


দুবাই: গ্রুপ পর্বে তিনে তিন। সুপার ফোরেও তাই। অর্থাৎ, মরুভূমির দেশে এশিয়া কাপে মোট ছ’টা ম্যাচেই জিতেছে ভারত। সূর্যকুমার যাদব ব্রিগেডকে দেখাচ্ছে অশ্বমেধের ঘোড়ার মতোই অপ্রতিদ্বন্দ্বী। আর এখানেই লুকিয়ে থাকছে অস্বস্তি। নেতা হিসেবে ‘স্কাই’ যতটা ঝকঝকে, যতটা উজ্জ্বল, ব্যাটসম্যান হিসেবে তা নন। সেজন্যই উঠছে প্রশ্ন। ক্যাপ্টেন সূর্য কি আদতে চাপে ফেলছেন ব্যাটার সূর্যকে?
এই আসরে পাঁচ ইনিংসে ৭১ রান করেছেন তিনি। তার মধ্যে গ্রুপে সংযুক্ত আরব আমিরশাহি ও পাকিস্তান ম্যাচে তিনি যথাক্রমে ৭ ও ৪৭ রানে নট আউট ছিলেন। এই দুটো ইনিংস বাদ দিলে সুপার ফোরে পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে তাঁর রান যথাক্রমে ০, ৫ ও ১২। স্ট্রাইক রেটও একেবারে সাদামাটা, মাত্র ১০৭.৫৭। যা তাঁর ক্ষেত্রে ভাবাই যায় না। শুধু তাই নয়, ২০২৫ সালে সার্বিকভাবেই মাঝারিয়ানার গণ্ডিতে আটকে সূর্য। ১০ ইনিংসে ৯০ বলে সংগ্রহ ৯৯। স্ট্রাইক রেট ১১০। আর এই দশ ইনিংসে চার-ছক্কা মেরেওছেন কম। রয়েছে মাত্র দশটা চার ও তিনটি ছক্কা। বাউন্ডারি হাঁকানোর সংখ্যা কমলেও বেড়েছে ডটবল। অর্থাৎ, যে বলে কোনও রান করতে পারেন না ব্যাটসম্যান। এই বছরে প্রতি ইনিংসে গড়ে খান পাঁচেক ডটবল রয়েছে তাঁর। একেবারেই সূর্য-সুলভ নয় যা।
অথচ, ‘৩৬০ ডিগ্রি’ ব্যাটার দলের বড় ভরসা। দেশের হয়ে এই ফরম্যাটে ৮৪ ইনিংসে ৩৭.৫৯ গড়ে ২৬৬৯ রান রয়েছে তাঁর। স্ট্রাইক রেট ঈর্ষণীয়, ১৬৪.৬৫। কিন্তু সেই প্রতাপ উধাও থেকেছে এশিয়া কাপে। এর একটা বড় কারণ অবশ্যই বোলারদের তাঁকে ক্রমাগত ফুল লেংথে বল রাখা। শর্টপিচ ডেলিভারি আর তাঁকে কোনও বোলারই করেন না। ওয়াইড ইয়র্কারই তাঁকে করা হচ্ছে বেশিরভাগ সময়। কমানো হচ্ছে বলের গতিও। থার্ডম্যান, ওয়াইড একস্ট্রা কভার আর মিড-অফ রেখে অফস্টাম্পের বাইরে দূরে দূরে রাখা হচ্ছে ডেলিভারি। আর এতেই আটকে যাচ্ছেন সূর্য।
পাকিস্তানকে দু’বার কান মুলে হারানোর পর রবিবার ভারতকে নিয়েও থাকছে হাল্কা উদ্বেগ। যতই ফেভারিট হোক, শ্রীলঙ্কা ম্যাচ দেখিয়ে দিয়েছে যে ভারতকেও চাপে ফেলা যায়। টিম ইন্ডিয়া অবশ্য প্রবল প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও মাথা ঠান্ডা রেখেছে। সুপার ওভারে জয়ে সেটাই প্রতিফলিত। কিন্তু ব্যাটিংয়ে অভিষেক শর্মা আর বোলিংয়ে কুলদীপ যাদব ছাড়া ধারাবাহিকতার অভাবে ভুগছেন বাকিরা। ৫১.৫০ গড় ও ২০৪ স্ট্রাইক রেটের অভিষেক যদি ফাইনালে ঝড় তুলতে না পারেন, তাহলে কী হবে? চিন্তা থাকছেই। একইভাবে ১৩ উইকেট নেওয়া কুলদীপ আঘাত হানতে না পারলে বরুণ চক্রবর্তী-অক্ষর প্যাটেলরা কতটা এগিয়ে আসবেন, সংশয় থাকছে।
