Bartaman Logo
১৬ জুলাই, ২০২৬
বর্তমান / রাজ্য

রাজপরিবারের ঐতিহ্য নিয়েই আজও দড়িতে টান পড়ে রথতলার রথের

কৃষ্ণনগরের রথতলার ঐতিহ্য বজায় থাকলেও গোপীনাথের অনুপস্থিতি শহরের রথযাত্রাকে করেছে শূন্য। এই পরিবর্তনের কারণ ও প্রভাব জানুন।

রাজপরিবারের ঐতিহ্য নিয়েই আজও দড়িতে টান পড়ে রথতলার রথের
  • ১৬ জুলাই, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

অগ্নিভ ভৌমিক, কৃষ্ণনগর: রথের চূড়ায় একসময় পাশাপাশি বিরাজ করতেন জগন্নাথ ও অগ্রদ্বীপের গোপীনাথ। জলঙ্গীর বুকে সারি সারি নৌকা, শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি আর হাজার হাজার মানুষের জয়ধ্বনিতে মুখর হয়ে উঠত কৃষ্ণনগর। মৃৎশিল্পের এই শহরের রথযাত্রার সবচেয়ে বড় আকর্ষণই ছিল অগ্রদ্বীপ থেকে গোপীনাথের আগমন। সেই দৃশ্য আজ আর দেখা যায় না। বহু বছর ধরে কৃষ্ণনগরের রথতলার রথে আর আসেন না গোপীনাথের বিগ্রহ। রথে তাঁর জায়গা নিয়েছে একটি ছবি। তবে, কৃষ্ণনগরের রথতলার রথ কেবল একটি ধর্মীয় উৎসবের কেন্দ্র নয়, এটি শহরের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও নদীয়ার রাজপরিবারের ঐতিহ্যের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে। প্রবীণদের কথায়, একসময় এই রথ রাজবাড়ির প্রাঙ্গণেই রাখা হতো। পরে সেটিকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় সাপুড়িয়াপাড়ার কাছে। সেই থেকেই এলাকার নাম হয়ে যায় ‘রথতলা’। স্থান বদলালেও রথের মাহাত্ম্য এতটুকু কমেনি। 

Advertisement

ইতিহাস ঘাটলে জানা যায়, ঊনিশ শতকের গোড়ার দিকে নদীয়ারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের প্রপৌত্র মহারাজ গিরীশচন্দ্র এই রথযাত্রার সূচনা করেন। সেই থেকে টানা প্রায় দুই শতাব্দী ধরে এই রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। সময়ের সঙ্গে রীতিনীতি বদলেছে, বদলেছে উৎসবের আয়োজনও। কিন্তু একটি পরিবর্তন আজও শহরবাসীর মনে আক্ষেপ জাগায়—রথে আর আসেন না অগ্রদ্বীপের গোপীনাথ।
লোকমুখে প্রচলিত, অন্তত দু’শো বছর ধরে জগন্নাথের সঙ্গে একই রথে বসেই কৃষ্ণনগরের রাস্তায় বের হতেন গোপীনাথ। তখন জলঙ্গী ছিল প্রমত্তা নদী। ভাগীরথী পেরিয়ে জলঙ্গী নদীপথে বিশেষ নৌকাযোগে কৃষ্ণনগরে আনা হতো গোপীনাথকে। তাঁর নৌকার সামনে থাকত দু’টি এবং পিছনে থাকত আরও দু’টি পাহারার নৌকা। নদীর ঘাটে নৌকা ভিড়তেই শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি ও হরিনামে মুখর হয়ে উঠত চারদিক। নদীর দুই তীরজুড়ে ভিড় করতেন অসংখ্য মানুষ। 
গোপীনাথের সঙ্গে কৃষ্ণনগরের এই সম্পর্কের ইতিহাস আরও প্রাচীন। জনশ্রুতি অনুযায়ী, শ্রীচৈতন্যদেবের নির্দেশে তাঁর অন্তরঙ্গ ভক্ত গোবিন্দ ঘোষ অগ্রদ্বীপে গোপীনাথের বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু ষোড়শ শতকের শেষদিকে সেই বিগ্রহ চুরি হয়ে যায়। পরে পূর্ব বর্ধমানের পাটুলির জমিদার বিগ্রহটি উদ্ধার করেন। এরপর দীর্ঘদিন পাটুলিতেই গোপীনাথের অবস্থান ছিল। তবে চৈত্র মাসের মেলার সময় তাঁকে অগ্রদ্বীপে নিয়ে যাওয়া হতো।
পরবর্তীকালে গোপীনাথের মেলায় একটি দুর্ঘটনার পর নিরাপত্তার প্রশ্ন সামনে আসে। তখন বাংলার নবাব মুর্শিদকুলি খান নদীয়ারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের পিতা রঘুরামের হাতে গোপীনাথের নিরাপত্তার দায়িত্ব অর্পণ করেন বলে জনশ্রুতি রয়েছে। এরপর থেকেই বছরের অধিকাংশ সময় গোপীনাথ নদীয়ার রাজবাড়িতেই অবস্থান করতেন। দুর্গাপুজোর পর তাঁকে অগ্রদ্বীপে নিয়ে যাওয়া হতো এবং চৈত্রের মেলা শেষে তিনি আবার ফিরে আসতেন কৃষ্ণনগরে। সেই কারণেই রথযাত্রার সময় জগন্নাথের সঙ্গে গোপীনাথের যুগল উপস্থিতি কৃষ্ণনগরের রথযাত্রার অন্যতম বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছিল। শহরের প্রবীণদের কথায়, গোপীনাথের আগমন ছিল রথযাত্রার প্রাণ। নদীপথে তাঁর আগমনের খবর ছড়িয়ে পড়লেই ঘাটে ঘাটে ভিড় জমত। শুধু কৃষ্ণনগর নয়, আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকেও মানুষ সেই দৃশ্য দেখতে ছুটে আসতেন। রথযাত্রা যেন শুধুমাত্র ধর্মীয় অনুষ্ঠান ছিল না, বরং নদীয়ার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের এক বিরাট মিলনমেলায় পরিণত হতো।
নদীয়ার বাসিন্দা সুপ্রতিম কর্মকার বলেন, কৃষ্ণনগরের রথতলার রথ আমাদের শহরের প্রাচীনতম রথগুলির অন্যতম। এই রথের সঙ্গে শহরের ইতিহাস ও শিকড় জড়িয়ে রয়েছে। আগে রাজবাড়িতে রথ থাকত, আর রথযাত্রার সময় অগ্রদ্বীপ থেকে গোপীনাথকে জলঙ্গী নদীপথে নৌকায় করে আনা হতো। সেই দৃশ্য ছিল অপূর্ব। আজ বিগ্রহ আর আসে না, কিন্তু সেই স্মৃতি এখনও কৃষ্ণনগরের মানুষের হৃদয়ে জীবন্ত। 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