‘সুজলাং সুফলাং মলয়জশীতলাম্ শস্যশ্যামলাং মাতরম, বন্দে মাতরম।’ সিপাহী বিদ্রোহের পর ২০ বছরও কাটেনি। জাতীয়তাবাদী ধারণা তৈরি হতে তখনও অনেক বাকি। জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠারও ন’বছর আগে এই গান নাড়িয়ে দিয়েছিল জাতির বিবেক। ‘বন্দে মাতরম’ শুনে এখনও চোখ চিকচিক করে ওঠে ১৩০ কোটি মানুষের। সেই গান রচিত হয়েছিল চুঁচুড়ার জোড়াঘাটে ‘বন্দেমাতরম’ ভবনে। সেই গৌরব নিয়ে আজও দাঁড়িয়ে রয়েছে এই ইমারত। এই বাড়ির সঙ্গে সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্রের যোগ কীভাবে ঘটল, তা জানতে ফিরে যেতে হবে দেড়শো বছর আগে। ১৮৭৬ সালের ২০ মার্চ বঙ্কিমচন্দ্র হুগলি জেলার ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট পদে যোগদান করেন। নৈহাটির কাঁঠালপাড়া গ্রামের পৈত্রিক বাড়ি থেকে হুগলিতে যাতায়াতে বিশেষ অসুবিধা হচ্ছিল না তাঁর। কারণ, নৌকায় ভাগীরথী পার করে হুগলি এক ঘণ্টারও পথ নয়। তবু নৈহাটির পাট চুকিয়ে সপরিবারে হুগলি চলে আসেন তিনি। চুঁচুড়ার জোড়াঘাটে মালিক কাশেমের প্রাসাদের উত্তর দিকের একটি অংশ ভাড়া নিয়ে বসবাস শুরু করেন তিনি। জানা যায়, জোড়াঘাটের এই বাড়িতে বঙ্কিমচন্দ্র প্রায় পাঁচ বছর ছিলেন। আর এই ক’বছরে সাহিত্যের মহীরুহ হয়ে ওঠেন তিনি। বন্দেমাতম্ গানের পাশাপাশি এই সময়ের মধ্যেই প্রকাশিত হয়, রজনী (১৮৭৭), উপকথা (ইন্দিরা, যুগলাঙ্গুরীয় ও রাধারানী একত্রে) (১৮৭৭), কবিতা পুস্তক (১৮৭৮), কৃষ্ণকান্তের উইল (১৮৭৯), সাম্য (১৮৭৯)-র মতো গ্রন্থ। হুগলিতে চলে আসার পর আরও একটি কাজ হয়। বন্ধ হয়ে যাওয়া ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকা আবার চালু হয়। আর সেই বঙ্গদর্শনে ‘কমলাকান্তের পত্রাবলী’, ‘রাজসিংহ’, ‘মুচিরাম গুড়ের জীবনচরিত’, ‘কমলাকান্তের জবানবন্দি’, ‘আনন্দমঠ’ প্রভৃতি উপন্যাসগুলি একে একে প্রকাশিত হয়। ১৮৮০ সালের ১৫ জুলাই চুঁচুড়া থেকে নবীনচন্দ্র সেনকে লেখা চিঠি থেকে জানা যায়, এই বাড়িতে বসেই তিনি রচনা করেছিলেন আনন্দমঠ এবং ভারতবর্ষের ইতিহাস। ‘আনন্দমঠ’ বঙ্গদর্শনে প্রকাশিত হওয়ার ঠিক আগে বঙ্কিমচন্দ্র হুগলি ছেড়ে হাবড়া চলে যান। তবে বঙ্কিমের চুঁচুড়াবাসকে স্মরণীয় করে রেখেছে স্থানীয় মানুষজন। যে বাড়িতে বসে বন্দেমাতরম্ গানটি রচনা করেছিলেন, সেই বাড়িটি আজ সাধারণ মানুষের কাছে ‘বন্দেমাতরমভবন’ নামে পরিচিত।



