কীভাবে যাবেন: বিমান বা ট্রেনে প্রথমে যেতে হবে দিল্লি বা চণ্ডীগড়। সেখান থেকে সড়কপথে পৌঁছানো যায় স্পিতি ভ্যালি। ধাংকার ভ্যালি বা পিন উপত্যকার রোড ম্যাপ ওখানে পৌঁছেও ঠিক করা যায়। আবার ট্যুর প্ল্যান আগেও করে নিতে পারেন।
এক হাজার সতেরো বছরের পুরানো। ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি পাওয়া সুপ্রাচীন তাবোর মাটির তৈরি মনাস্ট্রি। আগেও এই মনাস্ট্রি দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। তাবো মনাস্ট্রির ১০৮টি মঠের সুন্দর সুপরিচ্ছন্ন চৌহদ্দি। তবে প্রতিবারই যেন নতুন লাগে। বাইশ বছর আগের সেই স্মৃতি অমলিন রয়েছে। সেই একই রকম মুগ্ধতা নিয়ে নতুন পথে, নতুন ভ্রমণ। এবার ধাংকার যাচ্ছি। আগেরবার ধাংকার দেখার সুযোগ হয়নি। আজ সেই ঐতিহ্যবাহী ধাংকার মনাস্ট্রি ও ধাংকার জনপদকে দেখব। একটা রাত ধাংকারে থাকব।
তাবো থেকে ধাংকার খুব দূরে নয়। পথের হিসেবে কম বেশি চল্লিশ কিমি। সময় ঘণ্টা দুয়েক লাগে। এই চল্লিশ কিমি পথের সৌন্দর্য অসাধারণ। পথের দু’ধারে আপেল বাগান, মটরশুঁটি, রাজমা ও সবজির খেত। শাক-সবজি এই অঞ্চলে, এই জুলাই-আগস্ট মাসে খুব ভালো হয়। বাজারেও দেখেছি টাটকা সবজি। মাঝে মাঝে আখরোট গাছ দেখা যায়। উইলো, পপলার গাছের সারি চোখ জুড়িয়ে দেয়। আকাশ তো নীল, ঘন নীল হয়েই থাকে। স্পিতি নদীর চলন ও কত যে বাঁক বদলের অসাধারণ সব দৃশ্য দেখতে দেখতে যাচ্ছি। প্রাণ-মন জুড়িয়ে যাচ্ছে। এই পথের ভ্রমণটাই যেন এক সার্থক বেড়ানো। গন্তব্যে পৌঁছানোর চেয়েও গন্তব্যের উদ্দেশে পাড়ি দেওয়া পথ বেশি আকর্ষণ করে মনকে।
ধাংকার ভ্যালি
তাবো থেকে কাজার পথে পড়বে সিচলিং। এখান থেকেই রাস্তা ভাগ হবে জানতাম। তাই খেয়াল রেখেছিলাম কখন সিচলিং আসবে। পথের সৌন্দর্যে বিভোর হয়ে যেতে যেতেই একসময় চোখে পড়ল সিচলিং লেখা ছোট্ট একটা বোর্ড। দেখলাম মূল রাস্তা থেকে ডানদিকে একটা রাস্তা চলে গিয়েছে। এ পথ দিয়ে গেলেই পৌঁছে যাব ধাংকার। দূরত্ব কমবেশি সাত কিমি। পথ বেশ চড়াই। গাড়ি পাকদণ্ডীতে চক্কর খেতে খেতে উঠছে। যত উপরে উঠছি, আকাশ-বাতাস পালটে যাচ্ছে। ঠান্ডা শীতল হাওয়া স্নিগ্ধ করে দিচ্ছে। মন উদাস বাউলের মতো আনন্দে মুগ্ধ হচ্ছে। বেশ কিছুটা পথ পেরিয়ে এসে এবার দূর থেকেই দেখতে পেলাম ধাংকার ভ্যালিকে। আরও দূরে দেখলাম সেই সুপ্রাচীন বিখ্যাত ধাংকার মনাস্ট্রি। পৃথিবীর একশোটি বিপজ্জনক প্রাচীন ঐতিহাসিক ভবনের একটি।
