Bartaman Logo
২৭ মে, ২০২৬
বর্তমান / ব্ল্যাকবোর্ড

তুলসী চারার মেলা

তুলসী চারার মেলা
  • ২০ জানুয়ারি, ২০২৫ ০০:০০
ঝাড়গ্রামের দুধকুণ্ডীর বদিনা গ্রাম। সেখানে ভূগর্ভ থেকে উৎসারিত মিষ্টি জলের অবিরাম ধারা থেকে জন্ম নিয়েছে কেলেঘাই নদী। যুগ যুগ ধরে মেদিনীপুরের মানুষের সুখ-দুঃখের সঙ্গী এই নদী। দীর্ঘ যাত্রাপথের একাংশে কেলেঘাই হয়ে উঠেছে পটাশপুর আর সবংয়ের মধ্যবর্তী জল-বিভাজিকা। এই পটাশপুরে গোকুলপুর গ্রামে কেলেঘাইয়ের বক্ষে রয়েছে বৈষ্ণবসাধক গোকুলানন্দ বাবাজির তুলসী মঞ্চ। প্রতি বছর পৌষ সংক্রান্তিতে এই মঞ্চ ঘিরেই বসে তুলসীচারার মেলা। কে এই গোকুলানন্দ বাবাজি? সপ্তদশ শতকে চৈতন্যদেবের আগমন এবং শ্যামানন্দ ও রসিকানন্দ প্রমুখের বৈষ্ণব আন্দোলনের প্রভাবে পটাশপুর, সবং, দাঁতন, নারায়ণগড়, ভগবানপুরের জনপদগুলি তখন কৃষ্ণপ্রেমে মাতোয়ারা। সেই সময় সবংয়ের কোলন্দায় জন্মগ্রহণ করেন গোকুলানন্দ। তাঁদের পৈতৃক ভিটে ছিল নদীর অন্য পারে, গোকুলপুরে। পূর্ণবয়সে সাধন-ভজনেই তাঁর দিন কাটত। স্থানীয় জমিদার পরমানন্দ ভূঁইয়ার ছেলে বিপ্রদাস তাঁর কাছে বৈষ্ণব ধর্মে দীক্ষা নিয়ে শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। বিপ্রদাস গুরুর বাসস্থানের জন্য জায়গা দিতে চাইলেও গোকুলানন্দ ফিরে যান পৈতৃক গ্রাম। সেখানে নদীবক্ষে এক চড়ায় শুরু করেন সাধনা। সমাধিস্থও হন সেখানেই। লোকশ্রুতি আছে, শিষ্য বিপ্রদাসকে গোকুলানন্দ বলে গিয়েছিলেন, পৌষ সংক্রান্তিতে কেলেঘাইতে স্নান করে তিন মুঠো মাটি যে দিয়ে আসবে তুলসীমঞ্চে, তার মনস্কামনা পূরণ হবে। সেই শুরু। তখন স্নান সেরে তুলসীমঞ্চে মাটি দেওয়ার পর শুরু হতো কীর্তন আর পংক্তিভোজন, যা দিনে দিনে মেলার চেহারা নেয়। মকর সংক্রান্তির ভোররাত থেকে হিমশীতল জলে ডুব দিয়ে কাদামটি হাতে পিছল পথে আছাড় খেতে খেতে তুলসী মঞ্চের দিকে হেঁটে যান পুণ্যার্থীরা। রীতি-আচার সেরে মেলায় মিশে যান তাঁরা। অবিভক্ত মেদিনীপুরের বিস্তীর্ণ অংশে আজও পৌষ সংক্রান্তি মানে গোলায় নতুন ধান। পিঠেপুলি তৈরির তোড়জোড়। আর তুলসীচারার মেলা। লেপ-তোশকের তুলো থেকে মাছ ধরার জাল, কাঠের আসবাব থেকে কাংসা-পিতলের বাসনপত্র, ঘরকন্নার হাজারো সামগ্রী—কী পাওয়া যায় না সেই মেলায়! সংক্রান্তি থেকে দিন সাতেক চলে মেলা। নদীর দু’পারেই বসে দোকানপাট। সময়ের নিয়মে অনেক কিছু বদলে গেলেও তুলসীচারার মেলার আবেদন আজও অমলিন।
Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