১৯৩২ সাল। শীতের সকাল। চিৎপুর রোডের একটি জুতোর দোকানে বসে আছেন এক সাহেব। ব্রিটিশ নন, তাঁর বাড়ি চেকোস্লোভাকিয়ায়। আচমকা সেই মাঝবয়সি সাহেবের চোখ পড়ল রাস্তায়, এক বৃদ্ধ রিকশওয়ালার দিকে। নিজের রিকশতেই বিশ্রাম নিচ্ছিলেন অবসন্ন সেই বৃদ্ধ। ধুলোয় ভরা খালি পা ক্ষতবিক্ষত। রক্ত গড়াচ্ছে। সাহেবের মনে নাড়া দিল সেই ঘটনা। পরাধীন ভারতে তখন জুতো পরার সামর্থ্য খুব কম মানুষেরই ছিল। জাপান থেকে কিছু জুতো আমদানি হতো। কিন্তু সিংহভাগ মানুষই খালি পায়ে হাঁটাচলা, কাজকর্ম করতেন।
Advertisement
চিৎপুরের সেই ঘটনার কয়েকদিন পরে সাহেব গেলেন হাওড়া ব্রিজে। এক কোণে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলেন অগণিত মানুষ হেঁটে চলেছেন। খালি পায়ে। পকেট থেকে বার করলেন নোটবুক। তাতে কিছু আঁকিবুকি কাটলেন। নোটবুকের প্রথম পাতায় লেখা সাহেবের নাম— টমাস বাটা। সেই দিন থেকেই ভারতের প্রথম বাটা কারখানা গড়ার পরিকল্পনা শুরু হল। শীঘ্রই টমাস সাহেব জনতে পারলেন, গঙ্গার ধারে কোন্নগর গ্রামে রয়েছে একটি পরিত্যক্ত তেলকল। হাতিরকুল অয়েল মিল। সেটি চালাত কলকাতার অ্যান্ডারসন রাইট কোম্পানি। মহামন্দার ধাক্কায় তিন বছর আগে, ১৯২৯ সালে তা বন্ধ হয়ে যায়। কোন্নগরের সেই কারখানাই পাঁচ বছরের জন্য ভাড়া নিলেন টমাস। রাতারাতি কলকাতার গুদামঘর, অফিস ও বাকি সব কিছু সেখানে স্থানান্তরিত হল। টমাসের সঙ্গেই চেকোস্লোভাকিয়া থেকে এল ১৪ জন তরুণের একটি টিম। তাঁরা উঠলেন কারখানার দক্ষিণে গঙ্গার ধারের বাংলোয়। বন্ধ তেলকলের ঝোপ জঙ্গল সাফ হল। কারখানার গেটের উপর বসল বাটার সাইনবোর্ড। তৈরি হল ভলিবল কোর্ট, সুইমিং পুল। গঙ্গার ধারে বসল লোহার জেটি। ১৯২৫ সালে চেকোস্লোভাকিয়া থেকে জুতো আমদানি করে আনত বাটা। ফলে ন্যূনতম দাম পড়ত ৫-৭ টাকা। মাত্র কয়েক আনা উপার্জন করা সাধারণ মানুষের পক্ষে তা কেনা সম্ভব ছিল না। দেশি চামড়া ও শ্রমিক দিয়ে ভারতে জুতো তৈরি করা হলে একমাত্র দাম কমা সম্ভব ছিল। কোন্নগরের কারখানায় সেই কাজই শুরু করেছিলেন টমাস সাহেব। ভাষা সমস্যা ও বিক্রিবাটার নেটওয়ার্ক সহ প্রাথমিক বহু বাধা কাটিয়ে অচিরেই মহীরুহের রূপ নেয় তাঁর ব্র্যান্ড—বাটা।



