নয়াদিল্লি: সুলতানি ও মুঘল আমলের গৌরবগাথা নয় বরং অন্ধকারময় অধ্যায়কেই পড়ুয়াদের সামনে তুলে ধরতে তৎপর মোদি সরকার। তারই অংশ হিসেবে এনসিইআরটির অষ্টম শ্রেণির সোশ্যাল সায়েন্সের বইতে ওই পর্বের সিলেবাসে একাধিক সংশোধন করা হয়েছে। তাতে রয়েছে, দিল্লির সুলতানি ও মুঘল আমলে ‘ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার’ বহু নজির রয়েছে। লেখা হয়েছে, বাবর ছিলেন নৃশংস ও বেপরোয়া হানাদার। আকবরেরও সমালোচনা রয়েছে ওই বইতে। মুঘল সাম্রাজ্যের শ্রেষ্ঠ শাসককে নিষ্ঠুরতা ও সহিষ্ণুতার মিশ্রণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে এনসিইআরটির বইয়ে। সেখানে আরও বলা হয়েছে, আওরঙ্গজেব অসংখ্য মন্দির ও গুরুদ্বার ধ্বংস করেছিলেন। বইয়ের বিষয়বস্তু প্রকাশ্যে আসতেই নানা মহলে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। শিক্ষাবিদদের একাংশের মতে, নির্দিষ্ট একটি সময়ের নেতিবাচক দিকগুলি তুলে ধরে মেরুকরণের অস্ত্রেই শান দিচ্ছে মোদি সরকার। পড়ুয়াদের মধ্যেও ছোট থেকে সেই ভাবনাচিন্তা ঢুকিয়ে দিতেই নয়া উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বইয়ের নতুন সংশোধনী নিয়ে যে এধরনের সমালোচনা হতে পারে, তা আগাম আন্দাজ করতে পেরেছিল এনসিইআরটি। তারই ইঙ্গিত মিলেছে ‘সতর্কীকরণ’-এ। ‘নোট অন সাম ডার্কার পিরিয়ডস ইন হিস্ট্রি’—তে রয়েছে সেই সতর্কীকরণ। সেখানে লেখা হয়েছে, অতীতে কোনও ঘটনার জন্য বর্তমান প্রজন্মকে যেন দোষী সাব্যস্ত করা উচিত নয়।
সম্প্রতি অষ্টম শ্রেণির জন্য সোশ্যাল সায়েন্সের পার্ট ওয়ান প্রকাশ করেছে এনসিইআরটি। এই বইতে দিল্লির সুলতানি আমল ও মুঘল সাম্রাজ্যে সম্পর্কে একাধিক বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। এর আগে দিল্লির সুলতানি আমল, মুঘল, মারাঠা সম্রাজ্যের মতো বিষয়গুলিকে সপ্তমের বইতে অন্তর্ভুক্ত ছিল। নয়া সিলেবাস অনুযায়ী, এগুলি এখন অষ্টমের পাঠ্য। সুলতানি শাসন সম্পর্কে লেখা হয়েছে, ওই সময় রাজনৈতিক অস্থিরতা ও যুদ্ধ চরমে উঠেছিল। একের পর এক গ্রাম, শহরে ধ্বংসলীলা চলেছে। মানুষকে খুন করা হয়েছে। মন্দির ও গুরুদ্বার ধ্বংস করেছেন তৎকালীন শাসকরা। মন্দিরে হামলা ও কয়েকজন শাসকের ‘নৃশংসতা’ বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। সপ্তম শ্রেণির বইয়ে এমন ব্যাখ্যা ছিল না।
নতুন বইয়ে বাবরকে নিয়ে লেখা হয়েছে, প্রথম মুঘল সম্রাট আত্মজীবনীতে নিজেকে সংস্কৃতিবান ও বুদ্ধিজীবী শাসক বলে উল্লেখ করেছিলেন। সেই সঙ্গে তিনি ছিলেন একজন নৃশংস ও বেপরোয়া হানাদার। ক্ষমতা দখলের জন্য তিনি শহরের পর শহর, গ্রামের পর গ্রামে হত্যালীলা চালিয়েছিলেন। মহিলা, শিশুদের ক্রীতদাস বানিয়েছেন। মানুষের খুলির প্রাসাদ বানিয়ে গর্ব অনুভব করতেন। আকবরের শাসনেরও নেতিবাচক দিক তুলে ধরা হয়েছে এনসিইআরটির নয়া বইয়ে। উল্লেখ করা হয়েছে, তাঁর প্রশাসনে অমুসলিমদের সংখ্যালঘু করে রাখা হতো। চিতোরগড় দখলের পর তিনি গণহত্যা চালিয়েছিলেন। ৩০ হাজার মানুষ তাতে প্রাণ হারিয়েছিলেন। আকবরের উদ্ধৃতিও রয়েছে বইয়ে। সেখানে লেখা, ভিনধর্মীদের একাধিক দুর্গ ও শহর আমরা দখল করেছিল। সেখানে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। রক্তপিপাসু তলোয়ার দিয়ে ভিনধর্মীদের সমস্ত চিন্তাভাবনা তাঁদের মস্তিষ্ক থেকে মুছে দেব। হিন্দুস্তানের সমস্ত মন্দিরও ধ্বংস করে দিয়েছি। বইয়ে আওরঙ্গজেবের ধর্মীয় নীতিকেও আতশকাচের নীচে ফেলা হয়েছে। বলা হয়েছে, বারাণসী, মথুরা, সোমনাথ সহ অসংখ্য মন্দির ধ্বংসের নির্দেশ দিয়েছিলেন মুঘল শাসক। জৈন ও শিখ প্রার্থনা স্থলও ধ্বংস করেছিলেন তিনি। অন্যদিকে, সুলতানি শাসন ও মুঘলদের বিরুদ্ধে লড়াই করা মারাঠা, অহম, রাজপুত, শিখ রাজাদের গৌরবগাথাও তুলে ধরা হয়েছে অষ্টম শ্রেণির বইয়ে।