সুখেন্দু পাল, বর্ধমান: রথযাত্রা মানেই শৈশবকে ফিরে দেখা। রথের মেলায় গিয়ে নস্টালজিক হয়ে পড়েন না, এমন মানুষ খুব কম রয়েছে। চোখের সামনে ভেসে ওঠে জিলিপি, পাঁপড়ভাজা খেয়ে বাড়ি ফেরার সেই সোনালি দিনের কথা। মাহেশ, গুপ্তিপাড়া বা মহিষাদলের মেলায় হারিয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা সবার না থাকলেও নিজের গ্রাম বা শহরের রথের স্মৃতি সবার মতেই টাটকা। আর রাজাদের শহর বর্ধমানের মানুষের স্মৃতি যেন আরো মধুর। এখনো এই শহরে রয়েছে রাজারানির রথ।
বর্ধমানের মানুষের কাছে রাজবাড়ির রথযাত্রার গুরুত্ব এখনো অনেক বেশি। রাজপ্রথার অনেক আগেই অবসান হয়েছে। কিন্তু এখনো রয়ে গিয়েছে রাজা ও রানির রথ। রাজবাড়িতে দু’টি রথেই এখনো টান দেওয়া হয়। তবে জগন্নাথ-বলরাম-সুভদ্রা নয়, একটি রথে চড়েন লক্ষ্মী-নারায়ণ, অন্যটিতে রাধা-গোপাল। রাজবাড়ির কুলদেবতা লক্ষ্মীনারায়ণ জিউ মন্দির চত্বরেই রথ টানা হয়। স্থানীয়রা জানান, মহারাজা তেজচাঁদের আমল থেকে এখানে রথযাত্রা চলে আসছে। প্রাচীন রীতি মেনে সকালেই রথের রশিতে টান দেওয়া হয়। তা দেখতে শুধু বর্ধমান নয়, জেলার বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ রাজবাড়িতে ঢুঁ মারেন। অনেকেই রথ দেখে ডুব দেন শৈশবের সুখের স্মৃতিতে। কাঞ্চননগরেও রথ দেখতে শহরের বাসিন্দারা ভিড় জমান।
রাজবাড়ির পাশাপাশি জামালপুরের কুলীনগ্রামের রথ ঘিরেও নানা কাহিনী প্রচলিত। এখানকার রথযাত্রা ৫০০বছরের প্রাচীন। একসময় কুলীনগ্রাম থেকে রথের দড়ি যেত পুরীতে। এখানকার কাঠের তৈরি রথের উচ্চতা প্রায় ৩০ফুট। দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ ১৬ ফুট। পাঁচ চূড়াবিশিষ্ট রথের উপরে থাকেন জগন্নাথ, বলভদ্র এবং সুভদ্রা। স্থানীয়রা জানান, এই প্রাচীন গ্রামে এসেছিলেন মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যদেব। আউশগ্রামের দিগনগর গ্রামের রথও বহু প্রাচীন। কথিত রয়েছে, সেই গ্রামের জগন্নাথ মন্দির এবং রথ বর্ধমানের রাজারই প্রতিষ্ঠিত।
রাজ্যের মন্ত্রী কলিতা মাঝি বলছেন, আউশগ্রামের রথের সঙ্গে এলাকার বাসিন্দাদের প্রাণের যোগ রয়েছে। এখানকার বিভিন্ন গ্রামে রথের দড়িতে টান দেওয়া হয়। এই শুভ দিনে অনেকেই নতুন কাজ শুরু করেন। ভাতারের বিধায়ক সৌমেন কার্ফা বলেন, এবার থেকে বাংলার প্রতিটি উৎসব জাঁকজমকভাবে হবে। আমাদের জেলার বিভিন্ন প্রান্তে বহু পুরনো রথযাত্রা রয়েছে। ভাতার বিধানসভা কেন্দ্রেও বহুবছর ধরে রথযাত্রা ধুমধাম করে হয়ে আসছে। জেলার বাসিন্দারা বলছেন, এদিন থেকেই বাংলার উৎসব শুরু হয়ে গেল। কারণ, রথের দড়িতে টান পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয় দুর্গাপুজোর প্রস্তুতি। এবারও তার ব্যতিক্রম হচ্ছে না। কুমোরপাড়াতেও ব্যস্ততা শুরু হয়ে গিয়েছে। রথের দিন মেলা থেকে ঘুরে এসেই বসবে পুজোর প্রস্তুতি বৈঠক। • নিজস্ব চিত্র