অভিষেক পাল, বহরমপুর: ঐতিহ্যবাহী রথযাত্রা ঘিরে মুর্শিদাবাদে সাজো সাজো রব। সুবে বাংলার রাজধানী মুর্শিদাবাদ জেলায় সুপ্রাচীন কাল থেকেই রথযাত্রাকে ঘিরে চরম উন্মাদনা ছিল। বিভিন্ন রাজা-মহারাজা-জমিদারদের পৃষ্ঠপোষকতায় রথযাত্রা শুরু হলেও পরে আর্থিক কারণে শুরুর আড়ম্বর ও জাঁকজমক গতানুগতিকতায় পরিণত হয়। জেলার সদর বহরমপুরে এক সময়ে মহাসমারোহে রথযাত্রা পালিত হত। তবে, এখন কয়েকটি রথযাত্রা ছাড়া আর্থিক কারণে প্রাচীন জমিদারদের রথের শুরুর আড়ম্বর ও জাঁকজমক এখন নিয়ম রক্ষায় পরিণত হয়েছে।
কাশিমবাজার বড়ো ও ছোটো রাজবাড়ির রথ ঘিরে যেমন এক সময়ে ব্যাপক উন্মাদনা ছিল। প্রায় আড়াইশো বছর আগে বহরমপুর সৈয়দাবাদের মহারাজা নন্দকুমারের ছোটো রাজবাড়ির রথযাত্রা শুরু হয়েছিল। কাঠের তৈরি ওই রথটি ছিল চওড়ায় ৮ ফুট ও লম্বায় ২০ ফুট। ওই বিশালতার কারণে রথের পথ-পরিক্রমা করা সম্ভব হত না। পুরুষানুক্রমে চলে আসা কাঠের তৈরি ওই রথের সংস্কার না হওয়ায় রোদ-বৃষ্টিতে ভিজে তা নষ্ট হয়ে যায়। ১৯৬৫ সালে শেষ রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। এখন রথের দিন অন্যান্য ক্রিয়া-কর্ম পালিত হয়। একইভাবে কাশিমবাজার বড়ো রাজবাড়িতেও নিয়ম রক্ষার্থে রথের দিন আচার পালন হয়ে থাকে। তবে, এখন ছোটো রাজবাড়ির রথযাত্রা ধুমধাম করে পালন করা হয়।
বহরমপুর নতুন বাজারের কাছে দামোদর আখড়ার রথযাত্রা প্রায় ১৮০ বছরেরও বেশি পুরনো। রথের দিন রাধা ও কৃষ্ণের বিগ্রহকে গঙ্গাস্নান করিয়ে ৬ ফুট চওড়া ও ১৫ ফুট লম্বা রথের উপরে স্থাপনের পরে রথ সাজিয়ে শহর পরিক্রমা করানো হয়। তবে, বহরমপুরের উল্লেখযোগ্য ছিল সৈদাবাদের কেদার মাহাতাব পরিবারের পারিবারিক রথযাত্রা। প্রায় ১১৫ বছরের বেশি প্রাচীন ওই রথের চাকাগুলি তামা দিয়ে তৈরি, ঘোড়া ও রথের সারথীও ছিল পেতলের। ওই রথে রাধা ও কৃষ্ণের মূর্তি স্থাপিত হত। ১৯৭৭ সালে পথ-পরিক্রমার সময়ে রথের চাকায় এক যুবকের হাত ও পায়ের আঙুল পিষে যাওয়ার পর থেকেই ওই রথযাত্রা বন্ধ হয়ে যায়।
বর্তমানে বহরমপুর সদর হাসপাতাল লাগোয়া জগন্নাথদেব মন্দিরের ট্রাস্টি বোর্ডের উদ্যোগে রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। প্রায় আড়াইশো বছরের বেশি প্রাচীন ওই রথযাত্রা উৎসব-আড়ম্বরের সঙ্গেই পালন করা হয়। সম্পূর্ণ পেতলের তৈরি ওই রথটি চওড়ায় ৮ ফুট ও লম্বায় ২০ ফুট। ট্রাস্টি বোর্ডের নিজস্ব জমি, বাড়ি বাড়ি ও মন্দিরের প্রণামী থেকেই রথযাত্রার সমস্ত খরচ বহণ করা হয়। রথের দিন পুরীর রথযাত্রার অনুকরণে জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার বিগ্রহকে পৃথকভাবে ১০৮ ঘড়া গঙ্গাজলে স্নান করিয়ে রথের উপরে স্থাপন করা হয়, এ বছরও ব্যতিক্রম হবে না।
এছাড়া বহরমপুরের টেক্সটইল কলেজ মোড় থেকে শুরু হওয়া বহরমপুরের ইসকনের রথযাত্রাও জাঁকজমকের দিক থেকে অন্যদের টেক্কা দেয়। সুসজ্জিত বিশালকার তিনটি রথ এগোয় ভৈরবতলা মাঠের দিকে। হাজার হাজার মানুষ বাদ্যযন্ত্র সহযোগে নাচতে নাচতে রথকে টেনে নিয়ে যায়। আবার উল্টো রথের দিন ভৈরব তলা থেকে টেক্সটাইল কলেজ মোড় অবধি রথযাত্রা অংশ নেবে হাজার হাজার মানুষ। পুরীর রথযাত্রার অনুকরণে বহরমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজের দক্ষিণ দিক লাগোয়া ভাগীরথী পাড়ের জগন্নাথদেবের মন্দিরে রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। মন্দিরের পূজারী ওড়িশাবাসী ব্রাহ্মণ সেবাইতদের দ্বারা প্রায় ২০০ বছর আগে ওই রথযাত্রার সূচনা হয়। বর্তমানে তাঁদের বংশধর সেবাইতরা ওই প্রাচীন রথযাত্রা পরিচালনা করেন। রথযাত্রা উপলক্ষ্যে এদিন সকাল থেকে মন্দির প্রাঙ্গণে মহাভোজের আয়োজন করা হয়। বহরমপুর লাগোয়া হরিদাসমাটি এলাকায় মন্দির কর্তৃপক্ষের নিজস্ব জমিতে প্রায় ২০০ বছরের প্রাচীন ওই রথের মাসির বাড়ি যাওয়া উপলক্ষ্যে অজস্র ভক্তগণ ওই মন্দির প্রাঙ্গণে জড়ো হন। হরিদাসমাটি এলাকায় ওই রথকে ঘিরে এখন সাত দিন ধরে চলবে পূজার্চনা। উল্টো রথের দিন ওই রথ ফের জগন্নাথদেবের মন্দিরে ফিরিয়ে আনা হবে। • নশিপুর জাফরাগঞ্জ আখড়ার পিতলের রথ।