


গর্গ চট্টোপাধ্যায়: হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচ ডি শেষ করলাম ২০১১ সালে। সেইসময় ভারতে পরপর আইসার খোলা হচ্ছে। ২০১৪তে এমআইটি (ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি) থেকে পোস্ট ডক্টরেট করে দেশে ফিরলাম। আইএসআইতে (ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউট) চাকরি নিলাম। সেখানে মস্তিষ্ক ও মস্তিষ্ক প্রক্রিয়ার বিষয়ে আলাদা ফান্ড তৈরি হল। অদ্ভুত বিষয়, কয়েকবছরের মধ্যে ওই বিষয়টাই বাতিল হয়ে গেল। নতুন একখানা জিনিস এল তার নাম ‘সত্যম’। অর্থাত্ বিজ্ঞান-প্রযুক্তিতে যোগ ও মনঃসংযোগের ভূমিকা। নিজের মতো কাজ শুরু হল। আসলে মুক্তচিন্তা ও বিজ্ঞান-বিরোধী আদর্শ আধিপত্য লাভ করলে এরকম হয়। যেমন, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘দেশদ্রোহী’ বলছে। আমরা কিছু আলোকপ্রাপ্ত এলাকা তৈরি করার চেষ্টা করেছি। তার আলোকে জেনেছি, বিজেপি কেন বাংলা ও বাঙালি বিরোধী?
বাঙালি জাতিগতভাবে বিজেপি বিরোধী। একটা জাতির শক্তি নির্ভর করে সংখ্যার উপর। সেই সংখ্যায় আক্রমণ করা বিজেপির উদ্দেশ্য। অসমে ১৯ লক্ষ বাঙালির নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। এরাজ্যে বাদ দেওয়া হয়েছে প্রায় আধ কোটি বাঙালির নাম। প্রথম প্রচেষ্টা হল, বাংলার রাজনৈতিক ভবিষ্যত্ বাঙালিকে নির্ধারণ না করতে দেওয়া। এরাজ্যে ৮৬ শতাংশ বাঙালির মধ্যে যে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে, সরকার তারা গড়বে। এবারের নীল নকশা হল, বিজেপি বিরোধী বাঙালিদের নাম বাদ দিয়ে বিজেপিপন্থী সংখ্যালঘু বাঙালি ও বহিরাগতদের মিশ্রণে একটি দিল্লি নিয়ন্ত্রিত সরকার তৈরি করা। এমনকি, মুখ্যমন্ত্রী কে হবেন, সেটাও যেন নির্বাচনে ঠিক না-হয়। আর একটি বিষয় হল, অর্থনৈতিক অবরোধ।
বাংলায় যারা এতদিন ক্ষমতায় থেকেছে কংগ্রেস, সিপিএম কিংবা তৃণমূল, তারা সকলে ধোয়া তুলসীপাতা নয়। তবে ওরা কেউ বাংলার বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক লুট করেনি। উদাহরণ, বাংলার ব্যাংক এলাহাবাদ ব্যাংক, ইউনাইটেড ব্যাংক অব ইন্ডিয়া তুলে দেওয়া হল। অর্ডিন্যান্স ফ্যাক্টরির সদর দপ্তর ছিল ধর্মতলায়। অজস্র উদাহরণ রয়েছে। এটাকে বলে ‘অ্যাসেট স্ট্রিপিং’।
উলটো দিকে, বাংলায় কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকারের পদচিহ্ন বাড়ছে। যেমন, জিএসটি দপ্তর ও কেন্দ্রীয় আধাসামরিক বাহিনীর বেস। এদিকে, ১০০ দিনের টাকা, আবাসের টাকা দিচ্ছে না। ওদের অজুহাত, তৃণমূল টাকা মেরে দেবে। কিন্তু টাকা তোলা হচ্ছে বাংলা-বাঙালির কাছ থেকে। সেই টাকা চলে যাচ্ছে উত্তরপ্রদেশ-বিহারের হাতে। তাহলে টাকা তুলো না। বাংলা বঞ্চিত নয়। লুণ্ঠিত। পরজীবী রাজ্য থেকে লোকেরা এসে আমাদের অর্থনীতি নিয়ে জ্ঞান দিচ্ছে। এই লজ্জা বাঙালির। শুধু অর্থনৈতিক নয়। বাংলার সঙ্গে বিহার-উত্তরপ্রদেশের পার্থক্য গড়েছে নবজাগরণ। বিজেপি সাংস্কৃতিক পরিবর্তন করতে চায়। এখানে যুক্তি, সত্য, অধিকারের সাম্য, মুক্তচিন্তার ভিত্তি—হিন্দি সাম্রাজ্যবাদী বিজেপির শত্রু। বাঙালির ধর্মাচরণও আক্রমণের মুখে। বাসন্তীপুজোর নবমীতে বাঙালি কখনো ভেবেছে—ডিজে বাজিয়ে, অস্ত্র নিয়ে রাস্তায় বেরোতে হবে? বাংলার চিরাচরিত দেবদেবীর মন্দির কি উত্তরপ্রদেশ-বিহারে তৈরি হচ্ছে? আমাদের খাদ্যাভ্যাসেও আক্রমণ নেমে আসছে। প্রধানমন্ত্রী বলছেন, যাঁরা চৈত্র মাসে মাছ খায় তাঁরা মোগল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, সুজন চক্রবর্তী, শুভঙ্কর সরকাররা ক্যামেরা ডেকে মাছ খান না। তার উপর বিজেপি পশ্চিমবঙ্গ ভাগ করতে চায়। বাংলার স্বাভাবিক রাজনৈতিক পরিসর ফিরিয়ে আনতে হবে। ময়দান থেকে সরাতে হবে হিন্দি সাম্রাজ্যবাদী বিজেপিকে। যতদিন সিপিএমের প্রাক্তন ভোটাররা বিজেপিকে ভোট দেবেন ততদিন তৃণমূল অপরাজেয়। বাংলার ভোট প্রতিবার বাংলা ও বাঙালির অস্তিত্বের ভোটে পরিণত হচ্ছে। তাই বিজেপির বিরুদ্ধে জোটবদ্ধতা প্রতিফলিত হচ্ছে। বাংলার দৈনন্দিন ইস্যু, প্রতিযোগিতামূলক বয়ান, যা হওয়ার কথা, তা হচ্ছে না। তাই তৃণমূল ও বামফ্রন্টের শক্তি বাড়াতে হবে।
বাঙালিও এবার পশ্চিমবঙ্গের নাগরিকের তালিকা বানাবে। সেখানে প্রথম ৫০ লক্ষ হবে ওই বাদ যাওয়া নাম। তাঁরাই হবেন প্রথম নাগরিক। আমাদের কেন নাম আছে জানি না। আমরা ওই বাদ যাওয়া মানুষগুলোর জন্যই এবার ভোট দেব।