নিজস্ব প্রতিনিধি, নয়াদিল্লি: পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা ভোটের প্রাক্কালে নতুন বিভাজনের জন্ম দিয়েছে মোদি সরকার। ‘বন্দেমাতরম’ বনাম ‘জনগণমন’। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বনাম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। জাতীয় সংগীত ‘জনগণমন’র তুলনায় জাতীয় গান ‘বন্দেমাতরম’ মোদি সরকারের কাছে অধিক গুরুত্বপূর্ণ। তাই জাতীয় গান ও সংগীত সংক্রান্ত বিধি বদল করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক। বিজ্ঞপ্তি জারি করে জানানো হয়েছে, এবার থেকে বন্দেমাতরমের প্রথম দুই স্তবক গাইলেই হবে না। সম্পূর্ণ গানই গাইতে হবে। অর্থাৎ মোট ছ’টি স্তবক। যে কোনো সরকারি অনুষ্ঠানের আগে, জাতীয় পতাকা উত্তোলনের সময়, রাষ্ট্রপতির আগমন-প্রস্থানের সময় ‘বন্দেমাতরম’ গাওয়া অবশ্যকর্তব্য। যদি জাতীয় গান ও জাতীয় সংগীত উভয়ই গাইতে হয়, তাহলে প্রথমে গাইতে হবে ‘বন্দেমাতরম’। তারপর ‘জনগণমন’। এতদিন পর্যন্ত জাতীয় গান নিয়ে কোনো সরকারি প্রোটোকলের বাধ্যবাধকতা ছিল না। গত বছরই ‘বন্দেমাতরমে’র সার্ধশতবর্ষ উদযাপনের উদ্যোগ নিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। কংগ্রেসকে কাঠগড়ায় তুলে উসকে দেওয়া হয়েছে বিতর্কও। আর এবার নেওয়া হল সরকারি অনুষ্ঠানে সম্পূর্ণ ‘বন্দেমাতরম’ গাওয়ার পদক্ষেপ।
জাতীয় সংগীত নিয়ে কিন্তু মোদি সরকারের কোনও নির্দেশিকা নেই। এমনকী ‘জনগণমন’ সম্পূর্ণ গাইতে হবে, এরকম সিদ্ধান্তও গ্রহণ করা হয়নি। বরাদ্দ সেই ৫২ সেকেন্ড। যদিও বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বন্দেমাতরম’ যেমন মোট ৬ স্তবকের, তেমনই কবিগুরুর ‘জনগণমন’ বা ‘ভারতভাগ্যবিধাতা’ স্তোত্রে রয়েছে আদতে ৫টি স্তবক। কিন্তু প্রথম স্তবকই শুধু গাওয়া হয় জাতীয় সংগীত হিসাবে।
বঙ্কিমচন্দ্র ছয় স্তবকের ‘বন্দেমাতরম’ রচনা করেছিলেন। সেটি পরে অন্তর্ভুক্ত হয় ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসে। ১৮৯৬ সালে কংগ্রেসের অধিবেশনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সুরারোপ করেছিলেন প্রথম দুই স্তবকে। ১৯০৫ সালে সরলাদেবী চৌধুরানি কিংবা দক্ষিণামোহন সেন সম্পূর্ণ গানেই সুর দেন। কিন্তু ১৯৩৭’এ মুসলিম লিগ যখন স্কুল-কলেজে ‘বন্দেমাতরমে’র পূর্ণাঙ্গ রূপ গাইতে আপত্তি করে, সেটাও আবার হিন্দু দেবদেবীর বন্দনার কারণে, তখন রবি ঠাকুরের শরণাপন্ন হন জওহরলাল নেহরু এবং সুভাষচন্দ্র বসু। তার আগেই অবশ্য মহাত্মা গান্ধীর মত ছিল, প্রথম দুই স্তবক গাওয়া উচিত। তাহলে আর ধর্মীয় স্পর্শ থাকবে না। একই ব্যাখ্যা ছিল রবি ঠাকুরের। নিজের মতের সপক্ষে তিনি চিঠি লেখেন নেহরু ও সুভাষচন্দ্রকে। উভয়ে তা মেনেও নেন। সেই সিদ্ধান্তই মানা হয় ১৯৫০ সালে সাধারণতন্ত্র চালু হওয়ার পর। প্রথম রাষ্ট্রপতি ডঃ রাজেন্দ্র প্রসাদ সংসদ কক্ষে ঘোষণা করেছিলেন, জাতীয় গান ও জাতীয় সংগীত সমমর্যাদার।
কিন্তু ইতিহাসে নিজের কিছু না কিছু ছাপ রেখে যাওয়ার নেশায় মরিয়া মোদি সরকার অগ্রাহ্য করল কবিগুরুর সেই অভিমত। তারই জের, ২৮ জানুয়ারি ১০ পৃষ্ঠার নির্দেশিকা। সবটাই ‘বন্দেমাতরম’। ‘জনগণমন’র উল্লেখই নেই। কেন পূর্ণাঙ্গ ‘জনগণ’ গাওয়ার সিদ্ধান্ত হল না? দ্বিতীয় স্তবকে ‘ঐক্য বিধায়ক জয় হে’ বলা হয়েছে বলে? ঐক্যে আগ্রহ নেই?