


পিনাকী ধোলে, খয়রাশোল: ১৯৮৭ থেকে ২০১৬— দীর্ঘ উনত্রিশ বছরের বিধায়ক। অথচ আজও বাজার যান থলি হাতে। আজও নিজের হাতে জমিতে চাষ করেন। পরণে সাদা চেক শার্ট আর মুখে অমলিন হাসি— এই হলেন বিজয় বাগদি। দুবরাজপুরের রাজনৈতিক ইতিহাসে যাঁর দাপট প্রায় তিন দশক ধরে অক্ষুণ্ণ ছিল। ২০১১ সালে রাজ্যে যখন বাম দুর্গের পতন ঘটছে, উত্তাল দখিনা পবনে একের পর এক লাল দুর্গ ধসে পড়ছে, তখনও নিজের গড়ে অবিচল ছিলেন এই ঋজু মানুষটি। সেই বিজয়ের কলজে এখন কাঁপছে! না, প্রতিপক্ষের হুঙ্কারে নয়, তাঁর দুশ্চিন্তা এখন দেওয়ালে ওই ‘সিংহ’ প্রতীকটাকে নিয়ে। দুবরাজপুরের যখন তৃণমূল-বিজেপির দেওয়াল লেখার ধুম, তখন ফরওয়ার্ড ব্লকের দেওয়ালগুলো খাঁ খাঁ করছে। প্রশ্ন একটাই— সিংহ আঁকবে কে?
দুবরাজপুরের রাজনৈতিক মানচিত্রে বিজয় বাগদি এক ব্যতিক্রমী চরিত্র। সাদাসিধে জীবনযাপন আর স্বচ্ছ ভাবমূর্তির এই মানুষটিকে আলাদা করে ভোটের মুখে জনসংযোগ করতে হয় না। সকাল-সন্ধ্যা চায়ের দোকানে আড্ডাই তাঁর জনসংযোগ। বিজয়বাবুর এবারের লড়াইটা কেবল নির্বাচন নয়, এক অর্থে ‘অস্তিত্ব’ আর ‘বদলা’-রও। কারণ, তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী তৃণমূলের নরেশ বাউড়ি— যাঁর কাছে ২০১৬ সালে দীর্ঘ উনত্রিশ বছরের বিধায়ক পদ খুইয়েছিলেন। সেই হারের পর থেকেই বীরভূমের এই এলাকায় বামেদের রক্তক্ষরণ শুরু হয়। ২০২১ সালে তো দুবরাজপুর চলে গিয়েছিল বিজেপির দখলে। তাই নরেশের পাশাপাশি বিজয়বাবুর প্রতিদ্বন্দ্বী বিদায়ী বিধায়ক তথা বিজেপি প্রার্থী অনুপ সাহাও। এবার সেই হারানো জমি আর পুরনো সম্মান পুনরুদ্ধারের মরণপণ লড়াইয়ে নেমেছেন বিজয়বাবু।
সোমবার খয়রাশোল পার্টি অফিসে বসে নিভৃতে কর্মীদের চাঙ্গা করার কাজ সারছিলেন তিনি। বুথে বুথে যেখানে কর্মীরা অন্য শিবিরে চলে গিয়েছেন, তাঁদের ফের বামপন্থায় ফেরানোর নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে সেই দেওয়াল লিখন। বিজয়বাবুর আক্ষেপ, তৃণমূলের ‘জোড়া ফুল’ বা বিজেপির ‘পদ্ম’ আঁকা অনেক সহজ। কিন্তু ফরওয়ার্ড ব্লকের প্রতীক যে সে আঁকতে পারে না। দলীয় পতাকায় থাকা ঝাঁপিয়ে পড়া বাঘ আর নির্বাচনী প্রতীক বীরবিক্রমী সিংহ— এই দুই রাজকীয় পশুর অবয়ব নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলতে দরকার পেশাদার শিল্পী। বিজয়বাবু আক্ষেপের সুরে বলছিলেন, ‘আগে ভীমগড়ের তপন বাগদি আমাদের দেওয়াল লিখত। দিনে ২০টা করে সিংহ নামিয়ে দিত অনায়াসে। কিন্তু তপন মারা যাওয়ার পর থেকেই আমার চিন্তা বেড়েছে।’ জানা গিয়েছে, একজন শিল্পীর সঙ্গে কথা হলেও তিনি দিনে আড়াই-তিন হাজার টাকা পারিশ্রমিক চাইছেন, অথচ ক’টা সিংহ আঁকতে পারবেন তার নিশ্চয়তা দিতে পারছেন না। অগত্যা বিজয়বাবু ভাবছেন, শিল্পী না মিললে এবার হয়তো দলের প্রতীক আঁকতে নিজেকেই তুলি ধরতে হবে।
গত দশ বছরে যেভাবে বামেদের ভোট কমেছে দুবরাজপুরে, সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে বিজয়বাবুর এবারের লড়াই অত্যন্ত কঠিন। কিন্তু তিনি আস্থা রেখেছেন তাঁর দীর্ঘদিনের মানুষের সঙ্গে থাকার অভ্যাসের উপর। পেনশনের সামান্য টাকায় চলা এই মানুষটির প্রধান শক্তি তাঁর সততা। ক্ষমতা হারিয়েও তিনি মেরুদণ্ড বিকিয়ে ফেলেননি। তবে তাঁকে একচুলও জমি ছাড়তে নারাজ তৃণমূলের নরেশ কিংবা বিজেপির অনুপ। জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী তাঁরাও।