


সমীর সাহা, নবদ্বীপ: মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁকে বলেছিলেন ‘নবদ্বীপের গান্ধী’। সেটা ছিল ২০২১ সাল। পাঁচ বছর বাদে প্রায় সেই সুরেই সুর মিলিয়ে চারিচারাপাড়ায় মাইকে ঘোষণা হচ্ছিল— ‘আপনাদের আশীর্বাদ চাইতে আজ চারিচারা বাজারে আসছেন নবদ্বীপের ‘শান্তির দূত’ নন্দ সাহা। যোগ দেবেন স্থানীয় তৃণমূল নেতৃত্বের উদ্যোগে আয়োজিত একটিস্ট্রিট কর্নার মিটিংয়ে।’ বিকেল ঠিক সাড়ে পাঁচটার পর সভাস্থলের অনতিদূরে এসে থামল একটিসাদা চারচাকা গাড়ি। সাদা তো শান্তিরই রং। গাড়ির উপর কার্যত হুমড়ি খেয়ে পড়লেন একদল তৃণমূল কর্মী। শুরু হল কে আগে গাড়ির দরজা খুলবে তার প্রতিযোগিতা। তবে নন্দ নিজেই দরজা খুলে বেরিয়ে এলেন। পরণে ধবধবে সাদা পাঞ্জাবি আর পায়জামা। কয়েকজন দলীয় কর্মী তাঁকে হাত ধরে নামানোর চেষ্টা করায় নন্দ হাসতে হাসতে বললেনএখনও আমি ঠিক আছি। একদম ফিট। তোরাই তো আমার শক্তি।
তৃণমূলের জন্মলগ্ন থেকেইএই ‘শক্তি’-র উপরই আস্থা রেখেছেন দলের সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। পুণ্ডরীকাক্ষ সাহাও (নন্দ) পাল্টা ভরসা জুগিয়ে গিয়েছেন নেত্রীকে। মমতা যখন বিরোধী নেত্রী তখনও বিধানসভার অন্দরে আওয়াজ তুলতে বৈষ্ণবতীর্থ নবদ্বীপকে তুলে দিয়েছেন তাঁর হাতে। সেই থেকে দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে ধীরে ধীরে ইতিহাস গড়েছেন নন্দ।
ইতিহাস গড়ার কাজটা অবশ্যখুব একটা সহজ ছিল না। তখন ভরা বাম জমানা। প্রেমভূমি নবদ্বীপের মানুষের ঘুম ভাঙত বোমা, গুলির আওয়াজে। নিত্যদিন অশান্তি, হিংসা, রক্তপাত আর মৃত্যু। বৈষ্ণবতীর্থের নাম শুনলেভয়ে কাঁপত বুক। নন্দের উপরও হামলা হয়েছিল বলে দাবি। অভিযোগের তির সিপিএমের দিকে। বরাত জোরে নন্দরক্ষা পান। তাঁর রক্ষা পাওয়ার মধ্যেই সেদিন নবযুগের সূচনা দেখেছিলেন নবদ্বীপবাসী।আদ্যোপান্ত গান্ধীবাদী নেতা। ফলে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে পাল্টা সন্ত্রাসের রাজনীতিতে কখনওই যাননি। বরং নবদ্বীপনন্দন গৌরাঙ্গ মহাপ্রভুর অহিংসার আদর্শকে পাথেয় করে সন্ত্রাসের মোকাবিলা করেছেন। সেই জন্যই ২০২১ সালে নবদ্বীপে জনসভায় এসে নন্দকে‘নবদ্বীপের গান্ধী’ বলেছিলেন মমতা। তৃণমূল নেত্রীর দেওয়া এই তকমা নন্দের উপরি পাওনা। আর এবারের ভোটে এটাই তাঁর লড়াইয়ের অন্যতম অনুপ্রেরণা। তাই প্রতিটি সভা, সমিতিতে বলেন, আমার আগে আপনারা আশীর্বাদ করুন আমাদের নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে।চারিচারাপাড়া বাসিন্দাদের কাছে আশীর্বাদ চেয়ে নন্দ চললেনজোয়ানিয়া পঞ্চায়েতের রাওতারা হয়ে নবদ্বীপের প্রাচীন মায়াপুরে। এদিন ছিল রোববার। রাত পর্যন্ত সভা ও পদযাত্রার ঠাসা কর্মসূচি ছিল তাঁর। বিরোধীদের মুখের উপর জবাব দিয়ে বুড়ো হাড়ে ভেলকি দেখিয়ে চলেছেন নন্দ। তাঁর সেনাপতি নবদ্বীপ পুরসভার চেয়ারম্যান বিমানকৃষ্ণ সাহা। তিনি বলছিলেন, এখন ওঁর বয়স হয়েছে। সেইজন্য সব মিটিংয়ে উনি যেতে পারেন না। সেই জায়গাগুলোতে আমরা দলীয় কর্মীরা বক্তব্য রাখেন। ওঁর নামেই ভিড় জমে যায়। আদ্যোপান্ত সন্ন্যাসী জীবন যাপন করেন নন্দবাবু।
সেই ছেলেবেলা থেকেই অত্যন্ত শৃংখলাপরায়ণ তিনি। এখনও প্রতিদিন ভোর পাঁচটায়ঘুম থেকে ওঠেন। সাতসকালে প্রতিটি কাগজে চোখ বোলান। তারপর সবার সব সমস্যার কথা শুনতে বাড়িতে কার্যত ‘বিধায়ক দরবার’ বসান। সেই সঙ্গে একের পর এক ফোনে কথা বলে চলেন বুথ কর্মীদের সঙ্গে। কোথাও কোনো গোলমাল হলে তাঁর প্রথম নির্দেশ, তোরা কিন্তু গোলমালে যাস না।এলাকায় যেন শান্তি বজায় থাকে।এরপরেই তিনি বেরিয়ে পড়েন বিধায়ক এলাকা পরিদর্শনে। ফিরে এসে দুপুরের খাওয়া দাওয়া সেরে একটু বিশ্রাম। বিকেল চারটে থেকে ফের প্রচার অভিযান শুরু নন্দের। যেখানেই যাচ্ছেন, সেখানেই স্বতস্ফূর্ত ভিড়। তাই ডাবল হ্যাটট্রিক করার ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী মমতার ‘গান্ধী’। • নন্দ সাহা। নিজস্ব চিত্র