এই মনাস্ট্রিকে ‘ধাংকার ফোর্ট’ও বলে। ‘ধাং’ শব্দের অর্থ হল খাড়া পাহাড়, ‘কার’ হল দুর্গ। এই ফোর্ট বা দুর্গকে কেন্দ্র করেই ১২,৭৭৪ ফুট উচ্চতায় একসময় গড়ে উঠেছিল ধাংকার জনপদ। তখনকার সময়ে ধাংকার হয়ে উঠেছিল স্পিতির রাজধানী। সেই প্রাচীন রাজধানীর আরও কাছাকাছি চলে এসেছি। এবার চোখের সামনে আরেক অপরূপের দেখা পেলাম। মনাস্ট্রির খুব কাছেই পর পর দাঁড়িয়ে আছে এককভাবে প্রাকৃতিক মনোলিথ। এই প্রস্তরখণ্ডগুলো যেন কোনো এক অচিন শিল্পীর ছোঁয়ায় এক একটা ভাস্কর্যের রূপ পেয়েছে। এর গঠনবৈচিত্র অসাধারণ। হাজার হাজার বছর ধরে এই রুক্ষ মরু অঞ্চলের বাতাসের আঁচড় খেতে খেতে পাথরগুলোর মধ্যে একটা ক্ষয়জনিত কারুকার্য সৃষ্টি হয়েছে। একে অপরূপ শিল্পকর্ম নিঃসন্দেহে বলা যায়। প্রকৃতির আপনখেয়ালে গড়া। তাই মুগ্ধ হয়ে দেখলাম। ধাংকার মনাস্ট্রির পথে অনেক ওপর থেকে নীচে ফেলে আসা স্পিতি নদীকে দেখতে পাচ্ছি। সমতল দিয়ে বয়ে চলেছে স্পিতি। স্পিতি অসংখ্য শাখায় বিভক্ত হয়ে বয়ে চলেছে। দূর থেকে দেখা সেই স্পিতি নদীর সৌন্দর্যও মনকে আবিষ্ট করে।
ধাংকারে পৌঁছে হোম স্টের ছোট্ট ঘরটায় মালপত্র রেখে আরও একবার দু’চোখ মেলে পুরো জনপদটাকে দেখলাম। একমুঠো ছোট্ট একটা গ্রাম। শান্ত এক জনপদ। রুক্ষতায় পুরো অঞ্চলটাই কেমন অন্যরকম। এটাই বৈশিষ্ট্য, এটাই এই জায়গার সৌন্দর্য। সব সৌন্দর্যের মধ্যে কোমল স্নিগ্ধতা থাকে না। তবু তার মতো করে সে সুন্দর, সে অন্যরকম। এই অন্যরকম সুন্দরের দেশ হল স্পিতি ভ্যালি।
দুপুরে আজ খিচুড়ি ও ডিমভাজা। মহানন্দে চেটেপুটে খেলাম। লাঞ্চ করতে বসে আলাপ হল এক বাইকার দম্পতির সঙ্গে। ওরা এসেছে কর্ণাটক থেকে। অভিযানপ্রিয় এই তরুণ বাইকার দম্পতির সঙ্গে দোস্তি হয়ে গেল। এবার চারজনে একসঙ্গে যাব ধাংকার লেক দেখতে। ট্রেক করে যেতে হবে তিন কিমি চড়াই পথ।
ধাংকার জনপদ ছেড়ে একটু একটু করে পাহাড়ের ওপরে উঠতে শুরু করলাম। অপরাহ্ণের আলো বেশ ঝলমল করছে। ছোটো ছোটো গল্প কথা বলতে বলতে হাঁটছি। এতটা চড়াই ভেঙে উঠতে কষ্টও হচ্ছে।
খাড়াই পথ। একটু একটু করে ভাঙতে ভাঙতে একসময় ঠিক পৌঁছে গেলাম। সময় লাগল কম বেশি দু’ঘণ্টা। ছোট্ট লেক। জলও তেমন নেই দেখলাম। লেকের চারপাশে রুক্ষ নেড়া পাহাড়। হাওয়ার দাপট খুব। লেকের ধারে একটু বসলাম। জিরিয়ে নিলাম। দূরে মণিরাং শিখর ঝলমল করছে। জলে তেমন প্রতিবিম্ব পড়েনি। কারণ লেকে জলই তো বড়ো কম। হোম স্টে থেকে ফ্লাস্কে চা করে দিয়েছিল। লেকের জলের ধারে বসে অপরূপ সুন্দর নির্জনতায়, পাহাড়ের এই উচ্চতায় ফ্লাস্ক থেকে গরম চা ঢেলে চুমুক দেওয়ার আনন্দ-অনুভূতি, সে বড়ো মধুর! মন জুড়িয়ে যাওয়া ভালোলাগা নিয়ে বেশ কিছুটা সময় কাটিয়ে সন্ধে নামার আগেই ধীরে ধীরে নেমে এলাম নীচে। ধাংকার জনপদ তখন আরও শান্ত, আরও নিশ্চুপ। হাঁটতে হাঁটতে ফেরার পথে নতুন মনাস্ট্রিটা ঘুরে দেখে নিলাম। ২০০৩ সালে দলাই লামা উদ্বোধন করেছিলেন এই নতুন মনাস্ট্রি।
রাতের ধাংকারে ঠান্ডা নামল প্রবল। দিন ও রাতের এই তাপমাত্রার তফাত এখানকার এক বৈশিষ্ট্য। শুনেছিলাম রাতের আকাশে কখনো কখনো মিল্কি ওয়েভ দেখা যায়। সেই প্রত্যাশা নিয়ে একটু গভীর রাতের আকাশ বার কয়েক দেখেছি, কিন্তু ভাগ্য সুপ্রসন্ন ছিল না। সেই মিল্কি ওয়েভ দেখা হয়নি।
