Bartaman Logo
৯ জুন, ২০২৬
বর্তমান / কলকাতা

মহিলাদের দিকে কুনজর অসভ্য ইংরেজদের, লাঠিপেটা করেছিলেন অ্যান্টনি ফিরিঙ্গির দাদু

তখন কলকাতায় গুচ্ছের পুকুর। সেদিন সবক’টির জল লাল। মাটির রাস্তা লাল আবিরে মাখামাখি। দেওয়াল-বাড়ির চাল লাল। গাছের গোড়া লাল

মহিলাদের দিকে কুনজর অসভ্য ইংরেজদের, লাঠিপেটা করেছিলেন অ্যান্টনি ফিরিঙ্গির দাদু
  • ২ মার্চ, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

কলহার মুখোপাধ্যায়, কলকাতা: তখন কলকাতায় গুচ্ছের পুকুর। সেদিন সবক’টির জল লাল। মাটির রাস্তা লাল আবিরে মাখামাখি। দেওয়াল-বাড়ির চাল লাল। গাছের গোড়া লাল। এক হাত দূরে দাঁড়িয়ে ছেলেকে চিনতে পারছেন না বাবা, সে বাঁদুরে রং মেখে একেবারে ভূত। বাবাকেও চিনতে পারছে না ছেলে। একটু দূরে মা-পিসিরা বসে ঢোল বাজাচ্ছেন। দুলে দুলে কিম্ভূত সুরে গান ধরেছেন। গোটা শরীরে ছোপ ছোপ রং। অসংলগ্ন জামাকাপড় ঠিক করবেন কী, সিদ্ধির নেশায় চুর, দুলেই চলেছেন। তখনকার কলকাতায় এইসব নিয়েই হত দোল। 

Advertisement

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি দোল উৎসবে টানা পাঁচদিন ছুটি দিত। তখন দুর্গাপুজোর সময় ছুটি থাকত আটদিন। দোলে ইংরেজরাও কম যেত না। তারাও আনন্দ করত। তবে আনন্দের থেকে অসভ্যতাই বেশি। ভরা বসন্তে রাস্তায় সুন্দরী মহিলাদের আলুথালু দেখলেই হয়ে পড়ত লোলুপ। অশালীন আচরণ করত বলে অভিযোগ। সে জন্য ঠ্যাঙানিও খেয়েছিল। ঘটনাটি ৩৩৫ বছর আগের। জোব চার্নক সবে এসেছেন। ইংরেজরা তখন পাতি ব্যবসাদার। সেবার দোলে চার্নকের কিছু ইংরেজ সেনা ঘুরতে ঘুরতে লালদিঘি গিয়েছিল। সেখানে মহিলারা রং খেলার পর স্নান করছিলেন। সেনারা সেই দৃশ্য হাঁ করে দেখেছিল। আর ছুড়ে দিয়েছিল অশালীন মন্তব্য। সে সময় মেয়েরা উৎসব ছাড়া তেমন বাড়ির বাইরে বেরতেন না। ফলে ভয়ানক লজ্জাজনক পরিস্থিতি। খবর পৌঁছাল পুরুষদের কাছে। সেই অসভ্যতা দেখে অ্যান্টনি ফিরিঙ্গির দাদু পর্তুগিজ অ্যান্টনি জন এলেন লাঠি হাতে। তিনি লাঠি খেলতেন। কয়েকজন ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে এসে কষে পিটিয়েছিলেন অসভ্য ইংরেজদের। অ্যান্টনি কবিয়ালের পূর্বপুরুষ ছিলেন হিন্দু ধর্মের অনুরাগী। অ্যান্টনি ভালো কীর্তন গাইতেন। খ্রিষ্টান হলেও ভক্ত ছিলেন শ্রীকৃষ্ণের।
তবে ইংরেজরা শুধু নয়, দোলে কলকাতার বাঙালি-অবাঙালিরাও বেহিসাবি আমোদে মেতে হয়ে উঠতেন উচ্ছৃঙ্খল। পরে দোলের সময় পুলিশ শহরে শান্তি বজায় রাখতে লাগাতার প্রচার করত। ঢুলিরা ঢোল বাজিয়ে পুলিশের নির্দেশ প্রচার করত ঘুরে ঘুরে। তখন উৎসব চলত ১০ দিন ধরে। গবেষক অতুল সুর জানিয়েছিলেন, ১৭৮৭ খ্রিস্টাব্দে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি দোলে সরকারি ছুটি রেখেছিল টানা পাঁচদিন।
কবি ঈশ্বর গুপ্তর লেখায় মেলে, ‘ক্রমেতে হোলির খেলা/নবীনা নাগরী মেলা/ ছুটে মুটে যায় এক ঠাঁই.../ যার ইচ্ছা হয় যারে/ আবির কুমকুম মারে.../ঢালিয়া গোলাপ জল/অঙ্গ করে সুশীতল/মাঝে মাঝে হয় কোলাহল...’ এছাড়াও পুরানো লেখাপত্রে দেখা যায়, ‘সে সময় কোনও ব্যক্তির বেদাগ বস্ত্র থাকিত না। দলে দলে মিছিল বাহির হইতেছে, পিচকারি ও আবিরে পথঘাট ঘরবাড়ি লালে লাল হইয়া যাইতেছে।’ এছাড়াও কলকাতায় বেরতো সং। বেরতো নগর সংকীর্তনের দল। তবে এ হল মধ্যবিত্ত-নিম্নবিত্তের দোল। বড়োলোক বনেদিদের দোল খেলা কেমন হত?
অবনীন্দ্রনাথ ‘জোড়াসাঁকোর ধারে’ বইতে লিখছেন, ‘বৈঠকখানায় শখের দোল, শৌখিনতার চূড়ান্ত-সেখানে লটকানে-ছোপানো গোলাপি চাদর, আতর, গোলাপ, নাচ, গান, আলো, ফুলের ছড়াছড়ি।’ ভবনীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘নব বাবুবিলাস’ বইয়ে রয়েছে বাবুদের সখের বাগানবাড়ির উল্লেখ। সেখানে রূপোর রেকাবিতে রাখা আতর মেশানো আবির উড়িয়ে, রূপোর পিচকারির সুগন্ধি রঙিন জল ছিটিয়ে, গেলাসে রঙিন পানীয় ঢেলে, হোলির ঠুমরি কিংবা দাদরার তালে তালে দোস্ত ইয়ারদের নিয়ে মাতাল হয়ে ওঠার আনন্দ...। আজকে শুধু নয়, কলকাতা চিরকালই রঙিন নগর। 

সম্পর্কিত সংবাদ