এমনিতেও এই ম্যাচ এখন আরও বেশি করে মর্যাদার লড়াইয়ে পরিণত। পাক অধিনায়ক সলমন আগার সঙ্গে সূর্যর হাত না মেলানোর ইস্যু উত্তাপ বাড়িয়েছে দ্বৈরথের। তার উপর গ্রুপের ম্যাচে পাক-বধের পর ভারত ক্যাপ্টেনের গলায় পহেলগাঁওয়ে জঙ্গি হানা, অপারেশন সিন্দুরের কথা শোনা গিয়েছে। ক্রিকেটের সঙ্গে রাজনীতিতে মেশানোর অভিযোগ উঠেছে পাকিস্তানের তরফে। এখন শুরু হয়েছে চর্চা, ভারত যদি এশিয়া কাপে চ্যাম্পিয়ন হয়, তাহলে কি এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের চেয়ারম্যান মহসিন নাকভি’র হাত থেকে ট্রফি নেবেন সূর্য? উল্লেখ্য, নাকভি হলেন পাকিস্তানের মন্ত্রীও। একইসঙ্গে তিনি পিসিবি’র প্রধান। ভারতীয় দল ঠিক করেছে, পাক ক্রিকেটারদের সঙ্গে ‘হ্যান্ডশেক’ করা হবে না। তাই পিসিবি প্রধানের ক্ষেত্রেও একই নীতি বজায় রাখার কথা। কিন্তু সেক্ষেত্রে ট্রফি নেওয়া নিয়েও তৈরি হবে বিতর্ক। সব মিলিয়ে বিতর্কের মশলা মজুদই থাকছে মরুশহরে।
দাঁড়িপাল্লায় ভারত-পাক ফাইনাল
পাঁচ খেতাবি খতিয়ান
পাঁচ বা তার বেশি দলকে নিয়ে আয়োজিত সীমিত ওভারের প্রতিযোগিতায় ভারত ও পাকিস্তান ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছে মোট পাঁচবার। পাকিস্তান জিতেছে তিনবার। ভারত জয়ী দু’বার। রবিবার ৩-৩ করার হাতছানি টিম ইন্ডিয়ার সামনে। সংক্ষেপে তুলে ধরা হল সেই পাঁচ খেতাবি লড়াই
ভারতের শক্তি
দুরন্ত ফর্মে অভিষেক শর্মা
আট নম্বর পর্যন্ত ব্যাটসম্যান
নতুন বলে বুমরাহর ঝাঁঝ
দুই মিস্ট্রি স্পিনার কুলদীপ ও বরুণের ভেল্কি
ভারতের দুর্বলতা
সূর্য-শুভমানের ধারাবাহিকতার অভাব
ক্যাচ ফেলার প্রবণতা
পঞ্চম বোলার নিয়ে উদ্বেগ
পাকিস্তানের শক্তি
ফখর জামানের অভিজ্ঞতা
ব্যাটে-বলে ফর্মে শাহিন আফ্রিদি
আবরার, সাইমের স্পিন বোলিং
পাকিস্তানের দুর্বলতা
অধিনায়ক সলমন আগার অনিভজ্ঞতা
ভঙ্গুর মিডল অর্ডার
ভারতকে দেখলেই তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়া
মেলবোর্নে বেনসন অ্যান্ড হেজেস কাপ
(১৯৮৫ সালের ১০ মার্চ)
টস জিতে প্রথমে ব্যাট করে ৫০ ওভারে পাকিস্তান ৯ উইকেটে তোলে ১৭৬। সর্বাধিক ৪৮ অধিনায়ক জাভেদ মিয়াঁদাদের। কপিল দেব ও লক্ষ্মণ শিবরামকৃষ্ণান তিনটি করে উইকেট নেন। জবাবে দুই উইকেট হারিয়ে ১৭৭ রানের টার্গেটে পৌঁছায় ভারত। কৃষ্ণমাচারি শ্রীকান্ত ৭৭ বলে করেন ৬৭। সঙ্গী ওপেনার রবি শাস্ত্রী অপরাজিত থাকেন ৬৩ রানে। অধিনায়ক সুনীল গাভাসকরের হাতে ওঠে
কাপ।
শারজায় অস্ট্রেলেশিয়া
কাপ
(১৯৮৬ সালের ১৮ এপ্রিল)