পরের দিন সকালে জলখাবার খেয়ে ধাংকারের সুপ্রাচীন মনাস্ট্রি দেখলাম। সত্যিই বিপজ্জনক মনে হয়েছে এই ভবনটি। গুম্ফার ভেতরে মৈত্রেয় বুদ্ধের মূর্তি ও অনেকগুলো তপস্যাকক্ষ দেখলাম। চারপাশে রঙিন ধর্মপতাকাগুলো (লুংদার) হাওয়ায় উড়ছে। ছোটো ছোটো সিঁড়ি ভেঙে মাথা নীচু করে প্রাচীন এই গুম্ফার ছাদে উঠে চারপাশের ন্যাড়া রুক্ষ পাহাড়ের সৌন্দর্য, স্পিতি ও পিন নদীর মিলিত হওয়ার দৃশ্যসুখ মনকে আবিষ্ট করে। সেই আনন্দের রেশ বুকে নিয়ে এগিয়ে চললাম পিন উপত্যকার পথে। ধাংকার থেকে লালুং গুম্ফা হয়ে ডেমুলের দিকে একটা পথ চলে গিয়েছে। এবার আর সে পথে পাড়ি নয়, এগিয়ে চললাম অন্যপথে, নতুন ভ্রমণে পিন উপত্যকার দিকে।
পিন উপত্যকা
ধাংকার ভ্যালির উচ্চতা থেকে ধীরে ধীরে নেমে এলাম আবার সেই সমতলে, সিচলিং। কাজার দিকে এই পথ চলে গিয়েছে। আমরা এখন সরাসরি কাজা যাব না। পিন উপত্যকা ঘুরে কাজায় যাব। ধাংকার থেকে পিন উপত্যকা কম বেশি ৪০ কিমি পথ। ৫০৫ জাতীয় সড়ক ধরে কিছুটা এগিয়ে এসে বাঁদিকে ঘুরে স্পিতি নদী পেরলাম। তারপর এগিয়ে চললাম পিন উপত্যকার দিকে। প্রথম কিছুটা পথ ভীষণই খারাপ। তারপর একদম নতুন সড়ক। সদ্য তৈরি হওয়া ঝকঝকে সড়ক ধরে গাড়ি ছুটতে শুরু করল। একপাশে বয়ে চলেছে পিন নদী। খাড়া পাহাড়শ্রেণি চারপাশ ঘিরে দাঁড়িয়ে রয়েছে। আকাশ- বাতাস চমৎকার। তারই মাঝে ছোটো ছোটো গ্রাম। চাষের জমি। কোথাও মটরশুঁটি, কোথাও ক্যাপসিকাম, রাজমা, টম্যাটো, বাঁধাকপি। ছোটো ছোটো গ্রামগুলোর নাম মিক্কিম, শাগনাম, কুংড়ি। আরও আছে। সব নাম আর মনে নেই। এভাবে চলতে চলতে পিন উপত্যকার শান্ত সৌন্দর্য মনকে টেনে নেয়। চোখ জুড়িয়ে আসে। এমন অপার্থিব নির্জনতায় চলে আসতে পারাটা সৌভাগ্য মনে হয়।
একসময় মুদ গ্রামে এসে থামলাম। এখান থেকেই শুরু হয়েছে পিন ভ্যালি জাতীয় উদ্যান। এবং অনেক বিখ্যাত ট্রেক রুট। দলে দলে ট্রেকাররা আসে পিন উপত্যকায় প্রতি বছর। মুদ গ্রামের একদিকে ভাবা উপত্যকা, অপর দিকে পার্বতী উপত্যকা। এখানেই রয়েছে পিন-পার্বতী হিমবাহ।
পিন নদীর উৎসস্থল হল পার্বতী হিমবাহ। এত কিছুর আবহে পিন উপত্যকাকে অসাধারণ মনে হয়। দিব্যি একটা দুটো দিন এখানে কাটানো যায়। কোনো ট্রেক না করেও এই উপত্যকায় শুধু হেঁটে ঘুরে বেড়িয়ে জীবনের অনেক হতাশা, ব্যর্থতা, না পাওয়ার বেদনাকে ছুড়ে ফেলে অন্যরকম করে বেঁচে থাকার আনন্দ কুড়িয়ে নিয়ে ফেরা যায়।
ধাংকার থেকে পিন উপত্যকার এই ছোট্ট ভ্রমণ সাঙ্গ করে এগিয়ে চললাম কাজার পথে। আজ কাজায় রাত্রিবাস। বাইশ বছর আগে কাজায় একবার এসেছিলাম। সেই কাজাকে কি আর খুঁজে পাব!
মুদ গ্রাম থেকে আবার এসে উঠলাম জাতীয় সড়কে। স্পিতি নদীর দেখা পেলাম। বিদায় পিন নদী, পিন উপত্যকা। পথের টানে পথিক হয়ে ঘুরে না বেড়ালে এই অপরূপ সফরকথার জন্মই হত না।
হে পথ, প্রণাম তোমায়!
সুব্রত সরকার



