১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট। ভারত সবেমাত্র স্বাধীনতা অর্জন করেছে। খুশির এই মুহূর্তে দিল্লির লালকেল্লায় বেজে উঠল সানাই। রাগ কাফি দিয়ে গোটা দেশকে যেন এক সুরে বেঁধে দিলেন উস্তাদ বিসমিল্লা খান। তাঁর হাত ধরেই বিয়ের মণ্ডপ থেকে বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে সানাই। পদ্মশ্রী থেকে ভারতরত্ন। সব সম্মানেই ভূষিত হয়েছেন। তা সত্ত্বেও তাঁর জীবনযাপন ছিল অত্যন্ত সাধারণ। বিসমিল্লার সানাই যেন নিরন্তর খুঁজে যেত এক অদৃশ্য ঈশ্বরকে। যিনি সকল ধর্মের ঊর্ধ্বে। সেখানে হিংসা, ঘৃণার কোনও স্থান নেই।
গঙ্গার ঘাট, কাশী বিশ্বনাথ মন্দির, মণিকর্ণিকা। এসব মিলিয়েই বেনারস। সেখানেই নিজের সুর খুঁজে পেয়েছিলেন বিসমিল্লা। এক হাতে মন্দির, অন্য হাতে মসজিদ। গঙ্গায় স্নান করে নামাজ পড়তেন মসজিদে। তারপর বালাজি মন্দিরে চলত রাগ রাগিনীর পুজো। বিশ্বনাথ মন্দিরেও বার বার বেজে উঠেছে ভৈরবীর করুণ সুর। যা শুনে হয়তো স্বয়ং দেবাদিদেব এক লহমায় বলে উঠেছিলেন, বিসমিল্লাহ! কামারুদ্দিন থেকে বিসমিল্লা। এই দীর্ঘ যাত্রার মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে ধর্মনিরপেক্ষ ভারতের আসল চিত্র। প্রতি মুহূর্তে ভারতের আত্মার উপাসনা করতেন সানাইয়ের সুলতান। বিভোর হয়ে থাকতেন রাধাকৃষ্ণের প্রেমে। উস্তাদ বিলায়েত খানের সঙ্গে যুগলবন্দিতে ধরা পড়েছে সেই চিত্র। দু’জনে একসঙ্গে গেয়ে উঠছেন, ‘মোহে পানঘাট পে নন্দলাল...।’ এটাই ছিল বিসমিল্লা খানের দর্শন। আমেরিকায় থাকার সুযোগ পেয়েও ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘সেখানে কী গঙ্গা আছে?’ শেষ জীবনে দেওয়া সাক্ষাৎকারে একবার বলেছিলেন, ‘আমার সঙ্গে সানাই মরবে না। ইনশাআল্লাহ, নিশ্চয়ই আরও একজন বিসমিল্লা জন্ম নেবেন।’ ভারতের আত্মা যতদিন অটুট থাকবে ততদিন প্রতি আসরে বেজে উঠবে বিসমিল্লার ঐক্যের সুর। যা ভুলিয়ে দেবে সংঘর্ষ, অন্যায়ের অন্ধকার জগতের কথা। গত ২১ মার্চ, শুক্রবার ছিল ভারতের এই কৃতী শিল্পীর জন্মবার্ষিকী।