ্রিয় লোকনাট্য ধারা। যুগে যুগে বহু প্রতিভার হাত ধরে সমৃদ্ধ হয়েছে এই শিল্প। উত্তর কলকাতার বাগবাজার স্ট্রিটে ফণিভূষণ বিদ্যাবিনোদ যাত্রামঞ্চ ইতিহাসের এমনই এক প্রতিভার স্মৃতি বয়ে নিয়ে চলেছে। ফণিভূষণ বিদ্যাবিনোদ। যাত্রাশিল্পের উজ্জ্বল নক্ষত্র। হুগলি জেলার গরলগাছা গ্রামে মামার বাড়িতে তাঁর জন্ম। প্রবেশিকা পরীক্ষায় পাশ করে ‘শিল্পগুরু’ অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে বেশ কিছুদিন ছবি আঁকা শিখেছিলেন তিনি। গভর্নমেন্ট আর্ট স্কুল থেকে ড্রাফ্টসম্যানশিপ পাশ করেন। মাত্র ১৭ বছর বয়সে ফণিভূষণ লেখেন ‘ক্ষত্রিয় গৌরব’ যাত্রাপালা। হৃষিকেশ সঙ্গীত সম্প্রদায় তাঁর এই পালা মঞ্চস্থ করে খ্যাতি পেয়েছিল।
Advertisement
ফণিভূষণের পরিবারের সঙ্গে ছিল যাত্রাজগতের নিবিড় যোগ। বাবা রঘুনাথ মুখোপাধ্যায় ছিলেন দক্ষ অভিনেতা। বাবার কাছেই অভিনয়ের তালিম। তাঁর ইচ্ছেতেই শখের যাত্রায় প্রথম অভিনয়। তারপর থেকে অভিনয় ও পালা রচনা পাশাপাশি চলতে থাকে। সেইসময় জ্যাঠামশাই সতীশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের ‘রামকৃষ্ণ নাট্য সমাজ’ যাত্রাদল বেশ সাড়া ফেলেছিল। তরুণ ফণিকে জ্যাঠামশাই নিজের দলে ডেকে নেন। সেই সূত্রেই প্রথম পেশাদার মঞ্চে ফণিভূষণের আত্মপ্রকাশ। এখানে যাত্রাপালাও রচনা করেন তিনি। অহল্যার কাহিনী অবলম্বনে তিনি লেখেন ‘পাষাণী’। গৌরাঙ্গ প্রসাদ ঘোষ তাঁর ‘৩০০ বছরের যাত্রা শিল্পের ইতিহাস’ গ্রন্থে লিখেছেন, ইতিহাস, পুরাণ ও সংস্কৃত নাট্য সাহিত্যে ফণিভূষণের পাণ্ডিত্য ছিল সুবিদিত। এক সময় তিনি গণনাট্য সঙ্ঘেও যোগ দিয়েছিলেন। ১৯৬৮ সালে ফণিভূষণ প্রথম সঙ্গীত নাটক একাডেমি পুরস্কারে সম্মানিত হন। ওই বছর ১৪ ডিসেম্বর ‘বাঁশের কেল্লা’ পালায় অভিনয় করতে করতে হঠাৎই অসুস্থ হয়ে পড়েন ফণিভূষণ। অল্প সময়ের মধ্যেই মারা যান তিনি। তাঁর লেখা পালার সংখ্যা বিস্তর। তবে তার মধ্যে অন্যতম—ভাগ্য দেবী (১৯২৪), তর্পণ (১৯২৫), চন্দ্রধর (১৯২৯), কুশধ্বজ (১৯৩০), রূপসাধনা (১৯৩৬), রামকৃষ্ণ (১৯৩৬), হামির(১৯৩৮), মায়ের দেশ (১৯৩৮), পূর্ণিমা মিলন (১৯৩৮), কবি কালিদাস (১৯৪০), মুচির ছেলে (১৯৪২) প্রভৃতি।



