অনিমেষ মণ্ডল, কাটোয়া: ‘বিশ্বসাথে যোগে যেথায় বিহারো, সেইখানে যোগ তোমার সাথে আমারো।- গুরুদেবের বিশ্বশান্তি, বিশ্বমানবতার চেতনায় উদ্বুদ্ধ ওঁরা। আর সেই চেতনাকে পাথেয় করেই দুই ব্রিটিশ বৃদ্ধ ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছেন বিশ্বসফরে। একজন রবার্ট। বয়স প্রায় ৬৫ বছর। অন্যজন বাহাত্তর বছরের জন। সম্পর্কে তাঁরা বন্ধু। দু’জনের সঙ্গী কেবল দু’টি বেন্টলি ট্যুরার। বিশ্বের গাড়িশিল্পের ইতিহাসে এখনও ‘জীবন্ত কিংবদন্তী’। সেই দু’টি ট্যুরারে ইতিমধ্যেই চারটি মহাদেশ চষে ফেলেছেন। ফ্রেব্রুয়ারি মাস নাগাদ ট্যুরার দু’টি নিয়ে ভিড়েছিলেন মুম্বই বন্দরে। ঘুরে বেড়াচ্ছেন গোটা ভারত। কবিগুরুর ভাবধারার সঙ্গে নিবিড় যোগসূত্র স্থাপনে এসেছেন বাংলায়। ছুঁয়ে যাবেন শান্তিনিকেতন। তার আগে, পূর্ব বর্ধমানের গুসকরায় বিশ্বকবিকে স্মরণ করে দিয়ে গেলেন বিশ্বশান্তির বার্তা।
রবিবারের সন্ধ্যা। গুসকরা শহর আর পাঁচটা দিনের মতোই চায়ের আড্ডায়, নানা ব্যস্ততায় মুখর ছিল। হঠাৎ রাস্তায় ১৯২৬ সালের দু’দু’টি বেন্টলি ট্যুরার! ঔপনিবেশিক শাসনে ব্রিটিশ প্রশানের অনেক রথী-মহারথীরা এমন গাড়ি চড়ে ঘুরে বেড়াতেন। স্বাধীনতার আশি বছর পরও রাস্তায় বেন্টলি ট্যুরার! দু’টি গাড়িতে আবার দুই ‘সাহেব’! মুহূর্তেই তাল কাটে গুসকরা শহরের স্বাভাবিক ছন্দে। রবার্ট ও জনকে ঘিরে জমতে থাকে কৌতূহলী মানুষের ভিড়। কেউ কেউ গাড়ি দু’টি ছুঁয়েও দেখেন।
রবার্ট ৬.৫ লিটার বেন্টলি চালাচ্ছেন। পনেরো বছর আগে কিনেছিলেন। ৬ লিটারের বেন্টলি চালাচ্ছেন জন। দু’জনেই লণ্ডনের বাসিন্দা। দু’জনেই বাল্যবন্ধু। ছেলেবেলা থেকেই দু’জনেই ভিন্টেজ গাড়ি নিয়ে বিশ্বভ্রমণ করার। মুখে থাকবে বিশ্বশান্তির বার্তা। শৈশবের সেই স্বপ্নপূরণ করছেন জীবনের দোড়গোড়ায় এসে। দু’টি গাড়ি জাহাজে করে বিভিন্ন দেশে পাঠিয়ে দিচ্ছেন। তারপর বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থান ঘুরে দেখছেন। গুসকরা শহরে একটি পেট্রল পাম্পে এসেছিলেন জ্বালানি ভরতে। সেখানেই রবার্ট বলেন, ‘ভিন্টেজ গাড়ির প্রতি আমাদের দুই বন্ধুরই গভীর ভালোবাসা। এটাই আমাদের মূল চালিকাশক্তি। আমার কাছে ১০০ বছরের পুরনো একটি বেন্টলি রয়েছে। আমি এটি ১৫ বছর আগে কিনেছিলাম। গাড়ি দু’টি নিয়ে উত্তর আমেরিকাজুড়ে ভ্রমণ করেছি। দক্ষিণ আমেরিকায় আমরা ইকুয়েডর, চিলি এবং বলিভিয়ার মধ্য দিয়ে গিয়েছি। এই দু’টি গাড়িতে অস্ট্রেলিয়া সফরও সেরে ফেলেছি। আমাদের সর্বশেষ অভিযানটি মুম্বাই থেকে শুরু হয়েছিল। সেখান থেকে গোয়া ও কর্ণাটকের মধ্য দিয়ে গাড়ি চালিয়ে আমরা ওয়েনাড়ে পৌঁছই।’ জন বলছিলেন, ‘এখন আমরা কবিগুরুর দেশে এসেছি। যিনি বিশ্ব মানবতা ও বিশ্বশান্তির বার্তা দিয়ে গিয়েছেন। আমরা চাই শান্তিনিকেতনের মাটিতে আমাদের গাড়ির চাকা স্পর্শ করুক। কবিগুরুও ভিন্টেজ গাড়িতে চড়তেন। আশেপাশের বিভিন্ন জায়গা ঘুরে দেখছি। ভালো লাগছে ভারত ভ্রমণ। ভারত সফরে আমরা পথপ্রদর্শক হিসেবে সঙ্গে নিয়েছি মুম্বইয়ের ড্যানিয়েলকে। দু’টি ভিন্টেজ গাড়ি নিয়ে আমরা মেলাতে চাই গোটা বিশ্বকে।’ জীবন উপান্তে এসে রবার্ট-জনের স্বপ্ন—সেই মিলন হোক সৌভ্রাতৃত্বের। শতবর্ষীয় গাড়ি দু’টি নিয়ে দেশ ভ্রমণে বেড়িয়ে গুসকরা শহরে দুই ব্রিটিশ বন্ধু।-নিজস্ব চিত্র