


অগ্নিভ ভৌমিক, কৃষ্ণনগর: অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসই কি কাল হল! কৃষ্ণনগর দক্ষিণ বিধানসভায় উধাও ‘উজ্জ্বল-ম্যাজিক’। টানা তিনবার জিতে মন্ত্রিত্ব সামলানো উজ্জ্বল বিশ্বাস এবার বিধানসভা ভোটে বড় ধাক্কা খেয়েছেন। বিজেপি প্রার্থী সাধন ঘোষের কাছে তিনি ২৭ হাজারেরও বেশি ভোটে হেরেছেন। যা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক চর্চা শুরু হয়েছে।
২০১১ সাল থেকে টানা কৃষ্ণনগর দক্ষিণ বিধানসভা আসনের বিধায়ক ছিলেন উজ্জ্বল বিশ্বাস। দীর্ঘদিন মন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব সামলেছেন। তবে ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচন যে তাঁর কাছে কঠিন হতে চলেছে, সেই ইঙ্গিত মিলেছিল আগেই। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে এই কেন্দ্রে তৃণমূল প্রায় ১০ হাজার ভোটে পিছিয়ে পড়ার পর থেকেই পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। যদিও তৃণমূল নেতৃত্ব শেষ পর্যন্ত ভরসা রেখেছিল ‘উজ্জ্বলম্যাজিক’-এর উপরেই। অতীতে একাধিকবার এই আসন নিয়ে জল্পনা তৈরি হলেও শেষ পর্যন্ত তৃণমূল জয় ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছিল।
তৃণমূলের একাংশের দাবি, এসআইআরে এই কেন্দ্রে ২৫ হাজার ১৭৪ জন ভোটারের নাম বাদ যাওয়ার প্রভাব পড়েছে ভোটে।
ফল প্রকাশের পর কৃষ্ণনগর-১ ব্লকের পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি তথা তৃণমূল নেতা কার্তিক ঘোষ বলেন, ‘গণতন্ত্রে জনগণের রায় মেনে নিতেই হবে। বিজেপি এবার নির্বাচনে বিভাজনের রাজনীতি করেছে। আমাদের দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে বিজেপির সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাব। নির্বাচনের ফলাফল আমরা পর্যালোচনা করব।’
অন্যদিকে বিজেপি নেতা রঞ্জন অধিকারীর দাবি, ‘মন্ত্রী থাকলেও দক্ষিণ বিধানসভায় কোনো উন্নয়ন হয়নি। শুধু তৃণমূল নেতাদের উন্নয়ন হয়েছে। তোলাবাজি ও কাটমানির রাজনীতির বিরুদ্ধে মানুষ এই তৃণমূলকে উৎখাত করেছে।’
রাজনৈতিক মহলের মতে, শুধু ভোটের অঙ্ক নয়, সংগঠনের ভিতরকার দ্বন্দ্বও এই পরাজয়ের অন্যতম কারণ। বহুদিন ধরেই মন্ত্রী উজ্জ্বল বিশ্বাসের সঙ্গে কৃষ্ণনগর লোকসভার সাংসদ তথা জেলা তৃণমূল সভাপতি মহুয়া মৈত্রের দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। এমনকী উজ্জ্বল বিশ্বাসের ভোট প্রচারেও দেখা যায়নি মহুয়া মৈত্রকে। পাশাপাশি দক্ষিণ বিধানসভায় গোষ্ঠীকোন্দলও বারবার প্রকাশ্যে এসেছে।
তৃণমূলের একাংশের অভিযোগ, মন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ কয়েকজন নেতার আচরণ ও জনবিচ্ছিন্নতা দলের ক্ষতির কারণ হয়েছে। মন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ হওয়ার সুবাদে তাঁরা এলাকায় প্রভাবশালী হয়ে উঠলেও সাধারণ মানুষের সঙ্গে সংযোগ ক্রমশ কমে গিয়েছিল। ফলে বুথস্তরে সংগঠনের ভিত দুর্বল হয়েছে বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ।
কৃষ্ণনগর দক্ষিণ বিধানসভা গঠিত হয়েছে কৃষ্ণনগর-২ নম্বর ব্লকের সাতটি এবং কৃষ্ণনগর-১ নম্বর ব্লকের পাঁচটি পঞ্চায়েত নিয়ে। ফল বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, মোট ১২টি পঞ্চায়েতের মধ্যে আটটিতেই ধাক্কা খেয়েছে তৃণমূল। দলীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, কৃষ্ণনগর-১ ব্লকের দেপাড়া পঞ্চায়েতে প্রায় ৭ হাজার ভোটে পিছিয়ে পড়ে তৃণমূল। রুইপুকুর পঞ্চায়েতে ব্যবধান ছিল প্রায় ৩ হাজার ভোট। ভাতজাংলা পঞ্চায়েতে প্রায় ৫ হাজার ভোটে পরাজিত হয় ঘাসফুল শিবির। পাশাপাশি দিগনগর ও চকদিগনগর পঞ্চায়েতেও ব্যাপক ব্যবধানে পিছিয়ে পড়ে শাসকদল।
কৃষ্ণনগর-২ ব্লকেও একাধিক এলাকায় ধাক্কা খেয়েছে তৃণমূল। ধুবুলিয়া-১ পঞ্চায়েতে প্রায় ৪ হাজার ৫০০ ভোটে, এবং সাধনপাড়া-২ পঞ্চায়েতে প্রায় ৩ হাজার ভোটে পরাজিত হয়েছে তারা।
তবে কয়েকটি এলাকায় লড়াই ধরে রাখতে সক্ষম হয় তৃণমূল। নওপাড়া-১ পঞ্চায়েতে প্রায় ২ হাজার ৫৪০ ভোটে লিড পায় দল। নওপাড়া-২ পঞ্চায়েতে সেই ব্যবধান বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৫ হাজার ২০০ ভোটে।