অমিত চৌধুরী, তারকেশ্বর: হরিপালের জেজুর গ্রামের ঘোষবাড়িতে এক সময় ছিল স্বাধীনতা সংগ্রামীদের আনাগোনা। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম ব্যক্তিত্ব, ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের নেতা, লোকসভার প্রাক্তন সদস্য অতুল্য ঘোষের বাড়ি এটি। প্রায় ৫০০ বছর পুরনো এই বাড়ির পুজোয় বোধনের ঘরে মহিলাদের প্রবেশ নিষেধ। লোকমুখে ওই ঘর ‘ব্রহ্মদৈত্যের ঘর’ নামে পরিচিত। এই বাড়িকে ঘিরে রয়েছে বহু ঘটনা।
পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, এই বাড়ির পুজোর সূচনা হয়েছিল পুরন্দর ঘোষের হাত ধরে। এখানে একচালার দেবীমূর্তির সঙ্গে থাকে জয়া ও বিজয়া। পুরনো প্রথা মেনে আজও শেওড়াফুলি থেকে গঙ্গাজল নিয়ে আসা হয় পুজোর জন্য। পরিবারের সদস্য সন্দীপ ঘোষ বলেন, বর্তমানে এই পুজো পরিচালনা করেন জ্যেষ্ঠকর্তা জনার্দন ঘোষ। আমাদের দেবী জাগ্রত। এই দেবীকে নিয়ে রয়েছে বহু ঘটনা। জমিদারি আমলে ডাকাতদের দাপট ছিল এলাকায়। তবে বাড়িতে ঢোকার সাহস হতো না কারও। সেই সময় সিঙ্গুরের সাত্যকি ডাকাতের আতঙ্কে দিন কাটাতেন সকলে। ইংরেজ পুলিশ তাকে ধরার সাহস পর্যন্ত পেত না। মায়ের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে সাত্যকি এই বাড়িতে ডাকাতি করার ঔদ্ধত্য দেখায়। শোনা যায়, জমিদারদের দেখভালের জন্য সেই সময় এক অবিবাহিত ব্রাহ্মণ কাজ করতেন এই বাড়িতে। দুর্গা দালানের পাশের ঘরেই থাকতেন তিনি। রাতে বাবুরা তামাক সেবন করে দাবা বা পাশা খেলছিলেন। সেই সময় সাত্যকি ডাকাত অতর্কিত হামলা চালালে প্রাণ যায় ওই পরিচারক ব্রাহ্মণ সন্তানের। তাঁর আর্ত চিৎকারে সতর্ক হয়ে যান জমিদার বাড়ির লেঠেল বাহিনী। পালাতে গিয়ে পাশের পুকুরে আটকে পড়ে সাত্যকির পা। ওই অবস্থায় লেঠেল বাহিনীর হাতে প্রাণ যায় ডাকাত সর্দারের।
সন্দীপবাবু বলেন, ওই ঘটনার পর থেকেই ব্রাহ্মণ পরিচারক ‘ব্রহ্মদৈত্য’ রূপে এখানে আছেন বলে জনশ্রুতি। দুর্গা দালানের সামনের একটি ঘরে আমি দুই কন্যা সন্তানকে নিয়ে থাকতাম। বছর ২০ আগে এক গভীর রাতে আমি নিজে খড়মের আওয়াজ আর ছায়া মূর্তি দেখেছি। শুধু আমার চোখের ভুল নয়, আমার স্ত্রীও একই ঘটনার সাক্ষী। ওই ঘরে আজও মহিলাদের প্রবেশ নিষেধ। তবে ওই ঘরেই ষষ্ঠীতে হয় দেবীর বোধন হয়। পরিবারের গৃহলক্ষ্মীকে মাথায় করে দুর্গা দালানে নিয়ে যাওয়া হয়। পুজোর পর একইভাবে ফেরানো হয় বাড়িতে।
সন্ধিপুজো ও নবমীতে বলি হয়। সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী— তিনদিনই কুমারী পুজো হয় ঘোষবাড়িতে। রঘুনাথ জিউ মন্দিরে নিত্য পুজো হয়। পরিবারের মহিলারা সারিবদ্ধভাবে বরণ করেন দেবীকে। স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত জেজুর। ঘোষবাড়ির এই পুজো দেখতে প্রতি বছর ভিড় করেন বহু মানুষ।