টস হেরে ব্যাট করতে নেমে ৭ উইকেটে ২৪৫ তুলেছিল কপিল দেবের টিম। সর্বাধিক ৯২ করেন গাভাসকর। এছাড়া হাফ-সেঞ্চুরি পান কৃষ্ণমাচারি শ্রীকান্ত (৭৫) ও দিলীপ বেঙ্গসরকর (৫০)। পাকিস্তানের হয়ে ওয়াসিম আক্রাম ৩টি ও ইমরান ২টি উইকেট নেন। ২৪৬ রানের টার্গেট তাড়া করে শেষ বলে পাকিস্তানের দরকার ছিল চার রান। চেতন শর্মার নীচু ফুলটসে ছক্কা মারেন জাভেদ মিয়াঁদাদ (অপরাজিত ১১৬)। ১ উইকেটে হেরে স্বপ্নভঙ্গ হয় কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারিকার।
শারজায় অস্ট্রেলেশিয়া কাপ
(১৯৯৪ সালের ২২ এপ্রিল)
প্রথমে ব্যাট করে পাকিস্তান ৬ উইকেটে তোলে ২৫০। আমির সোহেল (৬৯) ও বাসিত আলি (৫৭)হাফ-সেঞ্চুরি করেন। ভারতের হয়ে তিনটি করে উইকেট নেন জাভাগল শ্রীনাথ এবং রাজেশ চৌহান। ২৫১ রানের টার্গেট তাড়া করতে নেমে শচীন তেন্ডুলকর (২৪) ফিরতেই চাপে পড়ে যায় টিম ইন্ডিয়া। বিনোদ কাম্বলি (৫৪), অতুল বেদাদে (৪৪), নভজ্যোৎ সিং সিধু (৩৬) লড়লেও তা যথেষ্ট ছিল না। ৩৯ রানে জেতে পাকিস্তান।
জোহানেসবার্গে টি-২০ বিশ্বকাপ
(২০০৭ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর)
কুড়ি ওভারের ফরম্যাটে এটা ছিল প্রথম বিশ্বকাপ। ফাইনালে টস জিতে প্রথমে ব্যাট করে মহেন্দ্র সিং ধোনির দল। ৫ উইকেটে ভারত তোলে ১৫৭। ওপেনার গৌতম গম্ভীরের ব্যাটে আসে সর্বাধিক ৭৫। পাকিস্তানের সফলতম বোলার উমর গুল তিন উইকেট নেন। জবাবে ১৯.৩ ওভারে ১৫২ রানে থামে শোয়েব মালিক বাহিনী। শেষ ৪ বলে পাকিস্তানের দরকার ছিল ৬। যোগিন্দার শর্মাকে স্কুপ মারতে গিয়ে শর্ট ফাইন লেগে ক্যাচ তোলেন মিসবা উল হক। ৫ রানে জেতে ভারত।
লন্ডনে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি
(২০১৭ সালের ১৮ জুন)
প্রথমে ব্যাট করে পাকিস্তান নির্ধারিত ৫০ ওভারে ৪ উইকেটে তোলে ৩৩৮। বাঁ-হাতি ওপেনার ফখর জামান ১০৬ বলে করেন ১১৪। আজহার আলি (৫৯), মহম্মদ হাফিজও (৫৭) হাফ-সেঞ্চুরি করেন। জবাবে ৩০.৩ ওভারে মাত্র ১৫৮ রানে দাঁড়ি পড়ে ভারতের ইনিংসে। হার্দিক পান্ডিয়া (৭৬) ছাড়া বাকি সব ব্যাটম্যানই ব্যর্থ। পাকিস্তানের হয়ে মহম্মদ আমের, হাসান আলি তিনটি করে উইকেট নেন। ১৮০ রানে জেতে পাকিস্তান।
পাঁচ বা তার বেশি দলকে নিয়ে আয়োজিত সীমিত ওভারের প্রতিযোগিতায় ভারত ও পাকিস্তান ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছে মোট পাঁচবার। পাকিস্তান জিতেছে তিনবার। ভারত জয়ী দু’বার। রবিবার ৩-৩ করার হাতছানি টিম ইন্ডিয়ার সামনে। সংক্ষেপে তুলে ধরা হল সেই পাঁচ খেতাবি লড়াই
ভারতীয় সময়ে ফাইনাল শুরু রাত ৮টায়।
সরাসরি সম্প্রচার সোনি স্পোর্টস চ্যানেলে।