সুখেন্দু পাল, বর্ধমান: দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে বুক চিতিয়ে লড়েছিলেন পূর্ব বর্ধমান জেলার বীর সন্তানরা। জেলার বিভিন্ন প্রান্তে তাঁরা তৈরি করেছিলেন গোপন আস্তানা। দেশ মাতৃকাকে পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করতে তরুণরা নিজেদের জীবনের তোয়াক্কা করেননি। বটুকেশ্বর দত্ত, রাসবিহারী বসু, রাসবিহারী ঘোষ এই জেলারই বীর সন্তান। স্বাধীনতা আন্দোলনের ঝাঁঝ বাড়াতে জেলায় বারবার এসেছেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু। বৈঠক, সভা করে আবার ফিরে গিয়েছেন। সেসব স্মৃতি এখনও জেলার বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে রয়েছে। তাঁর জন্মদিনে বর্ধমানে মিষ্টি বিলি হয়। সংরক্ষিত হয়ে থাকা তাঁর ব্যবহৃত চেয়ার দেখে জেলার বাসিন্দারা কপালে হাত ঠেকান। ভগৎ সিং, মহাত্মা গান্ধীর পদধূলিতে ধন্য হয়েছে শস্যগোলা। গলসির চান্না আশ্রম, কালনার জ্ঞানানন্দ আশ্রম হয়ে উঠেছিল বিপ্লবীদের আখড়া। সেখানে প্রশিক্ষণ থেকে পরিকল্পনা সবকিছুই হত। জেলার স্বাধীনতা সংগ্রামীদের বাড়িতেও চলত বৈঠক।
বটুকেশ্বর দত্তের বন্ধু ছিলেন ভগৎ সিং। সেন্ট্রাল লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলি বিল্ডিংয়ে বোমা ছুঁড়েছিলেন তাঁরা। ১৯২৮ সালে ভগৎ সিং এক ইংরেজ পুলিশ অফিসারকে হত্যা করেন। তারপরই তাঁর খোঁজে তল্লাশি শুরু করে ইংরেজ বাহিনী। তিনি চলে আসেন পূর্ব বর্ধমানে বটুকেশ্বর দত্তের ওঁয়াড়ি গ্রামে। বাড়ির সুড়ঙ্গে তিনি আত্মগোপন করেন। সেই খবর ইংরেজ বাহিনীর কাছে পৌঁছে গিয়েছিল। কিন্তু তাঁকে ধরতে তারা ব্যর্থ হয়। ছদ্মবেশে তাঁরা ঘুরপথে চলে যান। বটুকেশ্বর দত্তও তাঁর সঙ্গে বেরিয়ে যান। সেই সুড়ঙ্গ এখন অবশ্য চাক্ষুষ করা যাবে না। পুরনো বাড়িতে সময়ের সঙ্গে তাল মেলাতে না পেরে প্রাচীন জৌলুস হারিয়ে ফেলেছে। তবে, গ্রামে তৈরি হয়েছে প্রতীকী সুড়ঙ্গ।
ব্রিটিশদের ঘুম কেড়ে নিয়েছিলেন জেলার আর এক বীর সন্তান রাসবিহারী বসু। তাঁর বাড়ি রায়নার বড়বৈনান পঞ্চায়েতের সুবলদহ গ্রামে। দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর সঙ্গেই তাঁর নাম উচ্চারিত হয়। তিনি তৈরি করেছিলেন আজাদ হিন্দ ফৌজ। গ্রামবাসীদের আক্ষেপ, তাঁর জন্মভূমি উপেক্ষিতই থেকে গিয়েছে। যদিও জেলা প্রশাসন এই গ্রামকে ঘিরে একাধিক পরিকল্পনা করেছে। জেলার বাসিন্দারা বলেন, গলসির চান্না আশ্রমের কথা স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে গিয়েছে। খড়ি নদীর ধারে তৈরি হয়েছিল আশ্রম। প্রত্যন্ত এলাকায় চলত বিপ্লবীদের প্রশিক্ষণ। কালনার জ্ঞানানন্দ মঠেও স্বাধীনতা সংগ্রামীদের আসা-যাওয়া ছিল। এখানে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুও এসেছিলেন। তিনি যে চেয়ারে বসেছিলেন, সেটি এখনও সযত্নে রাখা আছে। বর্ধমান, পূর্বস্থলীতেও এসেছিলেন দেশের এই বীর সন্তান। আগুন ঝরানো বক্তব্য দিয়ে সভা করেছিলেন। বর্ধমানের ঐতিহ্যবাহী টাউন হল মাঠে পা রেখেছিলেন মহাত্মা গান্ধী। সবমিলিয়ে দেশকে স্বাধীনতার স্বাদ দিতে এই জেলার ভূমিকা ছিল প্রথম সারিতে।
রাজ্যের মন্ত্রী স্বপন দেবনাথ বলেন, এই জেলার জন্য আমরা গর্বিত। এখানকার বীর সন্তানরা দেশকে পথ দেখিয়েছেন। নিজের জীবনের পরোয়া না করে তাঁরা স্বাধীনতা আন্দোলনের জন্য ঝাঁপ দিয়েছিলেন। জেলাশাসক আয়েশা রানি এ বলেন, স্বাধীনতা আন্দোলনে পূর্ব বর্ধমান জেলার ভূমিকা স্মরণীয়। ইতিহাসের পাতায় জ্বলজ্বল করছে এখানকার বীর সন্তানদের গৌরবের কথা। জেলার বাসিন্দারা বলেন, নতুন প্রজন্মের কাছে বীর সন্তানদের স্মৃতি ধরে রাখতে এগিয়ে আসুক সরকার। চান্না আশ্রম বা সুবলদহ গ্রামের ঐতিহ্য বজায় রাখতে সেসব স্মৃতি ধরে রাখা হোক।